দিল্লিতে সহিংসতায় নিহত বেড়ে ২৪, ঘর ছাড়ছেন আতঙ্কিত লোকজন

দিল্লিতে সহিংসতায় নিহত বেড়ে ২৪, ঘর ছাড়ছেন আতঙ্কিত লোকজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩৬ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২২:৫১ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলা থেকে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গত তিনদিন ধরে চলা এই সহিংসতায় অন্তত ৭০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন দুই শতাধিক লোক।

রণক্ষেত্রে রূপ নেয়া দিল্লিতে সহিংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। নগরীর দাঙ্গাকবলিত উত্তরপূর্বাঞ্চলে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। কোথাও কোথাও নেমে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা।

উত্তর-পূর্ব দিল্লির অনেক এলাকায় বাড়িঘর-দোকানপাট এমনকি মসজিদ-মাজারেও আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় বাড়িঘর ছাড়ছে আতঙ্কিত মানুষজন।

শহরের সহিংসতাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীকে দেয়া হয়েছে দাঙ্গাকারী দেখা মাত্রই গুলি করার নির্দেশও।

বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে গত দুই মাস ধরে বিক্ষোভ করে আসছিলেন নারীরা। ওই অবস্থানের কারণে বন্ধ হওয়া সড়ক কর্তৃপক্ষ খুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পর গত শনিবার রাত থেকে জাফরাবাদ মেট্রোস্টেশনে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জবাবে পরদিন বেলা ৩টায় প্রায় এক কিলোমিটার দূরের মৌজপুর চকে সিএএ সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে টুইট করেন দিল্লির বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। উগ্র হিন্দুত্ববাদী কপিলের সেই উসকানির পর সহিংসতা নতুন মাত্রা পায়। তাণ্ডব চালানো হয় মসজিদসহ মুসলিমদের দোকানে। হতাহত হয় বহু মানুষ।

সংঘাত শুরুর পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম ভারত সফর শুরু করেন। সেদিনই নিহত হন এক পুলিশ কনস্টেবলসহ চারজন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে, কেননা ট্রাম্পের সফর চাপা পড়ে যাচ্ছে সহিংসতার খবরের কাছে।

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ২৪ ঘণ্টায় তিনটি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ছিলেন আইপিএস অফিসার এসএন শ্রীবাস্তব। পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করার পর মঙ্গলবার তাকে বিশেষ পুলিশ কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

দিল্লির পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, উত্তর-পূর্ব দিল্লির মুস্তাফাবাদ এলাকার মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষজন ফের সহিংসতার আশঙ্কায় ব্যাগ-বস্তা নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ধর্মীয় এই সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, সহিংসতার সময় হিন্দুত্ববাদী হামলাকারীদের উৎসাহ দিয়েছে তারা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দিল্লির ধর্মীয় সহিংসতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ নিজের ঘরকেও আর নিরাপদ মনে করছেন না। সহিংসতা এই উত্তেজনায় তারা বাড়িঘর রেখে দিল্লি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। শুধু মুসলিম নয় এই তালিকায় আছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির এক মুসলিম বাসিন্দা ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘গতকাল বিকেলে হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিতে দিতে তারা আসে এবং সবকিছু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তারপর তারা দোকানপাট থেকে সব মালামাল লুট করে তাতেও আগুন দেয়ার পর মসজিদ তার পাশের দুটি বাড়িতে আগুন দেয় দলবেধে।’

এদিকে বুধবার দিল্লির চাঁদবাগ এলাকার একটি ড্রেন থেকে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে গতকাল এক পুলিশ কর্মকর্তাও সহিংসতার কবলে পড়ে প্রাণ হারান। এছাড়া একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ২৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্যান্ট খুলে ধর্ম যাচাইসহ নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে সাংবাদিকদের।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই ঘটনাকে ভীতিকর হিসেব অভিহিত করে সহিংস এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রায় ৫০০ তরুণের একটি দল অশোকনগর এলাকার একটি মসজিদে আগুন দিয়ে তার মিনারে হনুমানের পতাকা ঝুলিয়েছে।

বিবিসি বলছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে জাতিগত এই সহিংসতায় বেছে বেছে মুসলিমদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। এদিকে এই দাঙ্গার দায় কাঁধে নিয়ে বিজেপি দলীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে পদত্যাগ করার দাবি জানিয়েছেন দেশটির প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।

দিল্লির এই সহিংসতার জেরে বোর্ড পরীক্ষা স্থগিত রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বন্ধ রয়েছে শহরটির প্রায় সব সরকারি স্কুল।

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী/আরএ