দুঃসাহসিকতাই যাদের ভয়ানক মৃত্যুর কারণ!

দুঃসাহসিকতাই যাদের ভয়ানক মৃত্যুর কারণ!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০০ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৩২ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই কৌতূহল প্রিয়। নিজে যা চিন্তা করেন বা ভাবেন তা করে দেখাতে উদগ্রীব থাকে সবসময়। যদি সে কাজে মারাত্নক ঝুঁকিও থেকে থাকে তবুও তারা পিছুপা হয় না।  

আর এভাবেই মারাত্নক দুঃসাহসিকতা দেখাতে গিয়ে অনেক মানুষ এমন মারাত্নক পরিণতিতে পড়ে যা অকল্পনীয়। অনেকেতো তার প্রিয় প্রাণটাই দিয়ে দিয়েছে। জেনে নিন তেমনই কিছু মানুষের দুঃসাহসিক কর্মকান্ড। যাদের শেষ পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ মৃত্যু।  

সুপ্রিয়ান্তো
যিনি নিজেকে কুমিরের দেবতা বলে ভাবতেন। সুপ্রিয়ান্তো ইন্দোনেশিয়ার একজন নাগরিক ছিলেন। তার ছিল কুমিরদেরকে আয়ত্তে আনার অসাধারণ ক্ষমতা। আর এ থেকেই তাকে কুমিরের দেবতা বলে আখ্যায়িত করা হয়। তবে তার পরিবারের মানুষ বা বন্ধু বান্ধব এবং আত্নীয় স্বজনরা একথা বিশ্বাস না করলেও, তিনি এটি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। একদিন তার এক প্রতিবেশী বাচ্চা মেয়ে কুমির ভর্তি এক লেকে পড়ে যায়। কেউই তাকে উদ্ধার করতে লেকে নামতে সাহস পাচ্ছিল না। তখন সুপ্রিয়ান্তো নিজের কথা না ভেবে সেই মেয়েটিকে উদ্ধার করতে লেকে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু পানিতে নামার কিছুক্ষণ পরই একটি কুমির তাকে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার দেখা যায় সুপ্রিয়ান্তোর শরীরে কুমিরের কোনো আক্রান্তের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অনেকক্ষণ পানিতে থাকার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।

জর্ডান স্টোন
২০১৭ সালে ২৩ বছর বয়সে মারা যান জর্ডান স্টোন। জর্ডান মৃত্যুর মাত্র পাঁচদিন আগে তার ২৩ তম জন্মদিন পালন করেন। জর্ডানের আর্মি পোশাক খুব পছন্দের ছিল। তাই তার এক আত্নীয় তাকে তার জন্মদিনে আঘাত প্রতিরোধক একটি আর্মি পোশাক উপহার দেন। এই পোশাক আর্মিরা মারাত্নক আঘাত থেকে রক্ষা পেতে পরিধান করে থাকে। আর সে সেটি তার জন্মদিনের পার্টিতে বন্ধুদের সামনে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এরপর জর্ডান পোশাকটি পরে ধারালো ছুরি দিয়ে তার বুকে আঘাত করে। দুর্ভাগ্যবশত পোশাকটি ধারালো ছুরিতে কেটে যায়। আর সরাসরি জর্ডানের বুকে আঘাত করে। ছুরি জর্ডানের চামড়া ভেদ করে হৃদপিণ্ডে ঢুকে যায়। এর কিছুক্ষণ পর জর্ডান মৃত্যুবরণ করেন।  
 
মেরি
অনেক ধনী ব্যক্তির স্ত্রী ছিলেন মেরি। ২০১২ সালে তিনি বিলাসবহুল একটি ইয়োর্ড কিনেন। মাত্র চার ঘণ্টার প্রশিক্ষণেই তিনি ইয়োর্ড চালানো শিখে ফেলেন। যদিও এটিই ছিল তার জীবনে প্রথম ইয়োর্ড চালানো। এই অল্প প্রশিক্ষণেই তিনি নিজেকে একজন দক্ষ চালক বলে ভাবতে থাকেন। এরপর তিনি তার স্বামীকে অবাক করে দেয়ার জন্য ৫০০ মাইল যাত্রার একটি পরিকল্পনা করেন। দক্ষ নাবিকরা তাকে একাজে বাধা দেন। এছাড়াও তার যাত্রার পথও ছিল মারাত্নক ঝুকিপূর্ণ। সবাই তাকে পরামর্শ দেয় সঙ্গে একজন দক্ষ নাবিক নিতে। মেরি সবার কথা উপেক্ষা করে একরাতে সত্যি সত্যি যাত্রা শুরু করে। তবে যাত্রার ঠিক দুদিন পরেই মেরির ইয়োর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর তার যাত্রা শুরু করার স্থান থেকে সামান্য কিছু দূরে তার ইয়োর্ডটির ভাঙ্গা অংশ খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও মেরির মৃতদেহ এখনো পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

উনিডেন্ট
স্প্যানিশ এক নারী উনিডেন্ট প্রাকৃতিক আরোগ্য ব্যবস্থা আকুপাঞ্চারে বিশ্বাস করতেন। এটি এমন একটি আরোগ্য পদ্ধতি, যার দ্বারা শরীরের যেকোনো সমস্যা দূর করা যায়। সাধারণত ছোট ছোট কাপ, বাটি এবং সুই দিয়ে এর কাজ করা হয়। কিন্তু উনিডেন্ট বিশ্বাস করতেন সুচের বদলে মৌমাছির হুল এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। সবাই তার এই বিশ্বাস নিয়ে হাসাহাসি করলেও উনিডেন্ট এ থিওরির উপর মনে প্রাণে বিশ্বাসী ছিলেন। একদিন সবার কথা উপেক্ষা করে অনেকগুলো মৌমাছি নিয়ে পরীক্ষা করতে বসে যান। একসঙ্গে অনেকগুলো মৌমাছির হুল ফোটানোতে তার শরীরে মারাত্নক অ্যালার্জির দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তার হার্টের কাজ বন্ধ হয়ে আসে। এরপর সঙ্গে সঙ্গে কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই তার মৃত্যু হয়।

লিম্বা
লিম্বা নামের মালেয়শিয়ান এই ম্যাজিশিয়ানকে অনেকেই হয়তো চিনে থাকবেন। লিম্বা ব্ল্যাকটক নামেও পরিচিত ছিল। তিনি তার নিজের যোগ্যতায় হাজার হাজার অসাধারণ সব ম্যাজিক দেখিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন। লিম্বা বিশ্বাস করতেন মানুষের মনের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা পৃথিবীর সব কাজ করা সম্ভব। একদিন তিনি তার মনের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা নিজের শরীরকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সবাইকে একটি চরম ম্যাজিক ট্রিট দেখাতে চেয়েছিলেন। যে ট্রিটটি এতোটাই ভয়ানক ছিল যে কোনো সাধারণ মানুষ এটির কথা শুনলেও চমকে যাবেন। লম্বা চেয়েছিলেন একটি জ্বলন্ত চুলার ওপর তাওয়া বসিয়ে তার মধ্যে ৩০ মিনিট বসে থাকবেন। এমনকি তাওয়াটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হবে। তার শিষ্যরা এটি শুনে তার কথামতোই সব কাজ করেন। ৩০ মিনিট পর যখন তাকে বের করা হয় তখন দেখা যায়, লিম্বা মারা গিয়ে একেবারে সেদ্ধ হয়ে গেছে।  

মাইকেল ডেকার  
মাইকেল ডেকার ছিলেন একজন ব্রিটিশ পাইলট। তবে পাইলট হলেও তার মারাত্নক ঝোক ছিল প্লেন ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর। তিনি চেষ্টা করতে থাকেন ছোট ছোট প্লেন বানানোর। যেগুলো প্রতিনিয়ত মানুষের কাজে দেবে। আর তাই তিনি  যানজট কমাতে এয়ার ট্যাক্সি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। যেগুলো দেখতে ট্যাক্সির মতো এবং উড়বে প্লেনের মতো।২০১৫ সালের দিকে তিনি একটি এয়ার ট্যাক্সি তৈরিও করে ফেলেন। তবে তিনবার ব্যর্থতার পর চতুর্থবার তার এয়ার ট্যাক্সি ছয় হাজার ফুট উপরে উড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু এরপরই এয়ার ট্যাক্সিটি মাটিতে নামার সময় ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটির কারণে ডেকার ঠিকমতো ল্যাণ্ড করতে পারেন   নি। এয়ার ট্যাক্সিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সেইসঙ্গে মাইকেল ডেকারও মারা যান। এমনকি তার মৃতদেহ খুঁজে পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

ফ্যাংক রাইকেল
নামের মতোই তার কাজকর্মও ছিল কিছুটা অদ্ভুত রকমের। ফ্যাংকের এয়ার স্যুট বানানোর খুব শখ ছিল। তিনি ছিলেন এয়ার স্যুট এবং প্যারাস্যুট বিষয়ক একজন গবেষক। ১৯২২ সালে তিনি একটি অদ্ভুত এয়ার স্যুট তৈরি করেন। তিনি ভেবেছিলেন এটি কাজে লাগবে। তাই তিনি অনেক মানুষের সামনে এটি পরীক্ষা করতে আইফেল টাওয়ারের উপরে ওঠেন। এরপর সেখান থেকে ঝাপ দেন। দূর্ভাগ্যবশত তার তৈরি করা স্যুট তাকে বাঁচাতে পারেনি। এটি মাটিতে আছড়ে পরে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার মৃত্যু হয়।       
 
এজন্যই কথায় বলে, আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো কিন্তু অতিরিক্ত থাকা কোনোদিক থেকেই ভালো না। আর তাই অযাচিত দুঃসাহসিকতা না দেখিয়ে, নিজের এবং আশেপাশের মানুষের কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত থাকুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ