টিভি নাটকে যত্রতত্র ভাষার বিকৃতি

টিভি নাটকে যত্রতত্র ভাষার বিকৃতি

নাজমুল আহসান, সেন্ট্রাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:০৮ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২০:০৬ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

ভাষা বিকৃতির মহোৎসব চলছে চারদিকে। ঘরের ড্রয়িং রুম থেকে শুরু এ বিকৃতির। পথে নেমে কান পাতলে শোনা যায় শত রকমের বিকৃত বাংলা উচ্চারণ। দেশের নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারেন না। এদের অনেকের কাছেই ইংরেজি ও বাংলার মিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের ভাষা। যার ফলে বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও মর্যাদা রীতিমতো হুমকির সম্মুখীন।

এক সময় টেলিভিশন নাটকে সংলাপের ক্ষেত্রে ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষার শক্তিশালী অবস্থান ছিলো। নব্বইয়ের দশকের নাটকগুলোতে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রতি নির্মাতাদের গুরুত্ব ছিল বেশি। কিন্তু আজকাল আমাদের নাটকের সংলাপ তার বিপরীতমুখী। এখন নাটকে চলিত ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারই বেশি চোখে পড়ে। এদিকে আঞ্চলিকতার নামে ভাষা বিকৃতির মহোৎসব চলছে।  অনেক নাটকে আবার বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত ভাষাও ব্যবহার করছে।

অনেক অভিনয়শিল্পীরা মনে করেন, জাতীয় গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনে ভাষার মান বজায় রাখা প্রয়োজন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত ভাষা ব্যবহার কারো কাম্য নয়। 

নাটকে ভাষার বিকৃতির বিষয়ে ড. ইনামুল হক বলেন, নাটকের ভাষা বিকৃতি দেখলে খুবই আহত হই। আঞ্চলিক ভাষায় আমরা নাটক করতেই পারি কিন্তু সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষাটাও সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও আঞ্চলিক ভাষাকে টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। আবার বাংলিশ ভাষার ব্যবহারও এখন দেখি। নাটকে যদি ভাষার বিকৃতি এভাবে চলতে থাকে, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব নতুন প্রজন্মের ওপর। তাই জাতির ও নতুন প্রজন্মের স্বার্থে নাটক বা সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে একজন নির্মাতাকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যাতে ভাষার যথাযথ ব্যবহার হয়।

আফসানা মিমি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম আর রক্ত ঝরিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার পেয়েছি আমরা। তাই নাটকে নিজের ভাষা বিকৃত করে উপস্থাপন করা আমাদের ভাষার অনেক বড় ক্ষতি হচ্ছে বলেই আমি মনে করি। টিভি নাটকে বাংলা ভাষার উচ্চারণে অশুদ্ধতা, অসংলগ্নতা একেবারেই সমর্থন করি না। আমাদের দ্রুত ভাষা বিকৃতির এ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা উচিত। 

নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের বলেন, আমাদের মনে রাখা উচিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা যে কোনো মাধ্যমে যা-ই করি না কেন, সেখানে শুদ্ধরূপে প্রমিত বাংলার ব্যবহার থাকা উচিত। আমরা যখন কোনো ভাষা উচ্চারণ করতে যাই তখন সে ভাষার অভিধানে যেভাবে উচ্চারণ রয়েছে সেভাবেই তা করা উচিত। নাটক-সিনেমার সংলাপ লেখতে গেলেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। আমি মনে করি, নাটক-সিনেমায় যারা বাংলা ভাষাকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন তারা ঠিক করছেন না।

খাইরুল আলম সবুজ বলেন, নাটকে ভাষা বিকৃতি সমাজের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলা ভাষার যে মার্জিত রূপ সেটা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যহত হচ্ছে এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে এটা জাতির জন্য হুমকি স্বরুপ। ভাষা বিকৃতি দেশ ও সমাজের জন্য সুখের খবর নয়। আঞ্চলিক নাটকে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। কিন্তু বর্তমানে ভাষার সংমিশ্রনে নতুন করে বিবৃত করার চেষ্টা চলছে, এটি মোটেও উচিত নয়। যারা করছে তাদের দেশের বা নতুন প্রজন্মের স্বার্থে বিরত থাকা দরকার। 

লাকী ইনাম বলেন, নাটকে ভাষার বিকৃতি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। যে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে সেই শুদ্ধ বাংলাভাষার ব্যবহার টিভি নাটকে নেই বললেই চলে। টিভি নাটকে বাংলাভাষা রুচিহীন হচ্ছে। নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অশুদ্ধ বাংলা ভাষার ব্যবহার পরিহার করা জরুরি।

জনপ্রিয় অভিনেতা সজল বলেন, বর্তমানে নাটকে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বেশি লক্ষ্যণীয়। এটাকে আমরা ভাষার বিকৃতি বলতে পারি না। তবে কিছু কিছু নাটকে ভাষার হ-য-ব-র-ল ব্যবহার যে নেই তা নয়। তবে সেগুলোর পরিমাণ খুব একটা যে বেশি সেটিও কিন্তু নয়। ভাষার বিকৃতি কখনোই মেনে নেয়া উচিৎ না। দর্শকরা যদি কিছু শিখতে না পারেন তাহলে সে কাজ করে কী লাভ?

ডেইলি বাংলাদেশ/এনএ/এসআই