তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, পানিবন্দী ৩০ হাজার পরিবার

তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, পানিবন্দী ৩০ হাজার পরিবার

লালমনিরহাট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩৩ ১২ জুলাই ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তার বাম তীরে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যায় চরাঞ্চল ও তীরবর্তী গ্রামের ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

রোববার দুপুর ১২টায় দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৭৫ মিটার। যা (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ মিটার) বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এর আগে শনিবার (১০জুলাই) রাতে দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫৩ দশমিক ০৮ মিটার। যা (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ মিটার) বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

কয়েকদিন থেকে উজানে পাহাড়ি ঢলের মাত্রা বেড়ে যায়। একইসঙ্গে গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি প্রতিদিন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা নদীর বাম তীরে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার প্রায় ২৫-৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। 

তিস্তার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার রাস্তা-ঘাট ডুবে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চল। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো। চৌকি ও খাটের উপর মাচাং বানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পানিবন্দী পরিবারের মানুষগুলো। কেউ কেউ ঘর-বাড়ি ছেড়ে উঁচু বাঁধ বা পার্শ্ববর্তী গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। খুব কষ্টে পড়েছেন বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও শিশুরা। গবাদি পশু-পাখি নিয়েও চরম বিপাকে পানিবন্দী পরিবারগুলো। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে বন্যাদুর্গত এলাকায়।

তিস্তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জেগে ওঠা চরে বাদাম ও ভুট্টাসহ নানা জাতের সবজি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করত চরাঞ্চলের মানুষ। অনেকেই গবাদি পশু পালন ও মাছ চাষ করেও সংসারের চাকা সচল রেখেছেন। গত এক মাস ধরে থেমে থেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চরাঞ্চলের চাষিদের উঠতি ফসলের ক্ষেত বন্যার পানিতে ডুবে যায়। ভেসে যায় শত শত পুকুরের মাছ। বিশেষ করে বাদাম ক্ষেতের অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে চলমান বন্যায়। চরাঞ্চলের সব থেকে লাভবান ফসল বাদাম, এ বছর বন্যায় ডুবে যাওয়ায় তা ঘরে তুলতে পারেননি চাষিরা। 

লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউপির চর গোকুন্ডা গ্রামে ফয়সাল হোসেন বলেন, দুই দিন ধরে পানিবন্দী আছি। গত এক মাস ধরে থেমে থেমে বন্যা হচ্ছে। ২-৪ দিন টানা পানিবন্দী থাকতে হয়েছে। তিস্তার তলদেশ ভরাট হওয়ায় সামান্যতেই ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। শুক্রবার দুপুর থেকে চলতি বছরে চতুর্থবারের মতো পানিবন্দী হয়ে পড়েছি। এবারের পানির বেগ আগের থেকে অনেক বেশি। গত বন্যার চেয়ে এ বন্যায় পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যাও অনেক বেশি। 

তিস্তার বামতীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় সবগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাবে বলেও শঙ্কিত তিস্তাপাড়ের মানুষ। 

পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত শুক্রবার রাতে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী হাসপাতাল সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। স্থানীয়রা নিজেরাই বালুর বস্তা দিয়ে পানি প্রবাহ থেকে সড়কটি রক্ষার চেষ্টা করছেন। এটি ভেঙে গিয়ে বিগত ১৭ সালের বন্যায় লালমনিরহাট বুড়িমারী রেললাইন ভেঙে হাতীবান্ধা শহরে পানি প্রবেশ করে। সেই সংস্কার করা সড়কটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, শুক্রবার দুপুর থেকে রোববার পর্যন্ত পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার মধ্যরাতে মুহূর্তের মধ্যে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শনিবার ও রোববার পানি কিছুটা কমলেও বিপৎসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তার বাম তীরে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সেসঙ্গে তিস্তা ব্যারাজ রক্ষায় ৪৪টি জলকপাট খুলে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ বন্যা কিছুটা সময় স্থায়ী হতে পারে।

লালমনিরহাটের ডিসি আবু জাফর বলেন, তিস্তা নদীতে গভীরতা না থাকায় সামান্যতেই এ জেলায় বন্যা দেখা দেয়। তাই নদী খনন করে দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রস্তাব এরইমধ্যে পাঠানো হয়েছে। একনেকে অনুমোদন হলেই লালমনিরহাটবাসী বন্যা থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাবে। এছাড়া চলমান বন্যায় পানিবন্দী পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নিতে ইউএনওদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ