জোর করে জরায়ু কেটে ‘বন্ধ্যা’ করানো হয়

জোর করে জরায়ু কেটে ‘বন্ধ্যা’ করানো হয়

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:৪৪ ১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৪ ১ মার্চ ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

‘দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার জন্য চেষ্টা করছিলাম। দিন পার হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আমি কোনোভাবেই গর্ভবতী হচ্ছিলাম না। কেন এমনটি হচ্ছে? আমি তো এর আগেও মা হয়েছি। অতঃপর চিকিৎসককে দেখালাম। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষার পর আমাকে যা জানায় তা শুনে সত্যিই আমি মুষড়ে পড়ি। 

চিকিৎসক বললেন, আপনার তো জরায়ু নেই, মা হবেন কীভাবে? তিনিই জানালেন আমার জরায়ু কেটে ফেলা হয়েছে। মুহূর্তেই আমি নির্বাক হয়ে যাই। আমার শরীরে জরায়ু নেই অথচ আমি নিজেই জানিনা। তাও কিনা জানলাম ১১ বছর পর। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে কথাগুলো বলছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এক নারী বঙ্গেকিলি এমসিবি। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি প্রথম সন্তান জন্ম দেন। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে না জানিয়েই জরায়ু কেটে বন্ধ্যা বানিয়ে দিয়েছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার কমিশন ফর জেন্ডার ইকুয়ালিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি হাসপাতালে এই নারীসহ মোট ৪৮ জনকে না জানিয়েই বন্ধ্যা করা হয়েছিল। তবে কমিশন জানিয়েছে, রোগীদের ফাইল গায়েব হওয়ার কারণে তাদের তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারাও তদন্তকারীদের সহায়তা করেনি। তদন্ত কর্মীরা পনেরটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে এবং এর মধ্যে কিছু ২০০১ সালের ঘটনাও আছে।

বঙ্গেকিলি এমসিবিনা জানিয়ে জরায়ু ফেলে দিয়ে বন্ধ্যা করে দেয়ার ঘটনা আফ্রিকায় অনেক আগে থেকেই বেশ প্রচলিত। তবুও এ বিষয়ে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে মন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য কমিশনকে তার সঙ্গে বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ জানান। 

বঙ্গেকিলি এমসিবি তার প্রথম সন্তান জন্মের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, আমি সন্তান জন্ম দেয়ার পর যখন জেগে উঠলাম, তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কেনো আমার তলপেটে এতো ব্যান্ডেজ? তারা বলেছিল সিজার করা হয়েছে যেহেতু ব্যান্ডেজ তো থাকবেই! আমিও কিছু মনে করিনি। আমাকে অবশ করা হয়েছিল সিজারের জন্য। অতঃপর ডেলিভারির পাঁচদিন পর হাসপাতাল ছেড়েছিলাম। একে একে পার হলো ১১ বছর। আমি বিন্দুমাত্র টের পায়নি যে, আমার শরীরে জরায়ু নেই। 

এরপর দ্বিতীয় সন্তান নেয়ারি জন্য যখন চেষ্টা করছিলাম তখন জানতে পারলাম আমার জরায়ু নেই। আমি চরম বিপর্যস্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। প্রথমে চিকিৎসকের কথা তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কারণ আমি পূর্বেও এক কন্যা সন্তানের মা হয়েছি। আমি রহস্য উদঘাটন করলাম। আমার জরায়ু আসলেই ফেলে দেয়া হয়েছে। এটা হয়তো আমার সন্তান জন্মের পরই করা হয়েছিল।

তার মতো অনেক নারীই এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেহাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা করেছে সেটা নিষ্ঠুরতার চরম মাত্রা। আমি সংবাদ মাধ্যমকে জানালাম। এরপর সেই চিকিৎসকের খোঁজ পাওয়া গেলো। তিনি দু:খ প্রকাশ করেননি। বরং বলেছেন, আমার জীবন রক্ষার জন্যই বন্ধ্যা করে দেয়া হয়েছে। আমি এখনো জানিনা কী সমস্যা থেকে তিনি আমাকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। কারণ হাসপাতাল এর কোনো রেকর্ড সংরক্ষণ করেনি।

বঙ্গেকিলি এমসিবি আরো বলেন, আমি একাই নই। তদন্তে পাওয়া গেছে এমন আরও ৪৮ জন আছে। কয়েকজনকে বলা হয়েছে এইচআইভির কারণের কথা, কিন্তু আমার তাও ছিলোনা। আমি তখন কমবয়সী ছিলাম। চিকিৎসক বলেছেন, আমি নাকি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছি, কিন্তু আমি তা করিনি। পরে তিনি বলেন, ওই সময় আমার মা নাকি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। তবে কোনো মা কি চায় তার মেয়ে বন্ধ্যা হয়ে থাক! তবু আমার মা কে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে জানেনই না।

তবে আমার ওভারিগুলো এখনো আছে। সে কারণে ভাবছি, হাসপাতাল চাইলে আমাকে সারোগেট সন্তান নিতে সাহায্য করতে পারে। তবে আমি চাচ্ছি এর জন্য যে দায়ী সেই ডাক্তার জবাবদিহির আওতায় আসুক। কারণ এসব কাজে অবশ্যই আমরা আর চিকিৎসকদের সুযোগ দিয়ে যেতে পারিনা। চিকিৎসকদের জানতে হবে, তাদের কাজও নজরদারির মধ্যে আছে।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস