দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮

দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৪৬ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২২:৫২ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধের জেরে ভয়াবহ সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় আছেন আরো শতাধিক লোক।

ভয়াবহ ওই সহিংসতার মধ্যে দিল্লির অশোকনগরে দুর্বৃত্তরা একটি বড় মসজিদে হামলা চালিয়ে মসজিদের মিনারে গেরুয়া পতাকা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

দুর্বৃত্তরা এসময় আগুন ধরিয়ে দিলে মসজিদের ভিতরে থাকা জিনিষপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হামলাকারীরা আশেপাশের কয়েকটি বাড়ি ও দোকানেও আগুন ধরিয়ে দিলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এ সম্পর্কে বৃহস্পতিবার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ সম্পাদক মুফতি আব্দুস সালাম রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘আমাদের দাবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সক্রিয় হোক। মসজিদ যাতে অক্ষুণ্নভাবে সেখানে থাকে, মসজিদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে মেরামত করে মুসলিমদের নিরাপদে সেখানে নামাজ পড়ার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। এটা নিয়ে কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না। মসজিদ আল্লাহর ঘর। এখানে আল্লাহর ইবাদত হবে। প্রকাশ্য দিবালোকে যার ওই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক যাতে গোটা ভারত ও বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।’

গণমাধ্যমে প্রচারিত এক ভিডিও চিত্রে প্রকাশ, কয়েকজন যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে মসজিদের সুউচ্চ মিনারে উঠে সেখানে থাকা মাইক নীচে ফেলে দেয়। এদের মধ্যে একজন সেখানে ‘গেরুয়া’ পতাকা টাঙিয়ে দেয়। আরেকজন সেখানে জাতীয় পতাকা টাঙায়। উড়তে থাকে কালো ধোঁয়া।

ছবি: দিল্লিতে মসজিদের মিনারে গেরুয়া পতাকা লাগাচ্ছে এক উগ্র হিন্দুত্যবাদী ব্যক্তি

মঙ্গলবার ওই হামলার কথা প্রকাশ্যে আসলেও বিষয়টি অনেকেই ভুয়ো বলে অভিহিত করেন। কিন্তু বুধবার সাংবাদিকেরা উত্তর-পূর্ব দিল্লির অশোক নগরে, পাঁচ নম্বর গলিতে গিয়ে দেখেন, বড় মসজিদের মাথায় এখনও উড়ছে গেরুয়া পতাকা। লেখা আছে, ‘জয় শ্রীরাম’! ভিডিও ক্লিপে যে ধোঁয়া দেখা গিয়েছিল, সেই ধোঁয়া মসজিদে লাগানো আগুন থেকেই বেরোচ্ছিল বলে জানা গেছে। দুর্বৃত্তরা এসময়মসজিদে তাণ্ডব চালানোর পরে স্থানীয় মুসলিমদের কয়েকটি দোকান এবং কমপক্ষে তিনটি বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বিবিসি হিন্দি’র সাংবাদিক মসজিদের ভিতরে আধপোড়া কার্পেট ও টুপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেন। যেখানে ইমাম সাহেব দাঁড়ান সেই জায়গাও পুড়ে কালো হয়ে গেছে।

রিয়াজ সিদ্দিকি নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এসব করে লোকেরা কী অর্জন করছে? খুরশিদ আলম নামে ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি বলেন, আমরা এখন কী করব? আমাদের কিছুই অবশিষ্ট নেই। বেছে বেছে মুসলিমদের বাড়িতেই লুটপাট ও হামলা চালানো হয়েছে বলেও স্থানীয় মুসলিমরা জানান।

স্থানীয় হিন্দুরা বলেন, এখানে মসজিদ অনেক বছর ধরে রয়েছে। যারা মসজিদের ক্ষতি করেছে তারা বাইরের লোক। জিতেন্দ্র কুমার নামে ৬৪ বছরের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমি মসজিদে হামলা চালানোর বিরোধিতা করেছিলেন। ওরা বাইরের থেকে এসেছিল। তারা ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘ভারত মাতা কী জয়’ স্লোগান দিচ্ছিল। ওদের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছিলাম- এসব করলেও প্রতিবেশীদের ক্ষতিগ্রস্ত না করতে, তারা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের সঙ্গে বাস করে আসছে।’ কিন্তু হামলাকারীরা তার কথায় কান দেয়নি বলে জিতেন্দ্র কুমার জানান।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হলেও সেটিকে ‘ভুয়ো’ বলে অভিহিত করা হয়। মুম্বই থেকে রমেশ সোলাঙ্কি নামের এক ব্যক্তি অনলাইনে রানা আইয়ুবের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করেন। তার অভিযোগ,  ইচ্ছাকৃতভাবে দু’বছরের পুরোনো বিহারের ভিডিও পোস্ট করে অশান্তিতে উস্কানি দিচ্ছেন রানা। গণমাধ্যমে খবর ছড়ায় দিল্লির অশোক বিহারে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশের এক কর্মকর্তা অশোক বিহারে এমন কোনও ঘটনার কথা অস্বীকার করেন।

গুজরাটের গোধরা-পরবর্তী দাঙ্গা নিয়ে লেখা ‘গুজরাত ফাইলস’-এর লেখিকা-সাংবাদিক রাণা আইয়ুব শেষমেশ টুইটারে পোস্ট করা ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য হন। কিন্তু গতকাল (বুধবার) গণমাধ্যমের প্রতিনিধিনিধিরা দিল্লির অশোক নগরে পৌঁছে মসজিদে হামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাণা আইয়ুব ফের ওই হামলার ভিডিও আপলোড করেন।

এ সম্পর্কে সাবেক এমপি ও কংগ্রেসের মুখপাত্র উদিত রাজ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ভারতে কখনও শোনা যায়নি যে, এদেশের কোনও মন্দিরে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে কিন্তু আরএসএস/বিজেপি’র শাসনামলে, দেখুন দিল্লিতে, প্রকাশ্য দিবালোকে মসজিদে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করেছে।’

এদিকে, দিল্লির মুস্তাফাবাদের ব্রিজপুরি এলাকায় আরেকটি মসজিদে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, গতকাল রাত ৮টায় মসজিদে এশার নামাজ শুরু হলে সেখানে ঢুকে মুসল্লিদের রড দিয়ে পেটাতে শুরু করে দুর্বৃত্তরা। একইসঙ্গে গুলিও চালানো হয় মুসল্লিদের ওপর। এছাড়া সেখানকার মাদ্রাসা, স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনায়ও হামলা চালাতে বাদ রাখেনি উগ্রপন্থিরা।

সূত্র: পার্স টুডে

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী