তাওবার তাৎপর্য

তাওবার তাৎপর্য

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৫৯ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

তওবা শব্দের অর্থ অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জিত হওয়া, ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। পারিভাষিক অর্থে তাওবা মানে-ভুল পথে ধাবিত ব্যক্তির হঠাৎ সচকিত হয়ে সম্বিত ফিরে পাওয়া। অনুতপ্ত, অনুশোচনা ও নিজের কৃতকর্মে লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না এ নিশ্চয়তা প্রদান করে অত্যন্ত খালেছ দিলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাকে তওবা বলা হয়। 

পৃথিবীর সর্বত্র শয়তানের জাল বিস্তৃত। তার চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের নিমিক্তে মানুষের সামনে, পেছনে, ডানে, বামে, ভালো ও বৈধতার মোড়কে অসংখ্য মায়াবি জাল সে পুঁতে রেখেছে। তাই মুমিন পুরুষ অথবা নারী সর্বপ্রকার সর্তকতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও যে কোনো সময় শয়তানের জালে পা রাখা অসম্ভবের কিছুই নয়

তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য সৃষ্টির মতো যেহেতু মানুষকে তার কঠিন বন্ধনে আবদ্ধ না করে তাকে দান করেছেন স্বাধীন বিবেক। তাই ভালো-মন্দ উভয় করার প্রবণতা তাদের রয়েছে। 

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا

فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا

قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا

وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا

‘মানব আত্নার শপথ, আর সেই সত্তার শপথ, যিনি তাকে সুগঠিত করেছেন। অতঃপর তার মধ্যে অন্তর্গত করে দিয়েছেন সীমা লঙ্ঘনের (ফুজুরের) প্রবণতা আর সীমার অবস্থানের (তাকওয়ার) প্রবণতা। সফল হলো সে ব্যক্তি, যে তার তাকওয়ার প্রবণতাকে বিকশিত ও উন্নত করেছে। আর ধ্বংস হলো সে, যে তার তাকওয়ার প্রবণতাকে দাবিয়ে দিয়েছে।’(সূরা: শামস, আয়াত: ৭-১০)।

ভালো ও মন্দ উভয় প্রবণতাই মানুষের ভেতরে অবস্থান করছে। একজন মুমিন-মুসলমান আমৃত্যু অবিরত তাকওয়াকেই বিকশিত করতে থাকবে। এর পরও যেন মাঝে মধ্যে পা পিছলে যাবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ শয়তান তখন আরো ভালো করে তার পিছু নেয়, পদস্খলনও ঘটিয়ে দিতে পারে।

তাই বলে করুণার আধার মহান রাব্বুল আরামিন আল্লাহ তায়ালা  ব্যক্তির ফিরে আসার সদর দরজা কি বন্ধ করে  দিয়েছেন? কখনো নয়। বরং তিনি তাঁর সদর দরজা বান্দার জন্য সর্বদা খুলে রেখেছেন। ব্যর্থ মনোরথ বান্দার সারা পৃথিবীর কোথাও আশ্রায় না পেয়ে আবার যাতে তাঁর অনুগ্রহের দৃষ্টির সীমানায় চলে আসে, সে জন্য তিনি তাঁর দরবারের করুণার দরজাটি দিনে-রাতে খুলে রেখেছেন। ফিরে আসার এ যে কসরত, এর নাম তওবা।

গুনাহ করার পর তওবার অর্থ হচ্ছে এই, যে দাশটি তার প্রভুর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে এখন নিজের কার্যকলাপে অনুতপ্ত। সে প্রভুর আনুগত্য করার ও তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য ফিরে এসেছে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার দিকে তওবা করার মানে হচ্ছে এই যে, দাসের ওপর থেকে প্রভুর যে অনুগ্রহ দৃষ্টি সরে গিয়েছিল তা আবার নতুন করে তার প্রতি নিবন্ধ হওয়া।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তবে এ কথা জেনে রাখো, আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হওয়ার অধিকার একমাত্র তারাই লাভ করে যারা অজ্ঞতার কারণে কোনো খারাপ কাজ করে বসে এবং তারপর অতিদ্র তওবা করে। এ ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ আবার তাঁর অনুগ্রহের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং আল্লাহ সব বিষয়ের খবর রাখেন, তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ। (সূরা নিসাঃ১৭)।

মহান আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে বলেন, আমার এখানে ক্ষমার দরজা একমাত্র সেসব বান্দার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, যারা ইচ্ছা করে নয় বরং অজ্ঞতার কারণে ভুল করে বসে এবং চোখের ওপর থেকে অজ্ঞতার পর্দা সরে গেলে লজ্জিত হয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয়। এমন বান্দা তার ভুল বুঝতে পেরে যখনই প্রভু মহান রাব্বুল আলামিনের দিকে ফিরে আসবে তখনই নিজের জন্য তাঁর দরজা উন্মুক্ত দেখতে পাবে: ‘আমার এ দরবারে আশাভঙ্গ হয় না কারো, শতবার ভেঙ্গেছে তওবা, তবুও আমি ফিরে এসো।’

আল্লাহর এক নাম তাওয়্যাব অর্থাৎ তওবা কবুলকারী। এটি আল্লাহ তায়ালার আশা ও উৎসাহ দানকারী গুণ। আল কোরআনে বিভিন্ন জায়গায় এ গুনটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে হচ্ছে যারা এখনো পর্যন্ত বিদ্রোহ করে চলছে অথবা যারা বারবার বিপদগামী হয়ে যায় তারা যেন নিরাশ না হয় এবং এ কথা ভেবে নিজেদের আচরণ পূর্ণবিবেচনা করে, এখনো যদি তারা এ আচরণ থেকে বিরত হয় তাহলে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করতে পারে।

কিন্তু আমাদের দেশে তওবার ব্যাপারে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। তা হলো, পাপ কাজ হচ্ছে, একটু বয়স হলে বা হজ থেকে এসে তওবা করে এ কাজ চেড়ে দেবো অথবা একটু বয়স হলে কর্তব্যের কাজটি শুরু করব। জীবনের এ গ্যারান্টি কোথা থেকে যে পায় এরা, তা বুঝে আসে না। প্রকৃতপক্ষে বয়স হলেও ভালো কাজ করার সুযোগ আর এদের মিলে না। মূলত, অপরাধ জানার সঙ্গে সঙ্গে তওবা করতে হবে। বয়স হলে তওবা করে খারাপ কাজ ছেড়ে দেবেন বা ভালো কাজ শুরু করবেন এ ধরনের সুযোগ ইসলামে নেই। তা ছাড়া ইতিমধ্যে যদি পরকালে চলে যাওয়ার সুযোগ মিলে, তবে তো নিজের পায়ে কুড়াল মারলেন। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আরো লক্ষ করা যায়, ব্যক্তির মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে ওজু-গোসল দিয়ে একজন হুজুর এনে তওবার ব্যবস্থা করা হয়। কোরআন হাদিসের দৃষ্টিতে এটিও ঠিক নয়।

যারা আল্লাহকে ভয় না করে সারা জীবন বেপরোয়াভাবে গুণাহ করতে থাকে তারপর ঠিক যখন মৃত্যুর ফেরেশতা সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে, তাদের জন্য ক্ষমা নেই, তাদের গুণাহের কোনো ক্ষমা নেই।  প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তওবা কবুল করতে থাকেন যতক্ষণ মৃত্যুর আলামাত দেখা না দেয়।’ কারণ যৌবন ও কৈশোরের মূল্যবান সময় বেহুদা সব কাজে ব্যয় করে এখন এ অসাড় ও মূল্যহীন জীবনটা আল্লাহর কী প্রয়োজনে আসবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মানুষটার জীবন-যৌবন ও ধন-দৌলত দান করেছিলেন তাঁর রাস্তায় ব্যয় করার জন্য।

কিন্তু সারা জীবন তার এ মূল্যবান জীবন ও ধন-সম্পদ খরচ করে এসেছে আল্লাহর বিরুদ্ধ সব পথে। এখন সে এমন এক স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পায় না। এখন আর তার প্রভাব-প্রতিপত্তি, জান-মাল ও সন্তান-সন্ততি তাকে আর বাহাদুরির শক্তি জোগায় না। রঙিন দুনিয়ার শেষ প্রান্তে এসে যখন পরবর্তী জীবনের হাতছানি দেখছে, এখন তার সম্বিত ফিরে এসেছে আর তাই তওবার হাত আল্লাহর দিকে প্রসারিত করেছে। এ অকর্মণ্য হাত আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহ এ হাত কবুল করবেন না। তওবা সময় থাকতে করতে হবে। কাজটি খারাপ হচ্ছে, এ কথা জানার সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে তা থেকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসতে হবে।

কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার আত্নীয়-স্বজনেরা কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করে থাকে। লাশ কবরে রাখার সময় নিন্মোক্ত দোয়াটিও পড়ে থাকে। ‘বিসমিল্লাহি আলা মিল্লাতি রাসূলুল্লাহ।’ অর্থাৎ আল্লাহর নামে রাসূল (সা.) এর দলে রেখে গেলাম। প্রশ্ন জাগে ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় যদি রাসূল (সা.) এর দলভুক্ত না হন, তাহলে মূল্যহীন গলিত পচা লাশটি রাসূল (সা.) তাঁর দলে নিয়ে কি করবেন? রাসূল (সা.) তো তাঁর দায়িত্বের বোঝা জীবিত লোকের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী আসবেন না।

এ দায়িত্ব আমাদের জীবিতরাই পালন করতে হবে। রাসূল (সা.) এর রক্তমাখা ইসলামকে বাদ দিয়ে যারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও অর্থ অন্য কোথাও খরচ করে, তারা মূলত ভুল পথে আছে। জেনে বুঝে এ পথে যারা চলতে থাকবে, আল্লাহ তাকে আমৃত্যুর এ পথে চলার সুযোগ করে দেবেন। আবার মৃত্যুর পর রাসূল (সা.) মরা লাশ গ্রহণ করবেন বলে ধারণা করা একান্তই বোকামি। আত্নীয়-স্বজন যারা কবরে লাশ রাখবেন, তাদেরকে এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের একটি মিথ্যা কথা এভাবে বলবেন না। এটি এক ধরনের প্রতারণার শামিল।

সারা জীবন লোকটি রাসূলের (সা.) দল করেনি, অথচ মৃত্যুর পর রাসূলের (সা.) দলে রেখে আসবেন, আপনাদের এ কর্মটিও রাসূল (সা.) পছন্দকরবেন না অবশ্যই। তাই সময় থাকতে সবাই সঠিক পথে ফিরে আসুন। তওবা করুন। যে কয়টি বর্ষ জীবন থেকে চলে গেছে, তার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হোন। কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবনের সঠিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক করে তাতে চলার চেষ্টা করুন। আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে