দূরবীনপ্রথম প্রহর

টিটোর স্বাধীনতা ও কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

অমিত গোস্বামী
কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

নাম – শহিদ গোলাম মোহাম্মদ দস্তগীর/ পিতা – মৃত গোলাম মোস্তাফা/জন্ম – ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬/নিবাস – উত্তর সেওতা, মানিকগঞ্জ।

প্রিয় বাংলাদেশ, এই শহীদকে চেনেন? বেশিরভাগের না চেনারই কথা। এর নামে কোনো সড়ক নেই। এর নামে কোনো সদন নেই। এর স্থান হয়নি পাঠ্যবইয়ের কোথাও। সম্ভবত বাংলাদেশের সর্বশেষ কনিষ্ঠতম শহীদ যে যুদ্ধে মারা যায়। এর ডাক নাম টিটো।

টিটোর বাবা-মাকে-ভাইকে পাক হানাদাররা গুলি করে মেরেছিল ১৯৭১-এ। টিটো পালিয়ে বেঁচেছিল। তখন তার বয়েস চোদ্দ মাত্র। সে হাজির হয়েছিল সেক্টর কমান্ডার খালেদ মশারফের কাছে। সে যুদ্ধে যাবে। পাক হানাদারদের মেরে তাড়িয়ে স্বাধীনতা দেখবে। ‘যুদ্ধে যাওয়ার বয়েস তোমার হয়নি’ খালেদ মশারফ বুঝিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু তার যুদ্ধে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছের কাছে হার মানলেন সেক্টর কমান্ডার। তিনি টিটোকে সমর্পণ করলেন কমান্ডার মানিক ও কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর কাছে।

৪৫০ জনের মুক্তিবাহিনী নিয়ে এই দুই কমান্ডার ক্রমশ এগোচ্ছেন ঢাকার দিকে। পাক হানাদারদের সাভারের কাছে শেষ প্রতিরোধ ভাঙতে। লড়াই ছিল অগ্নিবর্ষী। কমান্ডার মানিক ও প্রায় ৪৪ জন মুক্তিযোদ্ধা এই লড়াইয়ে শহীদ হলেন। পুরো দলের দায়িত্ব পড়ল কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর কাঁধে। দল প্রস্তুত হল শেষ যুদ্ধের জন্যে। টাঙ্গাইল ময়মনসিংহের পর্যুদস্ত পাক বাহিনী ঢাকায় প্রতিরোধ করার জন্যে ফিরছিল। কিন্তু এদের যেতে দেয়া যাবে না। মুখোমুখি যুদ্ধে এদের হারাতে হবে। প্রস্তুত হল মুক্তি বাহিনী কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর নেতৃত্বে। এর পরেরটা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর মুখে শুনুন।

‘চারশ মুক্তিযোদ্ধাকে আলাদা করে চারভাগে ভাগ করা হল। তিনটি একশজনের দল আক্রমনে যাবে। একটি একশজনের দল জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্বে থাকল। প্রয়োজনে এরা কভার দেবে।

টিটো পড়ে গেল জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার দলে। ও কেঁদে ফেলল। আমার হাত ধরে বলল, আমায় নিয়া যান। আমি যুদ্ধ করুম। আমি স্বাধীনতা দেখুম। আইজই তো শেষ যুদ্ধ। আমি হেসে বললাম, কে বলল আজ শেষ যুদ্ধ! আমরা অনেকে আজ নাও ফিরতে পারি, তাই সবাইকে আজ বোঝালাম। ও লাফ দিয়ে উঠল, আপনারা সব মইরা যাবেন আমি বাঁইচা থাকুম ক্যান? আমার ভাই মরছে। আমি আইছি যুদ্ধে। আমিও মরুম।

ভোরের আলো আঁধারি কেটে কুয়াশা ভেঙে সূর্যালোকে পৃথিবী হেসে উঠেছে। হঠাত নিস্তব্ধতার পাথর ফুঁড়ে কানে ভেসে আসে ধুপধাপ বুটের শব্দ। অনেক সৈন্যের। পাকিস্তানীরা ঢুকে পড়েছে আমাদের অ্যামবুশ বা ফাঁদে। এগিয়ে যাচ্ছে তারা তীক্ষ্ণ চোখ রেখে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রাঙ্ক ১ অর্থাৎ প্রথম দল গুলি করছে না। ওরা আমাদের অর্থাৎ মূল দলের সোজাসুজি এলে গুলি চালানো হবে। কিন্তু এত শত্রুকে চোখের সামনে দেখে ঠিক থাকতে পারলো না আমাদের এক সহযোদ্ধা। পুরো শত্রু বাহিনী অ্যামবুশে ঢোকার আগে গুলি ছুঁড়লো। তড়িৎ গতিতে অবস্থান নিল শত্রুপক্ষ। আমরা সবাই হতবাক। প্রচন্ড পালটা আক্রমন করল শত্রু বাহিনী। শুরু হল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। শত্রু বাহিনীর যারা ফাঁদের বাইরে তার অবস্থান নিলো অত্যন্ত সুসংহত ভাবে। ওরা ভারী মেশিন গান বসিয়েছে। ওদের মূল শক্তি ওই ভারী মেশিনগান ও দুপাশের আটটা হালকা মেশিন গান।

প্রথম আধঘন্টা যুদ্ধ চলল। কিছুতেই ওদের কাবু করতে পারছি না। আমরা নীচে অবস্থান করাতে কিছুই করতে পারছি না। মাথা তোলার কোন সুযোগ নেই। একমাত্র ফ্রাঙ্ক ২ অর্থাৎ তৃতীয় দল পারে একটু বাঁয়ে পশ্চিমে সরে শত্রুর পিছনে অবস্থান নিয়ে যদি কেউ জীবন বাজি রেখে ঐ মেশিন গান যে চালাচ্ছে তাকে খতম করতে, তবেই আমরা পারব ওদের কাবু করতে।

আমার পাশে আরিফ। আমি আরিফকে বললাম, দোড় দিয়ে ফ্রাঙ্ক ২ এর নুরুকে নির্দেশ দিতে ওরা যেন ভারী মেশিনগানকে নিস্তব্ধ করে দেয়। আরিফ নিজে না গিয়ে পাশে যুদ্ধরত টিটোকে যেতে বলল। যুদ্ধের নিয়ম কিশোর টিটো জানত না। ও যে কখন আমার পাশে শুয়ে গুলি চালাচ্ছে আমি জানতাম না। টিটো লাফ দিয়ে দৌড়ে গেল নুরুর দিকে। আমার নির্দেশ চিৎকার করতে করতে। গর্জে উঠল ভারী মেশিন গান। একঝাঁক গুলি টিটোর বুক চিরে ফেলল। মাটি থেকে প্রায় দু’হাত উপরে ছিটকে উঠল টিটো। মাত্র দশ মিটার সামনে। রাগে দুঃখে আমরা সামনে এগিয়ে গেলাম। শত্রুর প্রচণ্ড গুলিতে আমাদের তিন জন আহত হল। হঠাত দেখি এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে পাকিস্তানীদের পিছন দিক দিয়ে এগিয়ে আসছে মেশিনগানের দিকে। কী অবিশ্বাস্য গতি। মুহুর্তের মধ্যে নুরু মেশিন গান পোস্টের বিশ মিটারের মধ্যে চলে এলএবং নির্ভুল নিশানায় হত্যা করল ঘাতক মেশিন গান চালককে। পিছন থেকে অতর্কিত আক্রমনে দিশেহারা শত্রুরা। একের পর এক শত্রু নিধন করল নুরু ও তার সঙ্গীরা। আধ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানীদের সকল উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

আরিফ ও কয়েকজন মিলে আহত টিটোকে নিয়ে এল ক্যাম্পে। টিটোর ডান পাশের থেকে কাঁধ পর্যন্ত অসংখ্য গুলিতে সে ছিন্নভিন্ন। একটা পাটির ওপরে শোয়ানো টিটোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে ক্যাম্পের উঠোন। আমাকে দেখে টিটো চিৎকার করে বলল, ভাই, ভাই, আমি স্বাধীনতা দেখতে চাই। আমারে বাঁচান। আমি স্বাধীনতা দেখুম। স্বাধীনতা দেইখ্যা আমি মরুম।

সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। গাছের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে টিটো। কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসছে, আমি স্বাধীনতা দেখতে চাই, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা...

টিটো চলে গেল। কবর হল সাভার ডেয়ারি ফার্মের গেইটের ডান ধারে।

সেখানে মাটির নীচে টিটো শুয়ে আছে টিটো – নীরবে।‘

তথ্যসূত্রঃ ‘টিটোর স্বাধীনতা’ নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু রচিত

অবসকিওর ও টিটোর স্বাধীনতা

অবসকিওর ব্যান্ডকে তো অনেক মানুষই চেনেন। আর তার প্রাণপুরুষ সায়িদ হাসান টিপুকে? আরো অনেক অনেক মানুষ। তার প্রমাণ পেয়েছি ঢাকায়, কলকাতায়। ‘মাঝরাতে চাঁদ’ গানটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে অবসকিওর ব্যান্ড ২০১৪ থেকে নিজস্ব ঘরানার কাজের পাশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান করা শুরু করছে। একে একে সৃষ্টি হয়েছে- ‘স্বাধীনতার বীজমন্ত্র’, ’আজাদ’, ’ক্র্যাক প্লাটুন’, ’আলতাফ’, ’তিস্তা’, ’ফিলিস্তিন’, ’পিতা’, ’দেশ ছাড় রাজাকার’, ’পরোয়ানা’, ’স্টপ জেনোসাইড’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জনচেতনার কাজ এই ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে দিতে এখনও কেউ পেরেছে বলে আমার জানা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে এ গানগুলো দিয়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে দলটি। তারই ধারাবাহিকতায় আসছে তাদের নতুন গান ‘টিটোর স্বাধীনতা’। ‘টিটোর স্বাধীনতা’ গানটির কথা এ’রকম-

মনের মাঝে ঘুরে বেড়াস দূরে থেকেও পাশে/ তোর কবরে রোদ পড়েছে সবুজ কচি ঘাসে/ চোদ্দ বছর বয়েস ছিল যখন এলি কাছে/ মুক্তিকামী কিশোর টিটো আমার পাশে পাশে/ বারেবারে যুদ্ধে যাওয়ার আগুন প্রবণতা/ সেদিন ছিল সাভার জুড়ে শত্রু আসার কথা/ আমরা ছিলাম মধ্যমাতে ডাইনে বাঁয়ে আরো/ কেন যে তুই দৌড়ে গেলি ডাক না শুনে কারো/ হানাদারের বৃষ্টি বুলেট বিঁধল বুকের মাঝে

শহীদ হলি টিটো আমার স্পষ্ট মনে আছে/ শেষ কথাটা বলেছিলি দেখব স্বাধীনতা কেউ ফেরাতে পারেনি আর মৃত্যু খরস্রোতা

অবসকিওর ও আমি

প্রথমেই বিনীতভাবে বলি গানের কথাগুলি আমি লিখেছি। আমি লিরিসিস্ট নই। নিতান্ত কবি। আমায় দিয়ে লিখিয়ে নেয় সায়িদ হাসান টিপু। খুব কড়া মাস্টার সে। তার কাছে আমার গান নির্বাচিত হওয়ার সময় বেশ কিছু কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। হয়ত কথাটা বলা সামান্য স্পর্ধা হয়ে যাবে, তবু বলি। অবসকিওরের দশটি স্বাধীনতা ও জনচেতনার গানের মধ্যে ছ’টাতেই গীতিকার হিসেবে আমার নাম থাকলেও ওগুলো টিপুর গান। আমি শব্দ সংযোজন করেছি মাত্র। স্পর্ধাটা আমি দেখাচ্ছি এই কথা বলে যে সায়িদ হাসান টিপু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যান্ডের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিউজিশিয়ান ও গায়ক।

- অমিত, টিটোর স্বাধীনতা নিয়ে দেখো তো গান বাঁধা যায় কী না!

এই মেসেজটা আমার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিল। এর আগে যখন আমি লাগাতার বাংলাদেশের তিস্তা পানির দাবীকে সমর্থন করে একের পর এক নিবন্ধ, কবিতা লিখছি। নিজের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের সঠিক দাবীকে সমর্থন করে মতপ্রকাশ করছি। সে সময়ে টিপুর একটি মেসেজ ছিল – অমিত, গান অনেক সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, কবিতা বা নিবন্ধের সময় লাগে, তুমি ‘তিস্তা’ নিয়ে গান লেখো। আমি গানের ‘গ’ জানি না। লিখে ফেললাম একটি লিরিকধর্মী কবিতা। টিপু আপন মুন্সীয়ানায় তাকে গড়ে তুলল গান। সৃষ্টি হল ‘তিস্তা’ গানটি। এরপরে নিজামীর ফাঁসি ও গোলাম আজমের মৃত্যুর পরে তীব্র ঘৃণায় আমার হাত থেকে বেরোল একটি কবিতা। টিপু তাকে সাজিয়ে গুজিয়ে করে ফেলল গান। তৈরি হল– দেশ ছাড় রাজাকার। বাংলাদেশ জুড়ে ব্লগার হত্যা শুরু হল। কিছুদিন বাদে নিহত হল আমার প্রকাশক বন্ধু ফায়সল আরেফিন দীপন। আমাকেও সমানে মেসেঞ্জারে মৃত্যুভয় দেখানো হল। আমি ভীতু নই। তীব্র যন্ত্রনায় লিখলাম ‘পরোয়ানা’। টিপু একে গান বানালো। এমনই কপাল যে গানটি প্রকাশিত হল আর্টিজান হত্যাকান্ডের দু’দিন আগে। এফ এম স্টেশন গুলি লাগাতার বাজাতে লাগল গানটি। রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আসতে শুরু করল তখন আমি মোটেই রোহিঙ্গাদের পক্ষে ছিলাম না। রোহিঙ্গারা অশিক্ষিত আবার মৌলবাদী। বিভিন্ন দেশে তারা ইসলামিক স্টেট তৈরির জন্যে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে লড়েছে। তারা ঐতিহাসিকভাবে এতটাই মৌলবাদী ও শৃঙ্খলাবিহীন যে স্বয়ং মহম্মদা আলি জিন্নাহ তাদের ১৯৪৭ সালে শত আবেদন সত্ত্বেও আরাকান দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করেন নি। পরে তারা আদ্যোপান্ত পাকিস্তানের সমর্থক। এমন কি ১৯৭১ এ এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। আমি কীভাবে এদের স্বাগত বলতে পারি? কিন্তু যখন আং সু চি’র সমর্থনে মিয়ানামার সরকারের সেনা এদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে মধ্যযুগীয় অত্যাচার শুরু করল এবং এরা দলে দলে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে মানবেতর জীবন মেনে নিল, তখন লিখলাম ‘স্টপ জেনোসাইড’। টিপু তীব্র আবেদনময় সুরে একে গানে পরিণত করল। রোহিঙ্গাদের সমর্থনে বোধহয় এটা সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীত।

কিন্তু এবারে লিখতে হবে ‘টিটোর স্বাধীনতা’ নিয়ে। প্রথমে দুটি গান লিখলাম সারাদিন ধরে। মনের মত হল না। বারো ঘন্টায় দুটি অশ্বডিম্ব প্রসব করলাম। দুত্তোরি, বলে উঠে ব্যালকনিতে দাড়ালাম। আমার মধ্যে আলতাফ ভর করল। আমি একটা জিনিষ অনুভব করি আমি যখন সৃষ্টিশীলতার সংকটে ভুগি তখন আমার মধ্যে যেন শহিদ আলতাফ মাহমুদের আত্মা ভর করে। টিপুর মধ্যেও করে বলে জানি। তখন আর আমি লিখি না। আমার মনে হয় আমাকে দিয়ে কেউ লেখায় যার মুন্সীয়ানা আমাদের স্বাভাবিক ক্ষমতার অনেক ওপরে। আমি অশরীরী কিছুতে এমনিতে বিশ্বাসী নই। কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। কাজেই বসলাম লিখতে। বড়জোর চল্লিশ মিনিট। চল্লিশ নিনিটে লিখে ফেললাম গানটা। টিপুকে পাঠাতেই লেপের থেকে লাফিয়ে উঠল সে। সুর সংযোজনের লক্ষ্যে। এইবারের অ্যালবামে প্রথম কমপোজিশন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও টিটোর স্বাধীনতা

‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধায় টিটোর এই যুদ্ধের মর্মান্তিক বর্ণনা দিয়েছেন। তবে অন্য আঙ্গিকে। জনৈক অধ্যাপকের সঙ্গী হিসেবে। নাসির উদ্দীন বাচ্চুর সঙ্গী হিসেবে নয়। বাচ্চু কমান্ডার, আরিফ ও নুরুর আলাদা উল্লেখ করেছেন। সুনীল’দা যখন পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাস লেখেন তখন তার হাতে বেশি মুক্তিযুদ্ধের ওপরে লিখিত বই ছিল না। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ও কিছু সদ্য প্রকাশিত বই। তখন বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় সামরিক বাহিনী। কলকাতায় অবাধ যাতায়াত নেই। বইও আসত কম। ফলে সুনীল’দার পক্ষে সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ ছিল না। তবুও টিটোর এই বলিদান খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন তিনি।

নব্বইয়ের দশকে একবার সুনীল’দা ঢাকায় এসেছে্ন। নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফের অতিথি হয়ে। রাতে আড্ডা চলছে। আরিফও উপস্থিত। নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রশ্ন করলেন।

-আচ্ছা সুনীল’দা। আপনি যে বাচ্চু কমান্ডার, আরিফ, নুরুর উল্লেখ করেছেন পূর্ব-পশ্চিম বইটিতে আপনি তাদের কখনও দেখেছেন?

-নাহ। দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি।

-সে কী এদের দুজনকে গত দু’দিন ধরে দেখছেন...

-কোথায়?

-আরে আপনার সামনে আমি বাচ্চু কমান্ডার আর এই আরিফ...

-সে কী, আমি তো জানি না।

এই অবধি বলে উঠে জড়িয়ে ধরলেন দুজনকে। সেই রাত্রে সুনীল’দা নাসির উদ্দীন ইউসুফের কাছে শুনলেন সাভারের সেই যুদ্ধিকথা যা তার রচনার চেয়ে সামান্য ভিন্ন হলেও সঙ্গতিপূর্ণ। সুনীল’দার চোখে টিটো হয়ে উঠলেন সত্যিকারের কিশোর বীর।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ও টিটোর স্বাধীনতা

নাসির উদ্দীন ইউসুফের লেখা ‘টিটোর স্বাধীনতা’ মাত্র ১৯ পাতার বই। কিন্তু ছত্রে ছত্রে কী অসাধারন বর্ণনা। পাক হানাদার বাহিনীর রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এই মুক্তিযোদ্ধা যখন যুদ্ধের বর্ণনা করেন তখন কখনও তার চোখ জ্বলে ওঠে প্রতিহিংসায় কখনও সজল হয়ে ওঠে। টিটোর প্রতি আজও যে টান তিনি অনুভব করে তা সহোদরের চেয়ে কম নয়। নাসির উদ্দীন ইউসুফের নিজের জীবন কম নাটকীয় নয়। পড়াশোনা, যুদ্ধে যাওয়া, ট্রেনিং নেওয়া, কমান্ডার হয়ে ওঠা, পেশাদার সেনানায়কের মত কৌশল নির্ধারন করা, যুদ্ধ শেষে সরকারি প্রসাদ থেকে নির্লিপ্ত থেকে নাট্যদল গঠন, গ্রাম থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার স্বপক্ষে দ্বিধাহীন সমর্থন, ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ না করে সংস্কৃতি নিয়ে জীবন যাপন তাকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। তার জীবন সবসময়ই অনুকরনীয়।

‘টিটোর স্বাধীনতা’ গানটি এখনও প্রকাশিত হয় নি। বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়ার জন্যে আমার নাম গীতিকার, কবি বা ঔপন্যাসিক হিসেবে কোন পুরস্কারের জন্যে কখনও বিবেচিত হবে না আমি জানি। সে লোভও আমার নেই। কিন্তু প্রতিনিয়ত যে পুরস্কার আমি পেয়ে চলেছি বাংলাদেশের সোনার সন্তানদের থেকে তা যে কোন পুরস্কারের থেকে অনেক অনেক বেশি। এই তো কয়েকদিন আগে শহিদ আলতাফ মাহমুদের শাল গলায় তার কন্যা শাওন যে ছবি তুলল সে ছবিতে আমি প্রাণপনে আমার আবেগাশ্রু চাপছিলাম। এ পুরস্কার অতুলনীয়। এবারে গানটির লিরিক পড়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফ লিখেলেন –

অমিত

টিটোকে নিয়ে গানটি মন ছুয়ে গেছে রে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তোর রচিত গানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু পূর্ব বাংলার মানুষের যুদ্ধ ছিল না।ওটি বাঙালী জাতিসত্তার মুক্তির লড়াই ছিলো। টিটোকে নিয়ে গানটির অন্তরে যে প্রেম ও বেদনা আমি অনুভব করেছি তাতো শুধু একজন গীতিকারের নিত্যকার পেশাদারী কৃৎকৌশল নয় । এতো এক নিবিড় বিশ্বাস।মুক্তিসেনার জন্য এক বাঙালী গীতিকারের ভালোবাসা ভালোবাসা....!

বাচ্চুবাবা

মুক্তিযুদ্ধের গান ও কিছু অভিমান

এই ‘টিটোর স্বাধীনতা’ গানটির ঘোষনা সোশাল সাইটে আসার পরে শহিদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা, সায়িদ হাসান টিপুর স্ত্রী ও স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে তীব্র সংগ্রামী শাওন মাহমুদ একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন –

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান, পেছন সারিতে স্থান।

মুক্তিযুদ্ধকে শব্দের কথামালায় গাঁথতে চায় না কেউ তেমন। গানের জন্য তো আরো নয়। যুদ্ধকে সুরের মিটারে ফেলে গান লেখার মতন কষ্টকর কাজটি তাই অগ্রহনযোগ্য তালিকায় বসে থাকে। সুর করতে গিয়ে চোখের জলে ভিজে যায় গিটারের তার। কাগজে ছাপা কালো কালির লেখাগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। গলায় জমাট বাঁধে বেদনার একরাশ স্রোত। গাইতে গেলে সুরের বাঁধন ছিড়ে আঁছড়ে পড়ে স্বরের খাঁদে। সুরকে ধরতে কষ্ট হয় তাই।

মুক্তিযুদ্ধ এক কঠিন বাস্তবের নাম। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা আরেক কঠিন পরীক্ষার বিষয়। আশেপাশে বেশীর ভাগ মানুষকে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের আবেগে অশ্রুপাত করতে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কাজ করে থাকে, হাতে গোণা কয়েকজন। তারা করে, নিজের সাধ্যমতন, কিছু না পাওয়ার আকাংক্ষা থেকে। তারা জানে মুক্তিযুদ্ধকে দেয়ার মতন কিছু নেই, মুক্তিযুদ্ধ যা দেয়ার সব দিয়ে গেছে আমাদের।

টিপুকে মুক্তিযুদ্ধের গান করবার জন্য বলিনি কখনও। আমার সাথে পথ চলতে চলতে তার মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কাজ করবার ইচ্ছে আপণ গতিতেই সৃষ্টি হয়েছিল। মেলোডি গানের রাজা টিপু, ২০১৪ থেকে তার ঘরানার কাজের পাশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান করা শুরু করে। স্বভাবতই টিপুকে ঘিড়ে গড়ে ওঠা 'অবসকিওর' মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে যায় আপণ লয়ে। একে একে সৃষ্টি হয় -

'স্বাধীনতার বীজমন্ত্র', 'আজাদ' ,'ক্র্যাক প্লাটুন','আলতাফ','তিস্তা', 'ফিলিস্তিন', 'পিতা', 'দেশ ছাড় রাজাকার' , 'পরোয়ানা', 'স্টপ জেনোসাইড'

অবসকিওর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এগিয়ে গেছে যোজন যোজন দূর। কিন্তু থমকে গেছে তাঁদের ডাক পাওয়ার পালা। গত কয়েক বছরে খুব খেয়াল করে দেখলাম, এই সময়গুলোতে অবসকিওর সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে প্রচুর কিন্তু এসব গান গাইবার জন্য আয়োজকদের থেকে ডাক পেয়েছে সামান্য।

আমার মন খারাপ হয়। কষ্ট লাগে না। বছর জুড়ে মুক্তিযুদ্ধকে বেচে খাওয়া আয়োজকরা স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে 'আজাদ' শুনবার চেয়ে 'অপরাধী' শুনতে ভালোবাসে। তা এদেশেই হোক আর প্রবাসেই হোক না কেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান, পেছন সারিতে স্থান। ইহাই সত্য, মেনে নিয়েছি আমি এবং অবসকিওর। সবার জন্য ভালোবাসা।

এই পোস্টটা আমায় ভাবিয়েছে। কারন সৃষ্টিশীলতার পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে রাজানুগ্রহের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজন বিভিন্ন কনসার্ট আয়োজনকারীদের কাছ থেকে অনুষ্ঠানের কাছ থেকে ডাক। সরকারী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ। শুধু এই গানগুলি দিয়েই একটা অনুষ্ঠান হয়। আমি নিজে এবার কবি মিল্টন হাসনাত, কাজী আহমেদ পারভেজ ও আজাদ আবুল কালাম প্রতিষ্ঠিত ‘কল রেডি’ সংস্থার হয়ে নির্বাচনের প্রাক্কালে স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রচারের জন্যে কাজ করতে ঢাকায় গিয়েছিলাম। সেই কাজ করার সময় দেখেছি যে তরুন প্রজন্মের ওপর এই গানগুলির প্রভাব। কিন্তু সমস্যা একটাই। রাজানুগ্রহ শুন্য। সরকারি অনুষ্ঠানে এই গান নয়, কোমর দোলানো তাৎক্ষনিক স্ফুর্তির গানে মশগুল আমলা কামলা– সব্বাই।

তাই বোধ হয় আজ সাবধানবানী উচ্চারনের পালা। স্বাধীনতার চেতনার পক্ষের গান যদি প্রচার না পায় একদিন এগুলি অবলুপ্ত হবে। ‘পিতা’ গান অবলুপ্ত হলে জাতির পিতারই অবমাননা হবে। সেদিন কি কেউ আজকের মত বলতে পারবেন বিরোধীরা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী? সে দিন দুধ ও জলের পার্থক্য থাকবে না। কাজেই সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গানকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়ার।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর