ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত জাদুঘর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত জাদুঘর

শোয়াইব আহমেদ, ঢাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫১ ২৬ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:০৬ ২৭ মার্চ ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের নাম। আর এই গৌরবকে স্মরণ করিয়ে দেয় অসংখ্য ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যগুলোর কাছে গেলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে মুক্তিযুদ্ধের ছবি। যা নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ছাড়াও দেশের বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাস।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য। যেনো পুরো বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন সংগ্রামের একটি জীবন্ত আর্কাইভ। দেশের মানুষের সমস্ত চেতনাকে প্রতিনিয়ত যেনো আলিঙ্গন করে এই ভাস্কর্যগুলো। এসব ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

অপরাজেয় বাংলা:

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সেরা একটি ভাস্কর্য এই অপরাজেয় বাংলা। শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ রূপায়িত এটিই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটিতে নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী-পুরুষ, ছাত্র সমাজসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বর্তমানে মিছিল-সমাবেশসহ অনেক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এটি। ভাস্কর্যটিকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রতীকী রূপ বললে মনে হয় ভুল হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এই ভাস্কর্যটি সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও একটি প্রতীক বা চিহ্ন হিসেবে গণ্য হয়ে উঠেছে। বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তিন নারী-পুরুষের ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভেদাভেদ ভুলে নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ লড়াইয়ের ইতিহাস জানিয়ে দেয়। 

স্বাধীনতা সংগ্রাম:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশে ফুলার রোডের সড়কদ্বীপে দেশের সর্বোচ্চ এই স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যটির অবস্থান। মূলত অনেকগুলো ভাস্কর্যের সমষ্টি। এক আঙ্গিনায় এত ভাস্কর্য দেশের আর কোথাও নেই। মূল ভাস্কর্যটিতে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন ধাপ-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের চিত্র নৈপুণ্যের সাথে এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা : 

ষাটের দশকের তরুণ প্রজন্ম ও দেশের সব পেশার মানুষের নিজস্ব ভাষা ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের পরিণতি হলো মুক্তিযুদ্ধ, যাতে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জনকে স্মরণ করে টিএসটির সড়কদ্বীপে ডাসের পেছনে নির্মাণ করা হয় ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ নামের ভাস্কর্যটি। যার ভাস্কর শামীম শিকদার। এই ভাস্কর্যের গা-জুড়ে রয়েছে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচাররে কয়েকটি খণ্ডচিত্র। এ ভাস্কর্য অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা জোগায়। চৌকো বেদির ওপর মূল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ওপরে বামে আছে মুক্তিযোদ্ধা কৃষক আর ডানে অস্ত্র হাতে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাঝখানে অস্ত্র হাতে নারী ও পুরুষ যোদ্ধারা উড়িয়েছে বিজয় নিশান। এ ভাস্কর্য বেদির বাম পাশে আছে ছাত্র-জনতার ওপর অত্যাচারের নির্মম চেহারা। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এ ভাস্কর্য গড়া শেষ হয়।

রাজু ভাস্কর্য:

বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের নিদর্শন এই রাজু ভাস্কর্য। ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ, বিশ্ববিদ্যালয়কে দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হন মঈন হোসেন রাজু। তার স্মৃতি রক্ষার্থে এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। এ ভাস্কর্যে বৃত্তাকারে স্থাপিত আটজন নারী-পুরুষের হাতে হাত ধরার মাধ্যমে হার না মানা প্রতিবাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। দেশের যেকোনো বিষয়ে আন্দোলন, প্রতিবাদের জন্য এখনও প্রতিনিয়ত উত্তাল থাকে ভাস্কর্যের পাদদেশটি। এটি নির্মিত হয় ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। শ্যামল চৌধুরী ও তার সহযোগী গোপাল পাল এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন যেটি ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৪ ফুট প্রস্থ এবং ১০ ফুট উঁচু।

মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য :

ভাষা আন্দোলন থেকে পরবর্তী সকল আন্দোলনসহ দেশের অধিকাংশ ছাত্র আন্দোলন ও সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন। মধুসূদন দে যিনি মধুদা' নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তার নাম অনুসারে এই ক্যান্টিনটির নামকরণ করা হয়েছে। ৭১-এর ২৬শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শহীদ হন মধুসূদন দে। তার স্মৃতিকে স্মরণ করে রাখতে মধুর ক্যান্টিনের সামনে তৈরি করা হয় এই ভাস্কর্য।এর ভাস্কর মো. তৌফিক হোসেন খান।

স্মৃতি চিরন্তন :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পশ্চিম পাশের নীলক্ষেত-ফুলার রোডের সংযোগ স্থলে সড়ক দ্বীপে অবস্থিত টেরাকোটা সংবলিত স্মারক নিদর্শন-স্মৃতি চিরন্তন (Memory Eternal)। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আত্মত্যাগ-তারই নিদর্শন স্বরূপ গ্রানাইট পাথরের তৈরি ছোট বড় ১৪টি দেয়াল। বেদিতে ওঠার সময় কালো সিঁড়ির উভয় পাশে বাংলা ও ইংরেজিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং বিজয়ের পরপরই রাজাকার-আলবদরদের হাতে নিহত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর শহীদ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘স্মৃতি চিরন্তন’ শিরোনামে নাম ফলক। ১৯৮৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। 

২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটির সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়। সংস্কার করার সাথে সাথে স্মৃতি চিরন্তনের সৌন্দয বর্ধনের উদ্দেশ্যে এখানে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন একটি পানির ফোয়ারা। 

বীরশ্রেষ্ঠ স্মারক ভাস্কর্য : 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্বেন স্মৃতিকে চির সমাদৃত করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর সংলগ্ন আনোয়ার পাশা ভবনের সামনে নির্মাণ করা হয় এ ভাস্কর্যটি। যার ভাস্কর শামীম শিকদার।

প্রত্যাশা :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আনোয়ার পাশা ভবনের কাছেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মরণে তৈরি করা হয় ‘প্রত্যাশা’ ভাস্কর্যটি। এটির ভাস্কর মৃণাল হক। 

রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভ ভাস্কর্য :

একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করা রাজাকারের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার সামনে এই ‘ঘৃণাস্তম্ভ’টি নির্মাণ করা হয়। এটি দুই ফুট উচ্চতার কালো রঙের স্তম্ভ। মাথায় ত্রিভুজাকৃতি করা টুপির আদল যা রাজাকারের প্রতীক। ২০০৭ সালে এটি নির্মাণ করা হয় যার তিন পাশে লেখা আছে রাজাকার, আল বদর ও আস শামস। ভাস্কর্যের পেছনে লেখা রয়েছে- 'ঘৃণাস্তম্ভে রাজাকারদের ধিক্কার জানান'৷ নির্মিত এ ভাস্কর্যটি কয়েক বছর জঞ্জালে ঢাকা পড়ে থাকলেও কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরপরই রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভটির আবারও পরিস্কার করে এর আয়তন বাড়ানো হয়।

সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ :

সাতজন বীরের প্রতিমূর্তি ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যদিও দেখতে মোটেই ভাস্কর্যের মত নয় এটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুরের পূর্ব পাড়ে ফজলুল হক মুসলিম হলে আঙ্গিনায় এটি অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর শিক্ষার্থীদের যুগান্তকারী অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। এ সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নামক ভাস্কর্যটি সাতজন বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে নয় বরং '৭১ এ শহীদ হওয়া সাতজন বীর যোদ্ধাকে স্মরণ করে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় স্থাপিত এসব ভাস্কর্যগুলো প্রতিনিয়ত আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার প্রেরণা যুগিয়ে থাকে। অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকে অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে সত্যের পথে অবিচল থেকে নিজের অধিকার সংরক্ষণের।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম