তেজপাতায় সংসার সতেজ জয়নুদ্দীনের  

তেজপাতায় সংসার সতেজ জয়নুদ্দীনের  

সাবজাল হোসেন,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২৭ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ

কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ

রান্নায় খাদ্য সামগ্রী সুস্বাদু করতে বাজার থেকে এ এলাকার মানুষ সব সময় তেজপাতা কিনলেও তারা জানতেন না কিভাবে চাষ করা হয় এ পাতার। তবে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। 

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কাদিরকোল গ্রামের কৃষক জয়নুদ্দীন খাঁ তার পাঁচ বিঘা জমিতে চাষ করে দূর করেছেন সংসারের অভাব-অনটন। বাড়তি আয়ে তার সংসার জীবন যেন হয়ে উঠেছে সজীব ও সতেজ। মাত্র ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করে এখন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার তেজপাতা বিক্রি করছেন। লাভজনক বলেই আরো কিছু কৃষক এ মসলাযুক্ত পাতা চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। 

সরেজমিনে কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর-দূর্গাপুর ইউপির কাদিরকোল গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁয়ের  সঙ্গে। তিনি জানান, ২০০৭ সালে ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে এ তেজপাতার চাষ দেখেন। এ চাষ দেখে তার খুব আগ্রহ হয় তেজপাতা চাষের। কিন্তু কোথাও চারা পাচ্ছিলেন না। এমন সময় তার এক বন্ধু খবর দেন এ চারা খুলনার বেজেরডাঙ্গা এলাকায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে ২০০৮ সালে বেজেরডাঙ্গা থেকে চারা নিয়ে আসেন। 

জয়নুদ্দিন জানান, ওই বছর প্রতি চারা ২০০ টাকা দরে ১০০টি চারা কিনে আনেন। এগুলো বাড়ির পাশে অপেক্ষাকৃত জঙ্গল আকৃতির জমিতে রোপন করেন। এরপর পরিচর্যা করতে থাকেন ওই গাছগুলো। এভাবে চার বছর পেরিয়ে গেলে গাছের ডালে ডালে পাতায় ভরে যায়। তখনই পাতা ভাঙ্গতে শুরু করেন। সেই থেকে তিনি প্রতিবছর দুইবার গাছ থেকে পাতা ভেঙে বিক্রি করেন। পাশাপাশি এটি লাভজনক হওয়ায় এ চাষ আরো বাড়িয়ে দেন। বর্তমানে তার চার বিঘা জমিতে ৪০০ তেজপাতা গাছ রয়েছে।  এ চাষ অপেক্ষাকৃত জঙ্গল পেরিয়ে ভালো চাষযোগ্য জমিতেও ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। 

কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ জানান, তেজপাতা চাষ করতে হলে জমিতে নামমাত্র চাষ দিয়ে নিতে হয়। এরপর সেখানে জৈব সার ছিটিয়ে দিতে হয়। তারপর সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক সার দিয়ে চারা লাগাতে হয়। এ গাছ ছাগল-গরুতে খায় না। পাতা গাছের ডালে ডালে থাকায় চুরি হবার সম্ভাবনাও কম থাকে। 

তিনি আরো জানান, একটি চারা রোপনের চার বছর পর থেকে পাতা পাওয়া যায়। ৫০ বছর পর্যন্ত পাতা পাওয়া যাবে। বর্তমানে তার প্রতিটি গাছ থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ কেজি পেয়ে থাকেন। যা বাজারে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। এতে তার ৪০০ গাছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার পাতা বিক্রি হয়। এ পাতা পেতে বর্তমানে তার খরচ হয় গাছ প্রতি ১০০ টাকা। 

তিনি বলেন, এ চাষে পরিশ্রম কম। আর একবার রোপণ করলে দীর্ঘ সময় ধরে পাতা পাওয়া যায়। তাই তিনি বাণিজ্যিকভাবে এ চাষ করছেন। 

তিনি জানান, প্রথম বছর তিন মণ পাতা বিক্রি করতে পারলেও বর্তমানে ১২ মণ পর্যন্ত পাতা বিক্রি করছেন। আগামী মৌসুমে ২০ মণ পাতা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। 

জয়নুদ্দিন খাঁ পেশায় কৃষক। মাঠে তার ১৮ বিঘা চাষযোগ্য জমি আছে। তার তিন মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়ে রাজিয়া খাতুন, রুজিয়া খাতুন ও কাজল পারভিনকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে জাকির হোসেনও বিয়ে করেছেন। 

ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে ঢাকায় থাকেন। জয়নুদ্দিন খাঁ তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন। আগে কাঁচা বাড়িতে থাকলেও বর্তমানে একতলা বিশিষ্ট পাকা বাড়ি করেছেন। তেজপাতা চাষ করে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। এক সময় মাঠে চাষযোগ্য জমি থাকা সত্ত্বেও ভালো ফসল ফলাতে না পেরে কষ্টে জীবন কাটাতে হয়েছে। এখন আর কোনো কিছুর জন্য কারো কাছে হাত পাততে হয় না।  

জয়নুদ্দিন খাঁ জানান, তেজপাতার কোনো ফল হয় না। আবার কলম করেও চারা তৈরি করা যায় না। এর জন্য কাবাব চিনির গাছ প্রয়োজন। কাবাব চিনির ফল থেকে চারা তৈরি হয়। সে চারায় কলম করে তৈরি হয় তেজপাতা গাছ। এভাবে চারা তৈরি করে তেজপাতার চাষ করতে হয়।  

কাদিরকোল গ্রামের আবুল কালাম জানান, জয়নুদ্দিনকে দেখে তিনিও এ তেজপাতা চাষ শুরু করেছেন। প্রথম বছর ৩৫ শতক জমিতে চাষ করেছেন। ভালো পাতাও পাচ্ছেন। আগামীতে আরো বেশি চাষ করা ইচ্ছা রয়েছে। 

আরেক কৃষক মিজানুর রহমানও বাড়ির আঙ্গিনায় ১০ শতক জমিতে এ তেজপাতা চাষ করেছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, মসলাযুক্ত পাতা তেজপাতার চাষ খুবই লাভজনক। তবে এ এলাকায় সচরাচর দেখা যায় না। তবে কাদিরকোল গ্রামে কয়েকজন কৃষক চাষ শুরু করেছেন। তারা সাধ্যমতো সাহায্য করছেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ