Alexa তীব্র শোকে অগাস্ট যখন জাগে...

তীব্র শোকে অগাস্ট যখন জাগে...

প্রকাশিত: ২১:২৯ ২৯ আগস্ট ২০১৯  

শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা আরা মাহমুদ। এক শক্তির প্রতীক। প্রেরণার উৎস। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট আলতাফ মাহমুদকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তুলে নেয়র পর থেকে একাই লড়ে গেছেন; যাচ্ছেন। একমাত্র কন্যা শাওন মাহমুদকে বড় করেছেন বাবার আদর্শে। 

অগাস্ট। আমার বুকে বিষম পাথর হয়ে আছে। আমিই আজও বেঁচে আছি। বেঁচে আছি আলতাফের স্বপ্নের স্বাধীন দেশে। কিন্তু এই অগাস্ট মাস এলেই আমার বুকে বাজে একটি গান। নাহ, আলতাফের নয়। অবস্কিওরের।

তীব্র শোকে অগাস্ট যখন জাগে/ হাতে উঠে আসে আগুন বর্ণমালা/ মহাবিশ্বের দৃশ্যেরা ছিঁড়ে যায়/ছোবল শেখায় শহীদের কথামালা। গানের নাম ‘ক্রাক প্লাটুন’। এই ক্রাকপ্লাটুনের নেতা ছিলেন আলতাফ। যারা একাত্তরের ঢাকার বুকে মুক্তিযুদ্ধের অজস্র স্মারক রেখে গেছেন। একের পর এক অ্যাকশনে জেরবার করে দিয়েছেন পাক হানাদারদের। তাদের হৃদয়ে সঞ্চার করেছিলেন ভীতি। ‘মুক্তি’ নামেই কেঁপে উঠত তারা। এই দলটিকে ধরা হয়েছিল অগাস্টের শেষ তিন দিনে। তারা প্রায় কেউ আর ফিরে আসেন নি। তাদের লাশও পাওয়া যায় নি। তাই তাদের সমাধিক্ষেত্র সারা বাংলাদেশ।

শহিদ আলতাফ মাহমুদকে সবাই চেনেন বা জানেন মহান সুরকার হিসেবে। সুরের বরপুত্র তিনি ছিলেন অবশ্যই। তাই সারা ফেব্রুয়ারি জুড়ে সারা বাংলাদেশে বাজে তার সুরারোপিত গান – ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। ’ সুর ভেসে বেড়ায়। কিন্তু যে কথাটা খুব কম উচ্চারিত হয়েছে তা হল আলতাফ একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক থেকে প্রসূত হয়েছে ক্রাকপ্লাটুনের বিভিন্ন আক্রমণের নীল নকশা। এই গেরিলা বাহিনীর সাফল্য ছিল সেই নিখুঁত নকশার ফসল। উলানপাড়া পাওয়ার স্টেশন ওড়ানো হবে গাজী দস্তগীরের নেতৃত্বে। সেদিন সকালে আলতাফ সাদা লুঙ্গি পরে গাড়ি চালিয়ে নিজেই রেকি করে এসেছিলেন। দুই মতিন, জিন্না, নীলুর সঙ্গে হাফিজও ছিল সেই অপারেশনে। নিখুঁত অপারেশন । উড়ে গেল পাওয়ার স্টেশন।  এরপরে ফার্মগেট অপারেশন চালাল মোট ৬ জন গেরিলা- সামাদ, জুয়েল, বদিউজ্জামান আলম, পুলু ও স্বপন। অপারেশনটি মাত্র তিন মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এ অপারেশনে মারা গিয়েছিল হানাদার বাহিনীর ৫ জন মিলিটারী পুলিশ ও তাদের সহযোগী ৬ জন রাজাকার। একই সময় রাত্রি নয়টার দিকে গুলবাগ পাওয়ার স্টেশনটিও উড়িয়ে দেয়া হয়। ক্র্যাক প্লাটুনের পুলু, সাইদ, জুয়েল, হানিফ ও বাশার আরেকটি দলে বিভক্ত হয়ে এই অপারেশন চালায়, নেতৃত্বে ছিল জুয়েল। ওয়াপদা পাওয়ার হাউজ অপারেশন করে মায়া, সামাদ,উলফত মিলে। কাঁটাবনের উত্তর পার্শ্বস্থ কেন্দ্রের উপর হামলাটি চালিয়েছিল আলম, জিয়া, বদি - চুল্লুর গাড়িতে করে। ১১ই আগস্ট, ৭১।  হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। আবার অপারেশন। আবদুস সামাদ, আবু বকর, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও গোলাম দস্তগীর। টাইম বোমা ফাটানো হল। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। বিশ্ব সংবাদপত্রসমূহে বাংলাদেশে মুক্তি-বাহিনীর তৎপরতার আরেকটি রোমাঞ্চকর সচিত্র সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।

১৯ আগস্ট, ৭১। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে কাজী কামালের নেতৃত্বে অপারেশন স্পট রেকি করতে গেল কাজী, বদি, জুয়েল, রুমি, ইব্রাহিম, জিয়া,আর আজাদ । তারা মুখোমুখি হল পাক সেনাদলের। চলল গুলি বিনিময়। জুয়েলের তিনটি আঙুল ভয়ংকর রকম জখম হলো। ২৫শে আগস্ট সন্ধ্যা। ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডে এক ব্রিগেডিয়ারের বাড়ির সামনে জনা দশেক মিলিটারি পুলিশকে খতম করল ক্রাকপ্লাটুনের বিচ্ছুরা। ১৮ নম্বরে অ্যাকশন শেষ করে ৫ নম্বর রোডের মাথায় চেকপোস্টে  বাধার মুখে আবারো গুলিবর্ষণ- এইবার দুজন আর্মি খতম। ঢাকা উদ্বেলিত ক্র্যাকপ্লাটুনের সাফল্যে। এই অ্যাকশনের মূল মাথা আলতাফের কাছেকমান্ডার খালেদ মোশারফের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার নির্দেশ এসেছিল। এদিকে পাক সেনারা পাগলা কুকুরের মত হিংস্র হয়ে উঠেছে। হোটেল ইন্টারকনে ১১ অগাস্টের বিস্ফোরনের জন্যে পাঠানো প্রচুর অস্ত্র ও গোলা বারুদ বেঁচে গেছে। কিন্তু রাখা হবে কোথায়? কোথায় পাঠানো হবে? কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। সবাই খুবই বিব্রত, শঙ্কিত ও চিন্তিত। বয়োজ্যেষ্ঠ আলতাফ মাহমুদ দায়িত্ব নিলেন।  রাতের অন্ধকারে তার কালো অস্টিন ক্যাম্ব্রিজ গাড়ির পিছনে ভরে সব অস্ত্র গোলাবারুদ আনা হল আমাদের বাসায়। রাতারাতি আমার দুই ভাই, সহকারী হাফিজ ও আবদুস সামাদের সাহায্যে অস্ত্র আনা হল। সামাদ চলে যেতেই উঠোনের কাঁঠাল গাছের নীচে সমস্ত অস্ত্র পুঁতে ইট বালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল। ২৯শে আগস্ট। আলবদরের কর্মীদের তথ্য মতো সকাল ১১ টায় বদিউল আলম ধরা পড়ে ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল জালালউদ্দিনের বাসা থেকে। বিকাল ৪ টার সময় ধরা পড়ে আব্দুস সামাদ। দুজনের উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন, সহ্য না করতে আবদুস সামাদ মুখখুলে এক এক করে বলে দিল সকল সহযোদ্ধার ঠিকানা, অপারেশনের বৃত্তান্ত । দ্রুত তৈরি হলো পাক বাহিনীর অ্যাকশন লিস্ট। ৩৫৫ এলিফ্যান্ট রোড - শফি ইমাম রুমী, ২০ নিউ ইস্কাটন - হাফিজ  উদ্দিন ,  ২৮ মগবাজার - মাগফার উদ্দিনচৌধুরী আজাদ ও আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল , গুলশান-২ এর ৯৬ নম্বর সড়কের ৩ নং বাড়ি -  আবু বকর, ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড - আলতাফ মাহমুদ, ৩০ নম্বর হাটখোলা - ফতেহ আলী চৌধুরী আর শাহাদাৎ চৌধুরী। একে একে ধরা হল জুয়েল, হাফিজ, আজাদ, বকর বদি, রুমি, জামী, আলভি, দীনু, লিনু, খনু, জালাল এবং আলতাফ মাহমুদকে। তারপরের কাহিনী এতই হৃদয়বিদারক যে লিখতে আমার কলম আটকে যায় বারেবারে। বিভিন্ন কাহিনীতে পড়েছি যে মুখগুলি ক্ষতবিক্ষত, দাঁত ভাঙা, শরীরের অস্থিসন্ধিগুলি আস্ত নেই, তুমুল জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন এক একজন। আহত অবস্থায় জুয়েল ধরা পড়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার স্বপ্ন ছিল তার। তারহাতের দুটি আঙ্গুল পাক বাহিনী কেটে ফেলে নির্মম নিষ্ঠুরতায়। প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখেও একটা কথা বলে নি সে। আমার চার ভাই, আলভি, জামী, জালাল আরো কেউ কেউ ছাড়া পায়। কিন্তু নাহ, চুল্লু ছাড়া বাকীরা ফিরে আসেনি। আমি অপেক্ষা করেছি। যেখানে খোঁজ পেয়েছি ছুটে গেছি। নাহ, পাইনি।

ক্র্যাক প্লাটুন দলটি গঠন করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন ২নং সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, বীরউত্তম এবং এটিএম হায়দার বীরউত্তম। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ২নং সেক্টরের অধীন একটি স্বতন্ত্র গেরিলা দল ছিল যারা আসলে গণবাহিনীর অংশ বলে পরিচিত। এই বাহিনীর সদস্যরা ভারতের ‘মেলাঘর’ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণে গ্রেনেড ছোড়া, আত্মগোপন করা, অতর্কিত হামলা প্রভৃতি শেখানো হয়েছে। ক্র্যাক প্লাটুন ঢাকা শহরে ছোটো বড় মিলিয়ে মোট ৮২টি অপারেশন পরিচালনা করে। যার বেশির ভাগই চরম দুঃসাহসী এবং অচিন্তনীয় ছিল। তারা মূলত ৫-৬ জনের একেকটা দলে থাকত এবং অভিযান পরিচালনা করত।

এর মধ্যে একজন – নাম ফতেহ আলী চৌধুরী।  ১৬ই ডিসেম্বর, আত্মসমর্পণের দিন ও সময় শুনে ফতেহ আলী চৌধুরী তার যোদ্ধাদের নিয়ে কাদা জল, ঝোপ জঙ্গল ভেঙ্গে চলে এল ঢাকায়। ১৭ই ডিসেম্বর সকালে রেডিও অফিসে চলে গেল আলম আর ফতেহ, সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিটে পাক বেতার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বেতারের যাত্রা শুরু হল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ ঘোষণা পাঠ করলেন মেজর হায়দার। হায়দারের নির্দেশে আলম আর ফতেহ সেন্ট্রাল জেল খুলে বন্দীদের মুক্ত করে দিল। তারপর সন্ধ্যায় একযোগে সবাই মিলে ঘেরাও করল ডিআইটি ভবন। ভবনে অবস্থিত টেলিভিশন সেন্টার দখলে নেবার পর প্রথমে পর্দার পর্দায় বড় করে লেখা উঠলো বাংলাদেশ টেলিভিশন। তারপর গেরিলা বাহিনীর প্রতি মেজর হায়দারের নির্দেশ ডিসপ্লে আকারে প্রদর্শিত হতে থাকলো স্ক্রিনে। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল ফতেহ আলী চৌধুরীকে। ফতেহ আলী বিশেষ ঘোষণা পাঠ করবার পর বিশেষ নির্দেশাবলী ও ঘোষণা পাঠ করলেন মেজর হায়দার।

১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বরের পর ফতেহ আলি চৌধুরীকে আর টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়নি। অনেক টেলিভিশন চ্যানেল তার সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছে, পত্রিকা তাকে নিয়ে করতে চেয়েছে রিপোর্ট, কিন্তু ফতেহ আলি রাজি হননি। কি বলেছিল ফতেহ - “ টর্চার সেলে ভয়ংকর নির্যাতন করা হয়েছিল রুমিকে, কিন্তু কোন তথ্য দেয় নাই রুমি, চোখে চোখ রেখে শুধু বলছিল, You people are going to die. You can’t flee, you can’t leave-Nobody can save you- I can tell you this much… ভয়ংকর মার খেয়েও বদি ঠাণ্ডা গলায় বলছিল, আমি কিছুই বলব না, যা ইচ্ছা করতে পারো। ইউ ক্যান গো টু হেল... ওদের কথা বলো, আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার কি হল? জীবন দিল জুয়েল, মরে গেল বকর, আজাদ, আলতাফ ভাই আর আমি এখন নিজেকে বীর বলে বাহাদুরী করবো? তোমরা ভাবছটা কি?”

আমি মনে রেখেছি বাংলাদেশের এই সূর্যসন্তানদের। এদের স্বপ্নের দেশে আমাদের বাস। তীব্র যন্ত্রণায় আমি আজও কেঁপে উঠি। আমার বুকে অগাস্ট সব  মিলে পাথর হয়ে বসে থাকে। আমার মনে পড়ে যায় কবি শামসুর রাহমানের ‘গেরিলা’ কবিতাটি।  

‘দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে
কুলুজি তোমার আঁতিপাঁতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে
ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন
করে খোঁজে প্রতিঘর। পারলে নীলিমা চিড়ে বের
করতো তোমাকে ওরা, দিত ডুব গহন পাতালে।
তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।‘ 

আমার সম্পূর্ণ হয় অগাস্ট স্মরণ। আমি বঙ্গবন্ধুকে অনুভব করি। আমি আলতাফকে অনুভব করি। আমি স্বাধীনতাকে স্পর্শ করি। আমি চোখের সামনে দেখতে পাই শেখ মুজিবের স্বপ্নের সাথে মিশে যাচ্ছে সকল শহিদের মুক্তির স্বপ্ন। লাল সবুজের পতাকা আমাকে ডাকে। পতাকার সাথে আমি উড়ে যাই বাংলাদেশের খোলা আকাশে।   

অনুলিখনঃ অমিত গোস্বামী