Alexa দ্য ব্রোকেন কলাম অথবা যেভাবে জন্ম হয় ভোরের ।। মেঘ অদিতি

দ্য ব্রোকেন কলাম অথবা যেভাবে জন্ম হয় ভোরের ।। মেঘ অদিতি

গদ্য ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৯ ৩১ মে ২০১৯  

অলঙ্করণ: আনিস মামুন

অলঙ্করণ: আনিস মামুন

দেয়ালে ঝোলানো মুখোশের সাথে, চাদর-বালিশের সাথে, ঘরে এসে পড়া ম্লান আলোর সাথে এমনভাবে আজকাল মিলেমিশে থাকি যাতে আর ঠাহর না হয় আমার উপস্থিতি। যেন জড় ও জীবের যুথবদ্ধ জীবন ধারণ করেছি। এর বাইরে তো আর কিচ্ছুটি করার নেই...

যথন কিছুই আর করার নেই, তখন সমস্ত আর্তনাদ আর ব্যথাগুলো চাই রঙ হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক এই ব্রহ্মাণ্ডে। আমাকে রেখে যেতে হবে সেইসব ছিন্নবিচ্ছিন্ন চিহ্ন যা ব্যথাযুক্ত রঙে আঁধারির ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয়।

বাইরে কি বৃষ্টি? তুষারপাত? আকাশ অংশত মেঘলা? এখন দুপুর? নাকি রাত? অনেকক্ষণ আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, মেয়েটা। ওর নাম রিতা ম্রো। অসুখ দিনে পাশে থাকার, হাত ধরে রাখার একমাত্র মানুষ। মা ছাড়া বাড়ির বাকিরা কে কোনদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তা আর জানি না। প্রথম ছ’মাস মা একা হাতেই সব করত। তারপর এই মেয়েটা এলে একরকম জোর করে মাকে আমি বাড়ির অন্যদের মাঝে ভিড়িয়েছি। নইলে অসুস্থ সন্তানের যন্ত্রণা তাকে ম্রিয়মাণ করে রাখে। বরং স্বাভাবিক যাপনে তা যদি কিছুটা লাঘব হয়, সেই ভালো। এখন রিতাই ঘড়ি ধরে খাওয়ায়। ওষুধ খেতে দেয়। গা মুছিয়ে দেয় মমতায়। তারপর ঘরের এক কোণে বসে আমার ছবি আঁকা দেখে। দহন থেকে উঠে আসা আমার প্রশ্নগুলো প্রায়ই ছুড়ে দিই ওর দিকে। উত্তর দেবে কি, আমার প্রশ্নই তো ও বুঝতে পারে না। সহজ সরল এই মেয়ে কেবল জানে মাথায় হাত বুলিয়ে ভাঙা বাংলায়, এখন খাও, ওষুদ নাও বলতে আর আর ঘুমিয়ে পড় বলে গুনগুন করে ঘুমপাড়ানি গান গাইতে। গানের কথাগুলো খুব অদ্ভুত.. অবাক হয়ে ভাবি, এই গান নিশ্চিত ওর মা গাইত। হয়ত দাদীও। সময়কে ধারণ করে ও একই গান গেয়ে যাচ্ছে দুলে দুলে। গুনগুন করতে করতে মাথায় হাত বুলিয়েও দিচ্ছে। 

পৃথিবীর যে কোনো স্থানের মায়ার ভাষা কি একইরকম...

ব্যক্তিগত এই ঘর যার দেয়াল জুড়ে কেবল ছবি আর ছবি। এক আমি থেকে বহু আমিতে বিভক্ত হবার গভীরে যে যন্ত্রণা তাকে তো নীল বলে চিনি। এ ঘরের নাম রেখেছি ‘নীল ঘর’। বিশেষ ধরণের এক ইজেলে ক্যানভাস রেখে শুয়ে শুয়ে এখন আমি আঁকতে পারি। আঁকতে আঁকতে খাই। খেতে খেতে আঁকড়ে ধরি তুলি। আঁকতে গিয়ে ক্লান্ত হলে ডায়েরির পাতায় লিখে রাখি অন্ধকারের কথা। যখন হাত থেকে তুলি পড়ে যায়, ক্যাপবিহীন কলম গড়িয়ে কালি মাখে চাদরে.. তখন আচ্ছন্নতা আসে। মেয়েটা তখন গুনগুন করে দান দিনি দান.. ঝুলা ঝুলা জান.. 

সুরের রেশ লেগে লেগে অবচেতনের দরজা খুলে যায়।

তখনই সে আসে। চুমু রাখে ঠোঁটে। অন্ধকারে পরস্পরের দু’জোড়া চোখ জ্বলে ওঠে। মায়ার পরশ রাখে সে আমার শরীরে। অমনি আমার দুটো হাত ছোট হতে হতে দু’টো ডানায় রূপান্তরিত হয়। আহা উড়ালডানা। ডানা পেলেই মন চায় উড়ে যাই আকাশে। আকাশ তো নয়, চার দেয়ালের ঘরে ঝাপটে মরি। দেয়ালে দেয়ালে গোত্তা খাই। বাঁধা পেয়ে আবার তার কোলে ফিরে আসি। সে হাসে। মাথা থেকে শরীর, শরীর থেকে নিচের অংশে মৃদু পরশ রাখে। 
ছোট্ট এক পায়রার বুকের ওমের ভেতর দ্রুততর হয় স্পন্দন.. লাবডুব লাবডুব.. 

সে বলে, চারদেয়ালে বাঁধা পেয়ে নয়, চল ঘুরে বেড়াই খোলা আকাশে। চল চলে যাই বহু দূর.. উড়ে যাই অন্য মহাদেশে। যাবে, তের হাজার দুশো উনিশ কিলোমিটার দুরত্বে? 

অন্ধকার থেকে আলো আর আলো থেকে অন্ধকারের নিঃস্তব্ধতা পেরিয়ে যেতে যেতে  দেখি প্রকৃতি আপন সৌন্দর্যের ডালা সাজিয়ে রেখেছে চারপাশে। কোথাও জলে মিশেছে পান্না রঙ— কোথাও হাল্কা নীল, কোথাও গাঢ় নীল। মেঘেদের বাড়িঘরের কোথাও তা ক্যাসেলের মত আবার কোথাও যেন সে হাট করে রাখা রাজ্যপাট। উড়তে উড়তে আবার সে কথা বলে ওঠে, জানো, যে কোনো দুর্ঘটনা আসলে এক অনিবার্য বিপর্যয়। আলো কমে আসা ঘরের দেয়ালে বাড়তে থাকা অনস্তিত্বের ছায়া যা সেলুলয়েডের ফিতে জুড়ে নামতে থাকে বিশাল অন্ধকারে। তবু সেসব ছাড়িয়ে জীবনকে নিয়ে যেতে হয় সামনের দিকে। 

-    কিন্তু আমি তো প্রস্তুত ছিলাম না! আর দশটা সাধারণ দিনের মতো ওই দিনটা কেন এল না? কেন অত ঘন বৃষ্টিপাতের দিনেও ঝলসে গেল প্রতিটা গাছের মাথা.. কেন শরীর নিয়ে অত হোলি খেলা? চিহ্ন রেখে যাওয়া না কি নিশ্চিহ্ন করে দেবার খেলায় মেতে উঠেছিল ওরা? কেউ তাদের আর খুঁজেই পেল না.. 
প্রস্তুত কেউ থাকে না.. তাই সেটা অনিবার্য বিপর্যয়। 

ওর কথা শুনতে শুনতে আলোকোজ্জ্বল এক নগরের ওপর বৃত্তাকারে তখন উড়ছি।দূরে পর্বতমালা বিস্তৃত। একটা হ্রদের কাছে নেমে আসতে আসতে সে বলছিল, তাকিয়ে দেখো ওই আমার দেশ। দূরে পাহাড়গুলো দেখতে পাচ্ছো, ওগুলো সিয়েরা মাদরে ওরিয়েন্টাল ও সিয়েরা মাদরে অক্সিডেন্টাল পাহাড়। রকি পাহাড়ের নাম শুনেছ? আমি মাথা নাড়ি, ভূগোল বিষয়ে আমার কোনোদিনই আগ্রহ ছিল না। সে নিজেই জানায়, এগুলো রকি পর্বতমালার বর্ধিতাংশ। এ দেশটা প্রাচীন আজটেক সভ্যতার দেশ। কত পুরনো সে ইতিহাস, তুমি জানো? 

কাল তোমায় সেসব গল্প বলব।

আজ এসো অন্য একটা গল্প শোনাই। গল্পটা এক শিশুর। সময়টা তোমার জন্মের অনেক আগে। ১৯৭০ কে ঘুরিয়ে দিয়ে ভাবো সেটা ১৯০৭। সাতের ঘরে পা রেখেছে সবে জুলাই। তখন শুরু হতে চলেছে নয়া এক যুদ্ধের। জন্ম নিচ্ছে যে শিশু তাকে স্বাগত জানাচ্ছে অসম্ভব লড়াকু এক জীবন। সে যুদ্ধকে তুমি অবশ্য যুদ্ধ না বলে বলতে পার বিষণ্ণতার গল্পও। সেই শিশুটা যখন তার বয়স মাত্র ছয়, দুনিয়া দেখার বদলে সে দেখতে শুরু করল হাসপাতালের চার দেয়ালের শীতলতম রঙ। কেননা তখন হারিয়ে ফেলছে সে দুটো পায়ে সমান ভর রেখে দাঁড়াবার ক্ষমতা। তার একটি পা অন্যটির চাইতে ছোট আর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পায়ের পাতা যাচ্ছে বেঁকে। পোলিও। সাথে সাথে তার জীবনেরও বাঁক যাচ্ছে ঘুরে। ন’মাস বিছানাবন্দি অথচ সেই প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শিশুটি ফের এগিয়ে যাচ্ছে বড় হবার দিকে। 
-    আহা নিয়তি.. 

তারপরও তো সে বেড়ে উঠছিল প্রকৃতির সাথে নিজের মত করে। একসময় সে আর ছোট্ট শিশুটি নেই, আঠারোর উচ্ছল তরুণী। জুতোতে বসানো লেস, পোশাকে নানা রঙ। চলায় এক অনন্য ঢঙ। বৈচিত্র্য আর রঙ্গিনে ভরপুর এক সময়। রংচঙে পোশাক, রঙিন বিডস, বর্ণাঢ্য পাথর-বসানো অলংকার। ডানাবিহীন এক রঙিন প্রজাপতি সে। কিন্তু ভাগ্যাহতদের যা হয়, এক তুমুল বৃষ্টির দিনে সে যাচ্ছিল জন্ম শহর থেকে অন্য শহরে। তার বাস হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায় এক ট্রলির সাথে। তীব্র আঘাতে তার মেরুদণ্ড দুমড়ে ভেঙে যায় কলার বোন। পাঁজরের রিবগুলো চুরমার। কোমরের মাংসপেশি ভেদ করে, নিম্নাঙ্গ ফুঁড়ে গেছে লোহার পাত.. কতটা ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা, কী বিপর্যয়, একবার ভাবো। আবার সে অনেকদিনের জন্য ফিরে গেল হাসপাতালে। সাময়িকভাবে আবারও স্থবির হলো তার জীবনপ্রবাহ। 

-    তবু সে আঘাতই তো হয়ে উঠেছিল সমস্ত অন্ধকারের বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানোর শক্তি? 
ঠিক তাই। 
-    ‘আমার ক্যানভাস ভরে যায় স্বপ্ন নয় বাস্তবতার নির্মম আঘাতে..’

সে আমার পিঠে হাত রাখে। মৃদু হেসে বলে, তুমি সবটাই জানো। আজকের পৃথিবীও তার সমস্ত কাজের জন্য মনে রেখেছে শ্রদ্ধায়, ভালো্বাসায়। নিজের অস্তিত্বকে সচল রাখতে তার ভেতরের সব আর্তনাদকে ফুটিয়ে তুলত ক্যানভাসে। 

তোমার অনুভূতিগুলো তারই মতো খেলা করুক তোমার রঙে, ক্যানভাসে, তুলিতে। তুমিও অবচেতনে হয়ত লালন কর তাকে। সিম্বলিক রিপ্রজেন্টেশনকে তুমিও সমান গুরুত্ব দাও। দেখো, দেখার এক সাধারণ দিক যেমন আছে ভেতরে তেমনি আছে অন্তর্গত  বোধের এক জগত। তাহলে কেন ভেঙে পড় বল.. ভেতর অবধি যাও। ঢুকে পর অবচেতনের জগতে, তুমি শিল্পী। কেন মানবে না এসমস্ত বিপর্যয়ও কোথাও গিয়ে একরকমের উদযাপন? এই ছবিটা দেখো। বলতে না বলতেই আমার সামনে ভেসে ওঠে জোড়া ভ্রূর বিস্মিত হরিণী, ‘দ্য ওয়ান্ডার্ড ডিয়ার’। দেখছো, যার ভ্রূতেই ফুটে আছে তীব্র প্রতিবাদ! অথবা ওই যে ‘দ্য ব্রোকেন কলাম’ যার নগ্নতার ভেতর করসেট পরা শরীরে ভঙ্গুর মেরুদণ্ডটিকে অলংকৃত এক স্তম্ভ হিসেবে দেখা যাচ্ছে.. গেঁথে থাকা পেরেকের মাধ্যমে সে যন্ত্রণা ছড়িয়ে যাচ্ছে দর্শকের স্নায়ুতে স্নায়ুতে.. 

এভাবেই দহন জুড়ে জুড়ে জন্ম নেয়, বিপ্লব ও শিল্প। 

তুমি এখন যা দেখছ, যা শুনছো তার কোনো কিছুই বাস্তবতার বাইরের কিছু নয়। রেখা, বৃত্ত, চতুর্ভুজ বা আয়তক্ষেত্র আর প্রকৃতির রঙের সাথে সাথে এইসব যন্ত্রণার ছবি হোক তা হিস্পানিক আর মেক্সকান সংস্কৃতি অথবা খাঁটি বাঙালিয়ানা, তোমরা কিন্তু একই সুতায় বাঁধা। যন্ত্রণার অভিব্যক্তি একই, বল!
তোমার দুর্ঘটনার দিন, সেদিনও কি বৃষ্টি ছিল? 

-    প্রবল বৃষ্টি। আমি ফিরছিলাম ক্লাস থেকে। রাস্তা পার হতেই গেছিলাম। উল্টোদিক থেকে একটা মাইক্রোবাস... নিমিষে আঁকা হয়ে গেল একটা জীবন সেপিয়ার টোনে.. স্বাভাবিকতার আস্তিন গুটিয়ে পরিত্যক্ত স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রক্তে মাখামাখি আমি.. ফিনাইলগন্ধা হাসপাতাল, কড়া ব্যথানাশকের ঝিমুনি, আর মা বাবার ব্যথাতুর মুখ। সেদিনের জীবনে দৃশ্য,  বর্ণ, শব্দ,  ঘ্রাণ বা স্পর্শের আড়ালে এক অচিন পাখি ডানা ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়েছিল মাটিতে। আঘাত এসেছিল এমনভাবে, প্রতিরোধের কোনো সুযোগই ছিল না। বাড়ি ফেরার দিন যখন উঠে দাঁড়াতে চাইছি, মা প্রাণপন জড়িয়ে রাখছে মমতায়, মায়ের চোখের পানিতে মিশে যাচ্ছে আমার ব্যর্থতা, সেই শেষবার আমি কেঁদেছিলাম আকুল হয়ে। তারপর ফিরতেই চেয়েছি। 
তাহলে? যন্ত্রণাকে ধাক্কা মেরে মেরে ক্রমাগত সামনে চলাই তো জীবন! 

-    অথবা আকাশ.. যেদিন থেকে বিছানায়, সেদিনই বাবা তুলে দিয়েছে তুলি। বলেছে, আকাশের মত বিস্তৃত হও। যে কোনো যুদ্ধই আদতে হেরে না যাবার গল্প। বিশ্বাস রাখো নিজের ওপর। আস্থায় ফেরো, তুমি পারবে। তুমি পারো। যতক্ষণ না অক্সিজেন পুরোপুরি ফুরিয়ে আসে ততক্ষণ লড়াই..
ফিরে আসতে আসতে টের পাই, খুব মিষ্টি একটা সৌরভ চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে রেখেছে। ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে স্নিগ্ধতা। পাশ ফিরতে গিয়ে বাবার অদৃশ্য হাত ধরি। বিছানায় জুড়ে পড়ে থাকে পায়রার ছেড়ে যাওয়া অবিন্যস্ত পালক। 

তার উষ্ণ স্পর্শ জুড়ে থাকে তখনও সমস্ত শরীরে। প্রাণে। 

আমার কপাল স্পর্শ করে থাকে ঘুমন্ত রিতা ম্রো’র মায়াময় হাত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics
Best Electronics