‘দান মানুষের বিপদকে দূরীভূত করে দেয়’

‘দান মানুষের বিপদকে দূরীভূত করে দেয়’

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪৫ ২৫ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ২২:১২ ২৫ এপ্রিল ২০২০

যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করার ওপর খোটাও দেয় না এবং মানুষকে কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।’ (সূরাতুল বাকারাহ : আয়াত -২৬২)।

যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করার ওপর খোটাও দেয় না এবং মানুষকে কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।’ (সূরাতুল বাকারাহ : আয়াত -২৬২)।

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় দান বা সদকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দান করা একটি মহান ইবাদত। এই ইবাদতের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য যতটা সহজে লাভ করা যায়, অন্য কোনো ইবাদত দ্বারা ততটা সহজে লাভ করা কঠিন।

এখন অনেকে ভাবতে পারেন দান করতে অর্থ সম্পদের প্রয়োজন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দান বা সদকা করতে অর্থের প্রয়োজন হয় না। কারণ হাদিস শরিফে আছে প্রকৃত ধনী ওই ব্যক্তি যে মনের দিক দিয়ে ধনী। ধন থাকলেই মানুষ দান করতে পারে না। দান করতে অর্থের আগে মন লাগে। তাই অনেকে বলে, দান করতে বিত্তের চেয়ে চিত্তের প্রয়োজন বেশি। অনেকের ধারণা দান করলে সম্পদ কমে যায় এটি একটি ভুল ধারণা বরং সম্পদ বৃদ্ধি ও বরকত প্রাপ্ত হয়। দান করলে কেমন সম্পদ বাড়ে? এ ব্যাপারে কোরআনের একটি আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে,

مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

অর্থ : যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে আরো বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা : আয়াত নম্বর ২৬১)। 

কোরআনের আয়াতের সমর্থনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সদকা করলে কোনো মানুষের সম্পদ কমে না। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)। উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে একটি ঘটনা বর্ণনা করছি। ঘটনাটি হজরত উসমান রাযি. এর। সময়টা ছিল হজরত আবু বকর রাযি. এর শাসনামল। মদীনায় প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। হজরত উসমান রাযি. ছিলেন বড় মাপের ব্যবসায়ী। সেই মুহূর্তে তিনি মদিনাতে বড় ধরনের একটি খাদ্যের চালান আনলেন। শহরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ীরা দৌড়ে এসে বললো, আপনি আমাদের কাছে ৫০% লাভে মালগুলো বিক্রি করেন। আমরা এগুলো মহামারিতে আক্রান্ত দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকায় বিক্রি করবো। হজরত উসমান রাযি. বললেন, ‘তোমরা যদি আমাকে এক হাজার গুণ লাভ দিতে পারো, তবে আমি দিতে পারি। কেননা অন্য একজন আমাকে সাতশো গুণ লাভ দিতে দিয়েছেন।’

ব্যবসায়ী দল বললো, ‘সে কে? মদিনায় চালান আসার পর তো আমরাই প্রথম এলাম আপনার কাছে। সাতশো গুণ লাভের প্রস্তাব কে কখন দিয়েছে? অতঃপর উসমান রাযি. উপরিউক্ত আয়াত তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন। আর বললেন শোন! আমি এই মালামালগুলো মহামারি আক্রান্ত এলাকা বিলিয়ে দেবো বিনা পয়সায়। আল্লাহ সাতশোগুন বেশি বিনিময় দেবেন। হজরত উসমান রাযি. তার এই দান তার সম্পদকে শুধু বাড়িয়েই দেয়নি, বরং তার সব সম্পদ আল্লাহ দরবারে কবুল হয়েছে।

দান করলে শুধু ধন সম্পদ বৃত্তি পায় এমন নয়, দানের ফলে বিপদ আপদ দূর হয়। হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

الصدقة تدفع البلاء

অর্থ : দান মানুষের বিপদকে দূরীভূত করে দেয়।

দান করলে যে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া এরকম অনেক ঘটনা আমাদের আকাবিরদে জীবনীতে রয়েছে। তাযকেরাতুল আম্বিয়া থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। হজরত সুলাইমান আ. সব প্রাণীর ভাষা বুঝতেন। একদিন এক পাখি এসে বিচার দিলো যে, আমার বাসা থেকে অমুক ব্যক্তি ডিম নিয়ে যায়। যখনই আমি ডিম দিই, তখনই সে ডিম নিয়ে যায় এবং খেয়ে ফেলে! সুলাইমান আ. লোকটিকে ডেকে নিষেধ করে দিলেন যে, আর কোনদিন তার বাসা থেকে ডিম পারবে না! পরের দিনই ওই লোকটি হজরত সুলাইমান আ. এর নিষেধ অমান্য করে ডিম খেয়ে ফেলল। পাখিটি বিরক্ত হয়ে পুনরায় হজরত সুলাইমান আ. এর নিকট অভিযোগ করলো। এবার সুলাইমান আ. এক জিনকে নির্দেশ দিলেন- লোকটি যখন ডিম নিতে গাছে চড়বে, তখন খুব জোরে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে, যাতে লোকটি আর কোনো দিন গাছে চড়তে না পারে! যেই কথা সেই কাজ। জিন প্রস্তুত আজকে এলেই তাকে মাটিতে ফেলে দেবে। নিষেধ অমান্য করে ডিম খাওয়ার স্বাদ বুঝাবে। 

পরের দিন লোকটি যখন পাখির ডিমের জন্য গাছে উঠতে যাবে, এমন সময় এক ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক এসে হাঁক দিল বাবা! কিছু সাহায্য দিন। ওই লোকটি ক্ষুধার্ত ভিক্ষুককে এক মুষ্টি খাবার দান করলো। তারপর গাছে উঠলো। জিন আগে থেকেই প্রস্তুত। যখন জিন তার হুকুম পালনার্থে তাকে ফেলে দেবে ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে দুই দিক থেকে দুই ফেরেস্তা এসে ধরে ফেললো। লোকটি আরাম মতে ডিম নামিয়ে খেয়ে ফেললো। পাখিটি এবার একটু নারাজ হয়েই সুলাইমান আ.-এর কাছে এসে বললো, আপনি কি বিচার করেন। আজও আমার ডিম নিয়ে খেয়ে ফেলেছে।  সুলাইমান আ  সেই জিনকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে কি হুকুম দিয়ে ছিলাম! কেন করলে না? তখন জিন জবাব দিল, আমি আপনার নির্দেশ পালন করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম এবং নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষাও করছিলাম। কিন্তু আমি যখনই তাকে নিক্ষেপ করার জন্য হাত বাড়ালাম। এমন সময় পূর্ব ও পশ্চিম থেকে দুজন ফেরেস্তা এসে আমাকে ধরে ফেললো। সুলাইমান আ. বিস্মিত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, জিনটি বলল, আমি দেখলাম, লোকটি গাছে ওঠার আগে জনৈক ভিক্ষুককে এক মুষ্টি খাবার দান করল। সম্ভবত এর বরকতে আল্লাহপাক তাকে আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। সুলাইমান আ. বললেন, হ্যাঁ সদকা বালা-মুসিবত দূর করে। আর এ কারণেই সে তখন মহাবিপদ থেকে বেঁচে গেছে। উল্লিখিত হাদিস ঘটনা দ্বারা আমরা সুস্পষ্ট বুঝতে পেলাম বাস্তবিকই দান সদকা বিপদ আপদ দূর করে দেয়। 

প্রিয় পাঠক! আমাদের ইসলামি শরীয়তের কোথায় ঈর্ষা করা জায়েজ নেই। বুখারীর রেওয়াতে আছে শুধুমাত্র দু’টি স্থানে ঈর্ষা করা জায়েজ। একটি হলো ওই ব্যক্তির সঙ্গে যাকে আল্লাহ প্রভূত ইলম দিয়েছে অতঃপর সে ওই ইলম চর্চায় দিনরাত ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয়ত: ওই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছে আর সে দিনরাত ওই সম্পদ থেকে মানবকল্যাণের খরচ করে। মানবকল্যাণের যারা খরচ করে তাদের জ্ঞাতার্থে একটি হাদিস উল্লেখ করছি, আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা আকাশ থেকে জমিনে নেমে আসে। তাদের একজন দানকারীর জন্য দোয়া করেন এইভাবে যে, হে আল্লাহ! দানকারীর বিনিময়ে সম্পদ বৃদ্ধি করে দাও। আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদদোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণের মালে ধ্বংস দাও। (বুখারী ও মুসলিম)।

যারা দান করেন তাদের অনেকের ভাবেন এমন থাকে যে, তাদের দান কবুল হয় কি হয় না? তাদের সেই দোদুল্যমনাতাকে দুরিভূত করে আল্লাহ বলেন,

وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ

অর্থ : এবং তোমরা যারা আল্লাহর রাস্তায় দান করবে উহার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরাপুরি দেয়া হবে। আর তোমাদের প্রতি কোনো প্রকার জুলুম করা হবে না। (সূরাতুল আনফাল : আয়াত নম্বর ৬০)।

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, মানুষ কেন দান করবে না? এই ধন সম্পদ তো তাদের না। হজরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মানুষ বলে আমার সম্পদ, আমার সম্পদ অথচ তিনটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সম্পদই শুধু তার। ১. যা খেয়ে শেষ করেছে ২. যা পরিধান করে নষ্ট করেছে এবং ৩. যা দান করে জমা করেছে- তাই শুধু তার। আর অবশিষ্ট সম্পদ সে ছেড়ে যাবে, মানুষ তা শুধু নিয়ে যাবে। (মুসলিম)। 

দান বিষয়ে একটি সতর্কতামূলক আয়াত উল্লেখ করে প্রবন্ধের ইতি টানছি,

الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنفَقُوا مَنًّا وَلَا أَذًى ۙ لَّهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং যা ব্যয় করার ওপর খোটাও দেয় না এবং মানুষকে কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হবে না।’ (সূরাতুল বাকারাহ : আয়াত -২৬২)।

হে বিত্তশালী ভাই ও বোনেরা! বর্তমান সময়টা খুবই নাজুক ও জীবনকাতর সময়। এই সময়টাতে দান সদকা বড়ই প্রাসঙ্গিক। এই সময় দান অন্যান্য সময় থেকে বেশি নেকি ও বেশি নৈকট্য লাভের উপায়। হতে পারে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই আপনার মুক্তির ওসিলা হয়ে যাবে। জীবনেতো বহু ইবাদতই করেছেন, তবে সুযোগ মতো ইবাদত করার এখনই সময়। যারা এই সময়টাকে কাজে লাগাতে পারবে তাদের জন্যই রয়েছে জান্নাত ও মুক্তির সুসংবাদ। আজকে যারা মানুষের অসুবিধার মানুষের অসুবিধার কথা বিবেচনা করবে কাল কিয়ামতরে বিভীষিকাময় দিনেও তার কথা বিবেচনা করতঃ ক্ষমা করে দেবেন ইনশাআল্লাহ!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে