দেশে দেশে ভাষা আন্দোলন 

দেশে দেশে ভাষা আন্দোলন 

প্রকাশিত: ১৪:৩৫ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ‘একুশে’ শব্দটাই চেতনার পথে দ্বিধাহীন অভিযাত্রী বেশে বাঙালিকে চলার প্রেরণা যোগায় । বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা যা কিছু মহান, সবকিছুতেই ‘একুশে’র চেতনা বিদ্যমান। মায়ের ভাষার মান বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছিল সেদিন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকসহ নাম না জানা অনেকেই। তাই প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নামেই পালন করা হয়।  

কাজেই এটা প্রত্যাশিত যে বাঙলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে “ভাষার জন্য আন্দোলন” কিংবা “আন্দোলনের অন্যতম উপলক্ষ ভাষা” – এমন আন্দোলন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হয়েছে – কোথাও অহিংস আবার অবস্থার প্রেক্ষিতে, হয়তো কোথাও সহিংস। আমাদের আজকের আলোচনা অন্যান্য দেশের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে।

প্রথমেই চোখ রাখি অবিভক্ত ভারতের ভাষা আন্দোলনের দিকে। ১৯৩৭ সালে, তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় “ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস” এর সমর্থণে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির স্থানীয় কংগ্রেস সরকার কর্তৃক স্কুলে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। এর বিরুদ্ধে তামিল ভাষা রাখার জন্য প্রথম রাজনৈতিক প্রতিবাদ হয়। এই আন্দোলনে প্রায় দুইজন প্রাণ হারায় এবং কয়েক হাজার লোক গ্রেপ্তার হয়। ১৯৪০ সালে আইনটি তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ গভর্নরের হস্তক্ষেপে তুলে নেয়া হয়।  

ভারতের স্বাধীনতার পরে হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা বানানোর সিদ্ধান্ত ১৯৪৬ এর পর বিভিন্ন আলোচনায় প্রস্তাবনা করা হয় এবং তা ১৯৫০ সালেই আইন হিসেবে গৃহীত হয়। সেখানে বলা হয় যে ১৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৬৫ তে হিন্দি সরকারি ভাষা হিসেবে কার্যকর হবে। মজার ব্যাপার হল আইন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য হয়নি। কিন্তু ২৬শে জানুয়ারি, ১৯৬৫ তে এর বিরুদ্ধে তীব্রভাবে আন্দোলন শুরু হয়, মানুষ রাস্তায় নেমে আসে দলে দলে। প্রায় দুইমাস যাবত দাঙ্গা হয় তামিলনাড়ু তথা মাদ্রাজে। আন্দোলনের পক্ষাবলম্বনকারী রাজনৈতিক দল গুলো বিজয়ী হয় তাদের ১৯৬৭ বিধানসভা নির্বাচনে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দির সঙ্গে ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

ভারতে আইনগতভাবে “রাষ্ট্র ভাষা” কিংবা “জাতীয় ভাষা” পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় না। বর্তমানে ভারতে ২২টি ভাষাকে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত ভাষা এবং ৪টি ভাষাকে ঐতিহ্যবাহী/ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যদিও ভারতে মোট ভাষার সংখ্যা ১০০ র বেশি।

১৯৬০ এর এপ্রিলে আসামের প্রাদেশিক পরিষদে অসমিয়া কেই একমাত্র প্রাদেশিক ভাষা  হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। আসামের রাজনীতিসচেতন বাঙালিরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এ নিয়ে দাঙ্গা শুরু হয় আসামে। দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান পশ্চিমবঙ্গ সহ আশপাশের রাজ্যগুলোতে। দাঙ্গা যখন একটু শান্ত হয় তখন ১০ অক্টোবর আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিমল প্রসাদ আবার প্রস্তাব আনেন যে অসমিয়াকে একমাত্র প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অনেক বিতর্কের পর ২৪ অক্টোবর তা প্রাদেশিক পরিষদে পাশ হয়ে যায়। আসাম সরকারের এই অবিচারের প্রতিবাদে বাংলা ভাষাভাষিরা ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ ‌‌‌‌“গণসংগ্রাম পরিষদ” গঠন করেন। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ে শিলচর, করিমগঞ্জ, হালিয়াকান্দি তে শুরু হয় আন্দোলন। এর প্রেক্ষিতে ১৮ মে আসাম পুলিশ এই আন্দোলনের তিন নেতাকে গ্রেফতার করে।এই ঘটনার জের ধরে আসামে সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯ মে হরতাল পালিত হয়। আসামের যোগাযোগের মূল ব্যবস্থা রেল চলাচলকে কার্যত অচল করে দেন আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অসহযোগ পালনের মাধ্যমে। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ অসহযোগে বাধ সাধে “আসাম পুলিশ” এবং “আসাম রাইফেলস”। তারাপুর রেলওয়ে স্টেশনে লাঠিচার্জ কয়া হয় এবং তারা যখন গ্রেফতারকৃতদের নিয়ে যেতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনি এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রূপ নেয় সহিংস আন্দোলনে। সামরিক বাহিনী স্টেশনের নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালায় জনতার উপরে। ১২ জন বুলেটবিদ্ধ হন এবং ৯ জন ওই স্থানেই মারা যান। পরে বুলেটবিদ্ধ আরো দুজন হাসপাতালে মারা যান।  এই ঘটনার পর ভারতজুড়ে সাড়া পড়ে যায় এবং আসাম রাজ্য সরকার বাধ্য হয়ে অসমিয়াকে একমাত্র প্রাদেশিক ভাষা করার আইনটি রহিত করে দেয় এবং বাংলাকে অন্যতম প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।

‘শুন বিহারি ভাই, তরা রাখতে লারবি ডাং দেখাই/ এক ভারতের ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষায় রাজ্য চাই।’ এটি একটি ঐতিহাসিক টুসু গান। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তুলনায় কম আলোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা আন্দোলন। যে আন্দোলনের দাবি ছিল, বাংলায় লিখতে চাওয়া, বাংলায় আলাপ করার অধিকার। সেই দাবিতেই অবিভক্ত বিহারের মানভূম জেলার পাকবিড়া গ্রামের মাঠ থেকে টানা ১৬ দিন পথ হেঁটে আন্দোলনকারীদের মিছিল পৌঁছেছিল কলকাতায়। স্বাধীনতার পরে তৎকালীন মানভূম জেলা বিহারের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল এই ঐতিহাসিক মিছিল শুরু হয়। বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, হাওড়া হয়ে ৬ মে প্রায় হাজার খানেক মানুষ পৌঁছান কলকাতায়। অবশেষে ওই বছর ১ নভেম্বর মানভূমের কিছু এলাকা পুরুলিয়া জেলা নাম নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়।   

এবারে চোখ ফেরানো যাক বহির্বিশ্বে। দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের খানিকটা মিল আছে– দুটোতেই আন্দোলনের মূলে ছিল ছাত্রগণ। তবে পার্থক্য হল বাংলাদেশের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বে ছিল স্কুল পর্যায়ের ছাত্র। গাউটাং এর (তৎকালীন ট্রান্সভাল প্রদেশ) জোহানসবার্গ শহরের সোয়েটোতে সঙ্ঘটিত আন্দোলনটি হয়েছিল ১৬ জুন, ১৯৭৬ সালে । ওই অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ আফ্রিকানার ভাষায় (দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত শ্বেতাঙ্গ ডাচদের জার্মান-ডাচ ভাষার মিশ্রণ) শিক্ষাদান স্কুলে বাধ্যতামূলক করলে স্কুলের কিশোর – শিশুরা এর প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে– কারণ তারা তাদের মাতৃভাষা জুলু এবং ব্যবহারিক লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে শিক্ষা নিতে বেশি আগ্রহী ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। তৎকালীন বর্ণবাদী সরকার প্রতিবাদ সভায় গমনরত ছাত্রদের মিছিলে গুলি করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। প্রায় ২০০ জনেরও অধিক মানুষ নিহত হয়েছিল গুলিতে – যাদের প্রায় সবাই শিশু-কিশোর! এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কার্যক্রম আরও বেগবান হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় দিনটি বিশেষ স্মৃতির মধ্য দিয়ে বর্তমানে এই দিনটি পালন করা হয়।

আমেরিকায় সুদীর্ঘকাল যাবত বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা সু-দীর্ঘকালব্যাপী ইউরোপীয় কলোনিয়াল শাসকদের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিল। অনেক নেটিভ আমেরিকান ভাষার মৃত্যু হয়েছে। গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় এই নেটিভ আমেরিকান ভাষা রক্ষার ব্যাপারটিও আসে। মূল প্রস্তাবনার দীর্ঘ ২০ বছর আন্দোলন এবং আলোচনার পর ৩০ অক্টোবর, ১৯৯০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন নেটিভ, আদি ও স্থানীয় ভাষা রক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য একটি আইন পাশ হয়। মজার ব্যাপার যুক্তরাষ্ট্রে, ইংরেজি ভাষা সরকারি কিংবা রাষ্ট্র ভাষা কোনটিই নয়। দক্ষিণের অঙ্গরাজ্য গুলোতে স্প্যানিশ ভাষার প্রভাব দিনদিন বেড়ে চলছে। তাই এখন আবার নতুন করে ইংরেজিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

কানাডাতে, বিশেষত কানাডার পূর্ব অংশের অংগরাজ্য কুইবেকে ভাষা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এই অঞ্চল এক সময় সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রশ্নে স্বাধীনতা চেয়েছিল। কানাডা সরকার ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবিকে মেনে নিয়ে এই আন্দোলন স্তিমিত করতে সক্ষম হয়েছে।

লাটভিয়াতে লাটভিয়ান-রাশিয়ান ভাষার মনোমালিন্যর কারণে, রাশিয়ান ভাষার স্বীকৃতির বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিট হয়েছিল। গণভোটে লাটভিয়ানরা কয়েকশ বছরের প্রধান ভাষা (রাশিয়ান সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকা সময়) রুশ ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তবু অনেক আন্দোলনের অন্যতম নিমিত্ত ছিল ভাষা।  বেলজিয়ামে ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ তাছাড়া ইউরোপের বলকান অঞ্চল, স্পেনের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি কিংবা তৎকালীন মেক্সিকোর উত্তরাংশে স্প্যানিশ-ইংরেজি নিয়ে। সপ্তদশ-অস্টদশ শতাব্দীতে চীনে ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান বিরোধ সর্বজনবিদিত।  

প্রায় সমানুপাতিক বহুভাষী রাষ্ট্রের মধ্য, রাজনৈতিক ভাবে জোর করে ভাষা চাপিয়ে দিয়ে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নেই বোধয় একমাত্র সফলতা পাওয়া গিয়েছে, সেখানে সবাইকে রুশ ভাষা শিখতে হত। চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রেও কিংবা বাংলাদেশে অনেক ভাষা থাকলেও নির্দিষ্ট একটির অনুপাত পঁচানব্বই শতাংশেরও বেশি। ভারত কিংবা নাইজেরিয়া এদিক হতে ব্যতিক্রম; তারা বাস্তবতার নিরিখে ইংরেজিকে বিশেষ মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন অনেক দেশেই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজির গ্রহণযোগ্যতা অনস্বীকার্য।

সর্বশেষে, বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি কথা না বললেই নয় – বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশের বাঙালিরা নিজ ভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন করলেও – ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কিত হেমোজেনিক জাতীয়তাবোধ থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষজন দীর্ঘদিন তাদের নিজ ভাষা চর্চা (জাতীয় ভাবে) এবং উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। তাদের অনেকে নিজ ভাষায় আর ঠিক মত কথাই বলতে পারেন না এখন!! অনেকেরই জানা নেই – বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন তাদের মাতৃ ভাষার অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং তারা তাদের অকাট্য যুক্তি তুলে ধরছেন তাদের দাবীর পেছনে। ভাষা আন্দোলনের পুরোধা বাংলাদেশকেই একটি নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই দেশের অন্যান্য বৈচিত্রময় ভাষার উন্নয়নে ও রক্ষায় কাজ করা উচিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর