Alexa দুই ঘর সামলাতে ব্যর্থ বিএনপি

দুই ঘর সামলাতে ব্যর্থ বিএনপি

মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:১৩ ৫ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:৩৪ ৫ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। জোট ও ফ্রন্টের দায়িত্বশীল নেতাদের কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও জোট ছাড়ার আল্টিমেটাম ভাবিয়ে তুলেছে হাইকমান্ডকে। তাই জোটের রাজনীতিতে ঘর সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিএনপিকে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এছাড়া ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে উঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও দেখেনি সফলতা।

নানা নাটকীয়তায় বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিদের শপথ, কাদের সিদ্দিকির ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ, একে অপরকে কাঁদা ছোড়াছুড়িসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফ্রন্ট ও জোটের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন অস্থিরতা। ফলে ফ্রন্ট ও জোটের মধ্যে বেজে উঠেছে ভাঙনের সুর।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন পূর্ব ও নির্বাচনকালীন যেভাবে সরকারবিরোধী বক্তব্য নিয়ে মিডিয়ায় সরব ছিলেন। নির্বাচনের পর তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও জট লাগতে শুরু করেছে।

ড. কামালের প্রতি অসন্তোষ জানিয়ে ঐক্যফ্রন্ট ছেড়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্টে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কিছু কিছু কাজে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তারা সঠিকভাবে চলতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, তারা নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়াতে পারেননি। সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল শাহবাগে গণজমায়াত করতে ব্যর্থ হয়েছি। এসব বিষয় আমাদের জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করেছে। মানুষ এসবের উত্তর জানতে চায়।

বঙ্গবীর বলেন, বিএনপির তথাকথিত নির্বাচিত ছয়জনের শপথ ও মির্জা ফখরুলের শপথ না নেয়ার ঘটনা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।

এদিকে, ২০দলীয় জোটের প্রভাবশালী শরীক ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ এরইমধ্যে বিবৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছেড়েছেন। ছাড়ার তালিকায় রয়েছে লেবার পার্টিসহ বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দল। তাছাড়া নানা ইস্যুতে অনেক আগে থেকে ২০দলীয় জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরীক দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সর্ম্পক বেশি ভালো যাচ্ছিল না।

এমতাবস্থায় বিজয়ীদের সংসদে যোগ দেয়ার ঘটনাকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরীকরা।

তারা মনে করেন, সংসদে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে শরীকদের মতামত নেয়ার প্রয়োজনই মনে করেনি।

জোট শরীক নেতাদের অভিযোগ, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচন না চেয়ে সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এর মাধ্যমে এই সংসদকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া অতিমাত্রায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে গেছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের কর্মকাণ্ড শুধু সহমত, সংহতি ছাড়া তেমন কিছুই নয়। সংসদে বিএনপি যে যাবে, এটা জোটের কেউ জানেন না বলেও অভিযোগ তোলেন জোট নেতারা।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারি নাই। কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পারলে তো বেরিয়ে আসাই সঠিক। আমি সরে এসেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিএনপির বাইরের কেউ না। তারা ভালো কাজ করুক। আমি গণতন্ত্রের কথা বলবো, জনগণের কথা বলবো।’

নির্বাচন ও পরবর্তী কার্যক্রমের ব্যর্থতার দায়ে ঐক্যফ্রন্ট বিলুপ্ত করা উচিত বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। তিনি বলেন, কামাল-রবদের নিয়ে সময় নষ্ট না করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন সংগ্রামের প্রস্ততি নেয়া দরকার বিএনপির।

তিনি আরো বলেন, ঐক্যফ্রন্ট বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই নির্বাচনে সীমাহীন ব্যর্থতার দায়ে ঐক্যফ্রন্টকে বিলুপ্ত করা উচিত। কেননা তাদের সব কর্মকান্ড দেশবাসী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তারা আন্দোলনমুখী বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করেছে।

তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে ড. কামাল নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। বিএনপির ৯০ ভাগ নেতা-কর্মী বিগত নির্বাচনে পরাজয় ও বেগম জিয়ার মুক্তি দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ হিসেবে ঐক্যফ্রন্টকে মনে করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু আমার দল নয়, আমি যদি ২০ দলীয় জোটে না থাকি তাহলে আরো অন্তত ৪-৫টি দল জোট থেকে বেরিয়ে যাবে। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি নেতারা দল এবং জোট পরিচালনায় চরমভাবে ব্যর্থ এটা পরিষ্কার।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান বলেন, জোটকে পাশ কাটিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বিএনপি। বিএনপির কাছে ২০ দল যদি গুরুত্বহীন মনে হয়, তাহলে জোট বিলুপ্তির ঘোষণা দিলেই হয়। শুধু নামমাত্র জোট রেখে লাভ কি?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বেশি সখ্যতা ও ২০দলের প্রতি অনীহার কারণে উভয় সংকটে পড়েছে বিএনপি। তারা মনে করেন, একদিকে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল বিএনপিকে অবমূল্যায়ন করছেন, অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সখ্যতার কারণে ২০ দল ছাড়ছেন জোট সঙ্গীরা। সব মিলিয়ে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিএনপি খারাপ সময় পার করছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক, আর্থিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বড় দলগুলোর নেতৃত্বে জোট গঠিত হয়। এসব জোটের কোনো আদর্শিক মিশন নেই। আসল লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া। দরকষাকষির এক পর্যায়ে বড় দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা অনুযায়ী সুবিধা না পাওয়ার পরই জোট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, শুধু নির্বাচন কেন্দ্রিক জোট গঠন রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। ছোট দলগুলো এক-দুটি আসনের জন্য বা মন্ত্রিত্বের জন্য রাজনীতি করে। নিবন্ধনহীন দলগুলোও স্বার্থের জন্য নির্বাচনের সময় জোটে এসে ভিড় জমায়।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কোন দল ঐক্যফ্রন্ট থেকে চলে যাবে, কোন দল থাকবে না- তার দায় বিএনপি নেবে না। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। ঐক্যফ্রন্টের ওপর আমরা নির্ভরশীল নই। কেন্দ্রীয়ভাবে দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

২০ দলীয় জোটে ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি পক্ষ বিএনপিকে দুর্বল করতে জোট ভাঙার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত নই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএএম/এস