Alexa টেস্টে বাংলাদেশের আফগান শিক্ষা

টেস্টে বাংলাদেশের আফগান শিক্ষা

প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

এমন একটা সময় ছিলো যখন আমরা টেস্ট ক্রিকেট খেলতাম অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। যার শুরু ২০০০ সাল থেকে। এরপর দেখতে দেখতে আমাদের প্রায় ১৯ বছর হয়ে গেলো সাদা পোশাকে। কিন্তু দীর্ঘ ১৯ বছরের পথ চলায় এই তত্ত্বের মধ্যেই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট। 

সম্প্রতি আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর নতুন করে সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসলো। বিশেষ করে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে। বাংলাদেশ ১৯ বছরের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হলেও এবার আফগানিস্তানের মতো নবীন একটি দলের কাছে নতুন করে শিখলো টেস্ট ক্রিকেট কিভাবে খেলতে হয়। বাংলাদেশের এমন পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যেন টেস্টে নতুন কোন বাংলাদেশ।

বিপরীতে আফগানদের টেস্টে পারফরম্যান্স দেখুন। চলতি বছর দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামে তারা। ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ তারিখটা আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের জন্য বিশেষ একটি দিন। এই দিনটি নিশ্চিতভাবে ক্যালেন্ডারে স্মরণীভাবে দাগ কেটে রেখেছেন রশিদ খান-মোহাম্মদ নবীরা। কেননা, সেই দিনেই যে তারা প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল। দেরাদুনে একমাত্র টেস্টে আয়ারল্যান্ডকে ৭ উইকেটে হারিয়েছে আফগানিস্তান। গত বছর অভিষেকের পর দুই দলের জন্যই এটি ছিল দ্বিতীয় টেস্ট, তাই প্রথম জয়ের সুযোগ ছিল দুই দলের সামনেই। যে সুযোগটা দুই হাতে নিয়েছিল আফগানিস্তান। অবশ্য এর আগে গত বছরের জুনে ব্যাঙ্গালুরুতে আফগানিস্তান তাদের অভিষেক টেস্টে ভারতের কাছে দুই দিনেই হেরেছিল ইনিংস ব্যবধানে।

৯ মাস পর দ্বিতীয় টেস্টেই প্রথম জয় পায় আফগানরা। আফগানিস্তানের চেয়ে কম ম্যাচ খেলে প্রথম টেস্ট জয় পেয়েছে শুধু অস্ট্রেলিয়াই। অজিরা জিতেছিল ইতিহাসের প্রথম টেস্টই। সেটা ১৮৭৭ সালের ১৯ মার্চ মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আফগানিস্তানের মতো নিজেদের দ্বিতীয় টেস্টে প্রথম জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান। ইংল্যান্ড প্রথম জয় পেয়েছিল অভিষেকের পরের মাসে, পাকিস্তান অভিষেকের মাসেই। তালিকায় এরপর আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয়রা প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ষষ্ঠ টেস্টে, সময় লেগেছিল দুই বছর। এরপর আছে জিম্বাবুয়ে। ৩ বছরে ১১তম টেস্টে এসে জয় পেয়েছিল জিম্বাবুয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার লেগেছিল ১২ টেস্ট। সময়ের হিসেবে প্রায় ১৭ বছর। শ্রীলঙ্কা ৩ বছরে ১৪তম টেস্টে এসে প্রথম জয় পায়। ভারতের ২৪ বছর লেগেছে প্রথম টেস্ট জিততে। আর সময় লেগেছে ২৫ বছর। বাংলাদেশ ৩৫তম টেস্টে প্রথম জয় পায়। এর মাঝে চলে গেছে ৫ বছর। আর এক্ষেত্রে প্রথম টেস্ট জিততে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে নিউজিল্যান্ডের। ২৬ বছর খেলে ৪৫তম টেস্টে প্রথম জয়ের দেখা পায় কিউইরা।

এবার বাংলাদেশকে চট্টগ্রাম টেস্টে হারিয়ে আর একটি দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পাশে নাম লেখালো আফগানরা। নিজেদের তৃতীয় টেস্টে জয় পায় তারা। এর আগে শুধু অস্ট্রেলিয়াই নিজেদের তৃতীয় টেস্টে জয় পেয়েছিল। তবে এক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে একটি দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গেলো আফগানরা। প্রথম টেস্ট হারলেও নিজেদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্টে, মানে টানা দুই টেস্টে জয় পেলো আফগানিস্তান। যা এর আগে কেউ করতে পারেনি। এমনকি অস্ট্রেলিয়াও পারেনি। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ও তৃতীয় টেস্ট জিতেছিল। প্রথম তিন টেস্টের মধ্যে টানা দুই জয় নেই। যা এখন শুধুই আছে আফগানিস্তানের। 

এখানে আফগানদের জয়ের এতো পরিসংখ্যান তুলে ধরার কারণ টেস্টে দুর্দান্ত পারফম করেছে তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কিছুটা শক্তিশালী দলকে খুব সহজেই হারিয়ে দিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশকে প্রথম দেখায় হারিয়ে দেয়া সহজ কথা নয়। কিন্তু সেই কঠিন কাজটি খুব সহজ ভাবে করলো সফরকারীরা। চট্টগ্রাম টেস্টে বৃষ্টিও বাংলাদেশকে বাচাতে পারেনি। আফগানদের এই সাফল্যের বিপরীতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের ব্যর্থতা নিয়ে। কেনো টেস্টে একটি নবীন দলের কাছে এমন অসহায় ভাবে হারতে হবে টাইগারদের। কোথায় ঘটতি রয়েছে দলের।

বাংলাদেশের এমন ব্যর্থতায় উঠেছে অনেক প্রশ্ন। এখানে একটা মজার বিষয় হলো টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম টেস্টে কোন পেস বোলার দলে রাখা হয়নি। বাংলাদেশ মনে করেছে তাদের যে মানের স্পিনার রয়েছে তাতে আফগানদের ঘায়েল করতে যথেষ্ট। কারণ বর্তমানে লেগ স্পিনারদের সময় চলছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে দাপট দেখাবে। কিন্তু বাংলাদেশের সেই ভাবনা সত্যি হয়নি। উল্টো নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই ধরা পড়েছে। বরং আফগান স্পিনারদের ঘূর্ণিতে দিশেহারা ছিলেন সাকিব-মুশফিকরা। বিশেষ করে এক রশিদ খানের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ। এই জয়ের মধ্যদিয়ে ১৮ মার্চের পর ৯ সেপ্টেম্বর আফগানদের জন্য অশেষ আনন্দের দিন হয়ে রইল। আর বাংলাদেশের জন্য হয়ে রইল অস্বস্তি। এই অস্বস্তি ১৯ বছরের পথচলায় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে না পারার। এই ব্যর্থতা অবশ্যই আমাদের ক্রিকেটের জন্য ভালো কোন ইঙ্গিত নয়।

বাংলাদেশ অনেক দিন ধরে সাদা পোষাকে ক্রিকেট খেললেও এই ফরম্যাটে ধারাবাহিকভাবে আশানুরূপ সাফল্য পায়নি কখনোই। কিন্তু এখন আফগানদের কাছে এমন পারফরম্যান্সের পর যেন আসল চেহারাটা পরিস্কার হয়ে উঠলো।

এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবেই সম্ভব সাফল্য। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর