দাওয়াত হোক লিখনীর মাধ্যমেও

দাওয়াত হোক লিখনীর মাধ্যমেও

খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০২ ৯ জানুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অধিকাংশ নবীদের দাওয়াত ছিল জবানের মাধ্যমে। যেমন, কোরআনে অনেক নবীদের ঘটনা বর্ণিত রয়েছে, যারা জবানের মাধ্যমে মানুষদের দাওয়াত দিয়েছেন। তার উদাহরণ স্বরূপ রাসূল (সা:) এর বিশেষ একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। 

রাসূল (সা:) সাফা পাহাড় থেকে মক্কাবাসীদেরকে সর্বপ্রথম জবানের মাধ্যমেই দাওয়াত দিয়েছিলেন। যা রাসূল (সা.) এর সিরাতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়াও কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আর বিষয়টা সকলের নিকট বোধগম্য। তাই এদিকে আর আলোচনার প্রয়াস চালাচ্ছি না।

কলম যে ইলেম শিক্ষা করার মাধ্যম এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘পড়  তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, রক্তপিন্ড থেকে। তুমি পড়, এবং জেনে রাখ তোমার প্রভু বড়ই দয়ালু। (সূরা আলাক, আয়াত: ১-৫)।

আর জ্ঞাত বিষয় হলো, ইলম শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো ‘কলম’। কলমও দাওয়াতের অন্যতম মাধ্যম। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘নূন। শপথ কলমের (লেখার মাধ্যমে) এবং তারা (ফেরেস্তাগণ) যা লিপিবদ্ধ করে তার।’ (সূরা কলম, আয়াত : ১)। 
তথ্য পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় মাধ্যম কলম। তার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই কলমকে দাওয়াতের মহৎ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সূরা কাহাফের (১০৯ নাম্বার আয়াতে) আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘(হে নবী) আপনি বলুন, আমার মালিকের (প্রশংসার) কথাগুলো (লিপিবদ্ধ করা) এর জন্য যদি সমুদ্র কালি হয়ে যায়, তবে আমার মালিকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র শুকিয়ে যাবে। সাহায্যার্থে যদিও (কালির জন্য) এর মতো আরেকটি (সমুদ্র) আনয়ন করি। আল্লাহ তায়ালা কিতাব নাজিল করেছেন, যার উদ্দেশ্য সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ। মাখলুকের কাছে পৌঁছায়ে দেয়া, এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আল্লাহ তায়ালা ফলকসমূহকে বেছে নিয়েছেন, যাতে (কলমের মাধ্যমে) তাওরাত লিপিবদ্ধ। তা বনী ইসরাঈলদের নিকট পাঠানো হয়েছে। তো এর দ্বারা প্রকট হয় যে, কলমকে দাওয়াতের মহৎ কাজে ব্যবহার করা যায়। 

তা বিভিন্ন পদ্ধতিতে হতে পারে, কিতাবের মাধ্যমে, ফলকের মাধ্যমে ও চিঠি বা রেসালাতের মাধ্যমে। কিতাব ও ফলকের বিষয় আলোচনা করলাম, এবার রিসালাতের বিষয়ে কিছু প্রয়াস চালানো যাক। এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (র.) থেকে বর্নিত,  তিনি বলেন, রাসূল (সা.) রোমের বাদশা হিরাক্কিল বা হিরকলের কাছে, ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান (কলমের মাধ্যমে লিখে)। এরপরে তিনি চিঠি পড়েন, যার মর্মার্থ হলো পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমসম্রাট হিরক্কিল এর কাছে। শান্তি বর্ষিত হোক যে হেদায়াতের ডাকে সাড়া দেয়, তার পরের কথা হলো (নবী বলেন), আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ কর নিরাপত্তা পাবে, ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে উভয় জাহানে প্রতিদান দেবেন। আর যদি পিছপা হও, তাহলে গোত্রগুলোর বা প্রজাবর্গের গুনাহও তোমার ওপর বর্তাবে।

আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাবীদের দাওয়াত এর ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘তুমি বলো, হে আহলে কিতাব! আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে যে বাক্য অভিন্ন ও সাদৃশ্য রয়েছে তার দিকে এসো। যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত না করি। তার সঙ্গে কোনো অংশীদার স্থির না করি। আল্লাহ ব্যতীত আমরা পরস্পর কাউকে প্রভু রূপে গ্রহণ না করি,  অতঃপর যদি তারা ফিরে যায়, তবে বলে দাও সাক্ষী থাক যে, আমরাই মুসলিম।’ (সূরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ৬৪)।

রোমসম্রাট রাসূল (সা.) এর উক্ত চিঠি মোবারক পড়লেন এবং পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৭৭৩)। উক্ত হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, তার ইসলাম গ্রহণ করাটা রাসূল (সা.) এর একখানা ফলকই (চিঠি) মাধ্যম ছিলো। আর ফলকটি ছিলো রাসূল (সা.) এর পক্ষ থেকে, কলম দ্বারা লিখিত ইসলামের দাওয়াতনামা। তো বুঝা গেলো যে, কলমের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দেয়া, শুধু নবী ওয়ালা কাজই নয়। বরং তা নবীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) কিসরার (পারস্য সম্রাট) কায়সার (রোম সম্রাট) নাজ্জাশী (হাবশার সম্রাট) এবং প্রত্যেক অহংকারী ও প্রভাবশালী বাদশাহকে, আল্লাহ তায়ালার তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন (কলমে লিখিত চিঠির মাধ্যমে)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৭৭৪)।

মুরছিদ ইবনে জবইয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে একটি চিঠি আসলো। আমরা তা পড়ার জন্য কোনো কাতেব পাচ্ছিলাম না যে, আমাদেরকে তা পড়ে শোনাবে। অবশেষে বনী যবিয়্যাহ গোত্রের একজন ব্যক্তি তা পড়ে শোনালো। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর : ২০৬৮৬)।

হজরত ইবনে আব্বাস (র.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আরবের একটি গোত্রে চিঠি পাঠান। কিন্তু তারা তাতে সাড়া না দিয়ে নবীর নিকট ফেরত পাঠান। অতঃপর তিনি রাসূল (সা.) ইসলামের দাওয়াত নামাটি ঝুলনাদের (একজন ব্যক্তির নাম) নিকট চিঠি পাঠান। সে তাতে সাড়া দিয়ে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাসূল (সা.) এর জন্য হাদিয়াহ পাঠান এবং রাসূল (সা.) তা গ্রহণ করেন। (মুয়জামূল কাবীর -১২৯৪৭)।

মালেক ইবনে আহমার বলেন, যখন তার নিকটে রাসূল (সা.) এর আগমনের শুভবার্তা পৌঁছানো হলো তখন তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। একটি প্রতিনিধি দলকে রাসূলের কাছে এই বলে পাঠালেন যেন, তিনি তাকে একখানি চিঠি লিখে দেন। যার দ্বারা তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে পারবেন। ফলে রাসূল (সা.) চামড়ার একটি চিরকুটে লিখলেন, ‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মালিক ইবনে আহমারের এবং মুসলমানদের মধ্যে যারা তার অনুসারি তাদের জন্য এ চিঠি। সুতরাং যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে, মুসলমানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, কাফেরদের পদাঙ্ক পরিহার করে, তারা আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের জিম্মায়। (আল-মুয়জামুল আওসাত লিততাবরানী ৬৮১৯)।

উক্ত হাদিসগুলো দ্বারা প্রমাণ হচ্ছে যে, দাওয়াতের মতো মহৎ কাজ শুধু আসরের পরের গাশত ও মাগরিবের পরে আহাম বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই, আদৌ নবীওয়ালা কাজ আদায় হবে না। যারা শুধু তাবলিগকে ধনুক এবং ‘ছয় নম্বর’-কে তীর বানায়, দুর্বল বা সবল ঈমানধারী মুসলমানকে নিজের টার্গেট বানালে নবী ওয়ালা দাওয়াতি কাজের কোনো ফায়দা হাসিল করা যায় না। 

এ কথা অনুভব করা দরকার যে, ইসলামের দাওয়াত দুর্বল, মিসকিন ও অসহায়দের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের তাবলিগ শুধু ঈমানধারী মুসলমানদের সঙ্গে খাস নয়, বরং সব মানুষ ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করার অধিকার রাখে। তাই দাওয়াতে তাবলিগিই যে নবী ওয়ালা কাজ এমনটা কেউ দাবি করলে বুঝা যাবে তার মাঝে ইলেম এর কমতি রয়েছে। তাই ইসলামের দাওয়াতকে রাজা বাদশাহ, আমির-উমারা, প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীর কাছে পৌঁছানো অপরিহার্য কাজ। চাই তারা অমুসলিম হোক। আর এই লক্ষ্যের মূল হাতিয়ার হলো কলম। যার দ্বারা অতি সহজেই ঘায়েল করা যায়। উক্ত হাদিসসমূহ তার চাক্ষুস প্রমাণ। তাই দাঈ ভায়েরা বিশেষভাবে লক্ষ্যে রাখবে যে, আমাদের দাওয়াতি কাজটা যেন জবানের (মুখের) ভাষা-ভাষীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

আমাদের অনেক ভাইগণ অন্যকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে খুব তৎপর। কিন্তু কখনো নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে, মাদউ (দাওয়াতের প্রাপ্ত) বানায় না। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে-ই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত (পাপ বা দোষ যুক্ত) করবে।’ (সূরা : আশ শামস, আয়াত : ৯-১০)। অতঃপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার নিকট আত্নীয়বর্গকে সর্তক করে দাও।’ (সূরা : শুআরা, আয়াত : ২১৪)। 

এ সতর্ক কলম দ্বারা হতে পারে অথবা মুখের দ্বারাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়, নিজ আত্নীয়বর্গকে জবানের দ্বারা দাওয়াত দিতে ইতস্ত লাগে। তাই অনেক ক্ষেত্রে কলমই হবে উত্তম মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কলমের সৈনিক ও কলমের দাঈ হওয়ার তাওফিক দান করুক। আমিন।

সংগ্রহ : মাওলানা ওমর ফারুক

সূত্র : মাসিক আরমোগান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে