Alexa দুই পারেই উন্মাদনা সৃষ্টিতে সার্থক হুমায়ূন আহমেদ

দুই পারেই উন্মাদনা সৃষ্টিতে সার্থক হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাশিত: ১৪:২০ ১৯ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২০:১৭ ১৯ জুলাই ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক। সাবলীল ঘটনার বর্ণনা আর সহজ ভাষায় লেখার তার বইয়ের বিক্রি হাজার হাজার। 

একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার হুমায়ূন আহমেদ। বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। তার সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করে আজও। বাংলাদেশে তার এই পর্বত প্রমান জনপ্রিয়তার গুনগানে সুনীল সমরেশ ছিলেন কুণ্ঠাহীন। কিন্তু একথা সত্যি যে ওপারের মত না হলেও এপারেও সাহিত্য উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আসুন, দেখা যাক তার সাফল্যের সোপান। 

১৯৭২ সালে ঢাকার খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির থেকে প্রকাশিত হল হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। জঘন্য প্রচ্ছদ। ছাপাও তথৈবচ। ‘মুখপত্র’ নামের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত এই উপন্যাস বাংলাদেশের বন্দিত সাহিত্যিক আহমেদ ছফার চোখে পড়েছিল। তার সুপারিশে উপন্যাসটি সামান্য বর্ধিত করে প্রকাশিত হয়েছে। খুব কম কপি ছাপা হয়েছে। তেমন চলছে না। হুমায়ূন বেশ আতান্তরেই পড়ল। সে বিনীত ভাবে প্রকাশক খান সাহেবকে বলল, কভার পালটে ভালো করে আরেকটি মুদ্রণ ছাপা যায় না? খান সাহেব হুমায়ূনের এই ধারনার সঙ্গে সহমত পোষণ করে নতুন করে কভার করালেন তখনকার সব চেয়ে নামী কভার শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে দিয়ে। নতুন করে মুদ্রিত হল নন্দিত নরকে। মাত্র চার ফর্মার বই। দাম তিন টাকা। ছফা ভাই তখন লেখক শিবির নামক সংগঠনের প্রধান। তিনি ‘লেখক শিবির’ থেকে নন্দিত নরকে উপন্যাসটিকে বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে পুরস্কার দিলেন। বইটা নিয়ে বাজারে নাড়াচাড়া পড়ল। কিন্তু সাহিত্য জগতের মাথারা তেমন  কেউ কিছু বললেন না। শামসুর রহমান কথাপ্রসঙ্গে দৈনিক বাংলায় বললেন, শুনেছি নন্দিত নরকে ভালো হয়েছে। বইটা পড়তে হবে। এক সকালে অকস্মাৎ বন্ধু আনিস সাবেৎ দৌড়ে মুহসীন হলে তার ঘরে এলো। নাচতে নাচতে এসে বলল, হুমায়ূন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দেশ পত্রিকায় বই রিভিউ করেন সনাতন পাঠক নামে জানো তো? হুমায়ূন বলল, হ্যাঁ, জানি।  

তিনি দেশ পত্রিকায় ‘নন্দিত নরকে’র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। 

বল কী?

এই নাও। পত্রিকাটা পড়ে দেখ। 

উনি আমার বই কোথায় পেলেন? 

তা জানি না। নিশ্চয়ই কেউ দিয়েছে। 

হুমায়ূনের হাত পা কাঁপতে লাগল। কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? দেশ লিখেছে তার উপন্যাসের  কথা? হুমায়ূন পড়তে শুরু করল।
‘নন্দিত নরকে গল্পের নামটা দেখেই আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কেননা ওই নামের মধ্যেই যেন নতুন জীবন দৃষ্টিভঙ্গি, একটি অভিনব রুচি, চেতনার একটি নতুন আকাশ উঁকি দিচ্ছিল। লেখক তো বটেই তার নামটিও আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। তবু পড়তে শুরু করলাম ওই নামের মোহেই। পড়ে অভিভূত হলাম। গল্পে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি একজন সূক্ষদর্শী শিল্পীর, একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম।

যাক, হুমায়ূন বুঝল এবারে ‘দেশ’ যখন প্রশংসা করেছে ‘নন্দিত নরকে’ নিয়ে এবার আলোচনা শুরু হবে এবং তাই হল। নন্দিত নরকে বাংলাদেশে হলো সুপার ডুপার হিট। এ প্রসঙ্গে অনেক পরের আরেকটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ততদিনে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে পরিচিত নাম। একবার কলকাতায় এসেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে আমন্ত্রণ। সেখানে এসেছেন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষও। সুনীলের ন’তলার ব্যালকনিতে জমেছে তাদের পানভোজনের আড্ডার আসর। সেই আসরে কথাপ্রসঙ্গে হুমায়ূন বেশ বিনীত স্বরে বললেন, আপনি আমায় আমার কল্পনাতীত সম্মানে সম্মানিত করলেন। কিন্তু আমাকে তো আমার দেশের সাহিত্যিকরা সাহিত্যিকই মনে করেন না। বলে বাজারী লেখক। 

সাগরময় ঘোষ জ্বলে উঠলেন। বললেন, ‘লেখার সাহিত্যগুন বিচার করে কে? পাঠক। তোমার পাঠক নেই মানে তোমার হাতে সাহিত্যরস নেই। এই পাঠকহীন বহু গদ্যকার এই বিদ্বেষ পোষণ করে যাদের পাঠক আছে তাদের প্রতি। কী যায় আসে তাতে। তোমার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ আমি পড়েছি। প্রথম সংস্করণ। এখনকারেরটা নয়। জঘন্য ছাপা, জঘন্য প্রচ্ছদ। কিন্তু কথায় ঢুকলে একটানে শেষ করতে হয়। আমি পড়ে সুনীলকে দিয়েছিলাম। তখন ও আনন্দবাজারে চাকরি করত না। খেপ খেলত। ও সনাতন পাঠকের নামে দেশে নন্দিত নরকের সমালোচনা লিখেছিল। এই বইয়ের সমালোচনা ছাপিয়ে কাগজের কিছু লাভ নেই। পাঠক বইটা হাতে পাবে না, লেখক জানবে না যে সমালোচনা বেরিয়েছে, কোন পুরস্কারের জন্যে নাম বিবেচিত হবে না। তাহলে আমাদের লাভ কি ছেপে? আমরা ভাল সাহিত্য ও সাহিত্যিকের আগমনী বন্দনা করেছিলাম। সেটাও আমাদের দায়িত্ব। 

সাগরময় ঘোষের কথাটা ঠিক। বাংলাদেশের বই তখন এপারে আসত না। হুমায়ূন নিজেও জানতেন যে কলকাতায় তার লেখক পরিচিতি প্রায় নেই। এই ঘটনার পাঁচ বছর আগে তখন সাগরময় ঘোষের সাথে হুমায়ূনের আলাপ ছিল না। এমন এক সকালে একজন কলকাতার অতিথি হুমায়ূনের বাড়িতে উপস্থিত হল। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তিনি প্রস্তাব দিলেন যে তারা শারদীয় সংখ্যায় হুমায়ুনের উপন্যাস প্রকাশ করতে চান। তবে দেশ, আনন্দবাজার বা সানন্দার কোন একটিতে ছাপা হবে। কোথায় তা ঠিক করবেন সাগরময় ঘোষ। হুমায়ূনের কাছে এ এক মস্ত সুযোগ। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের সাথে পরিচিত হওয়ার। কিন্তু হুমায়ূন তাকে পরিস্কার জানালেন, যদি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তবেই উপন্যাস দেব, নচেৎ নয়। সেই প্রতিনিধি ভদ্রলোক বেশ ক্ষুণ্ণ মনে বিদায় নিলেন হুমায়ূন লিখবেন না ধরে নিয়ে। কিন্তু পনের দিনের মাথায় তিনি আবার হাজির দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের চিঠি নিয়ে। শারদীয় দেশ পত্রিকাতেই হুমায়ূনের উপন্যাস ছাপা হবে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমন্ত্রণ পত্র। সেই শুরু হুমায়ূনের দেশ পত্রিকায় লেখা। টানা আট বছর লিখলেন দেশ পত্রিকায়। কিন্তু আনন্দ পাবলিশার্স থেকে তার কোনো উপন্যাস পশ্চিমবঙ্গে বই হিসেবে প্রকাশিত হলো না। আনন্দ’র নিজস্ব কিছু নিয়ম ছিল যা সব লেখকের জন্যে সমান। তার ওপরে আর্থিক  অঙ্ক বেশ কম। হুমায়ূন রাজী হলেন না। কাজেই এখানকার প্রথম শ্রেণির প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্সের সঙ্গ তার জোটবন্ধন ঘটল না। আর্থিক অঙ্কের ব্যাপারটা তবু মেনে নেয়া যায় কিন্তু অন্যান্য শর্ত মেনে নেওয়ার জায়গায় ছিলেন না হুমায়ূন। কিন্তু হুমায়ূনের উপন্যাস দেশ  পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পরে দেশ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার মূল আকর্ষন হয়ে দাঁড়ালেন হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু সেই উপন্যাস বই আকারে বাজারে উপস্থিত হতে পারল না। সেই তুলনায় বাংলাদেশে তার জনপ্রিয়তার আরেকটি কারন তার টিভি নাটক। একই সঙ্গে তার উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে এবং তার নাট্যরূপ টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে, ফলে একই পাঠক দর্শক সৃষ্টি হয়েছে। এটা ছিল বাংলাদেশে তার কম্বাইন্ড এফেক্ট। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যখন বিটিভির কল্যানে হুমায়ূনের নাটক সুপারহিট তখন তার বই আমাদের কাছে অধরা রয়ে গেল। এই নাটকগুলির সম্প্রচারের প্রায় পনের বছর পরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসার পরে এই বইগুলি পশ্চিমবঙ্গের বাজারে এলো। ফলে একই টিভির মুগ্ধ দর্শক ও সাহিত্যমুগ্ধ পাঠক তৈরি হল না। পশ্চিমবঙ্গে দুটি আলাদা সেগমেন্ট। দুই সেগমেন্টই হুমায়ূন প্রেমে পাগল।  

তবে একথা অনস্বীকার্য যে হিমু চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের এক অনবদ্য সৃষ্টি। হুমায়ূন যে আদ্যন্ত রোমান্টিক ছিলেন হিমু সৃষ্টি তার এক অনন্য প্রমান। হিমু মূলত একজন বেকার যুবক যার আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক। চাকরির সুযোগ থাকলেও সে চাকরি কখনো করে না বলেই সে বেকার। হিমু চরিত্রের আসল নাম হিমালয়। এ নামটি রেখেছিলেন হিমুর বাবা। লেখক হিমুর বাবাকে বর্ণনা করেছেন  একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ হিসেবে; যার বিশ্বাস ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে একইভাবে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। তিনি মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু। হিমুর পোশাক হল পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি। হিমুর জীবন যাপন অদ্ভুত। তার জীবন বাউন্ডুলে ছন্নছাড়া ধরনের। সে মেসে থাকে। মাঝে মাঝে রাস্তায় ও পার্কেও রাত কাটায়। তার প্রধান কাজ হেঁটে, খালি পায়ে রাস্তায় ঘুরে বেরানো। তার কোনো পেশা নেই। হিমুর বেশকিছু বিত্তবান আত্মীয় রয়েছে। হিমু প্রায়ই তার বিত্তবান আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহার এবং অর্থসাহায্য পায়। তবে সে মানুষের কল্যানের জন্য অনেক কাজ করেছে । বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়া অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করে, এবং এই বিভ্রান্ত সৃষ্টি করা হিমুর অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ। প্রেম ভালবাসা উপেক্ষা করা হিমুর ধর্মের মধ্যে পড়ে। কোন উপন্যাসেই কোন মায়া তাকে কাবু করতে পারে নি। মায়াজালে আটকা পড়তে গেলেই সে উধাও হয়ে যায়।

নব্বইশের দশকে হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। হুমায়ূন হিমু লিখেছেন ‘দেশ’ পত্রিকায়। বাংলাদেশে সেই সময়ে বহু সংখ্যক যুবক যুবতী নিজেদের হিমু ভাবত। হুলুদ পকেটহীন পাঞ্জাবী পড়ে খালি পায়ে ঘুরে বেড়াত। হিমুর উপন্যাস কলকাতায় প্রকাশিত হতেই হিমু পশ্চিমবঙ্গেও সৃষ্টি হল। একবার কলকাতায় এসেছেন  হুমায়ূন বইমেলায় ৷ কলকাতায় চেহারা দেখে তাকে কেউ চিনবে না ভেবে মনের সুখে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিনি , হঠাৎ তাকে চমকে দিয়ে একজন তার পা ছুঁয়ে বলল, দাদা আমি হিমু ৷ 

হুমায়ূন অবাক হয়ে তাকিয়ে ধুতি পরা হিমু দেখলেন ৷ পাঞ্জাবি হলুদ রঙের ৷ পায়ে জুতা নেই – খালি পা ৷ লক্ষণ বিচারে হিমু তো বটেই৷

আপনি কত দিন ধরে হিমু?

দুই বছরের উপর হয়েছে দাদা৷

আমি বললাম, পাঞ্জাবির কি পকেট আছে?

পকেট নেই৷

টাকা-পয়সা রাখেন কোথায়?

ভদ্রলোক পাঞ্জাবি উঠিয়ে দেখালেন, কোমরের কালো ঘুনসির সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ লাগানো – টাকা-পয়সা সেখানেই থাকে৷
দাদা, আমি দুজনের ভক্ত৷ আপনার এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের৷ আপনাদের দুজনের ছবি ঠাকুরঘরে আছে৷ 

হুমায়ূন চমৎকৃত৷ আট বছর দেশ পত্রিকায় লেখালেখির কারণে মুসলমান হয়েও যদি যদি কোন হিন্দুর ঠাকুরঘরে প্রবেশের সুযোগ ঘটে সেটা কম কী?  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics