Alexa জেমি ডে, বদলে যাওয়া ফুটবলের রূপকার!

জেমি ডে, বদলে যাওয়া ফুটবলের রূপকার!

মাসুদ রানা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৩৩ ২২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৭:৪১ ২২ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ফুটবলের সোনালী সময় ছিল নব্বই এর দশক। সেসময় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব দু’দলের সমর্থকদের মধ্যে। স্টেডিয়ামে তিল ধারণের ঠাঁই থাকতো না। সমানতালে লড়ে যেতো জাতীয় দল। 

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজেদের সামর্থের কথা বারবারই প্রমাণ করে এসেছে মুন্না, সাব্বির, ওয়াসিম বা জুয়েল রানা, আলফাজ, বিপ্লবরা। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে মিয়ানমারে চার জাতি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় মুন্নার বাংলাদেশ। এরপর ১৯৯৯ সালে কাঠমাণ্ডুতে বাংলাদেশকে সাফ গেমসে স্বর্ণ পদক এনে দেন জুয়েল রানা, আলফাজ, বিপ্লবরা। 

সাফল্যের ধারাবাহিতকতা অব্যাহত থাকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। রজনী, আলফাজ, আরমান, জয়, মতিউর মুন্না, সুজনদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ২০০৩ সালে সাফ ফুটবলের শিরোপা ঘরে তোলে বাংলাদেশ।

এরপরের সময়টা শুধুই ব্যর্থতা আর হতাশার। ফুটবলপাগল বাংলাদেশ দখল করে নেয় ক্রিকেটের উন্মাদনা। বুলবুল, আকরাম খান, পাইলট, রফিকরা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে চেনাতে থাকেন বিশ্বমঞ্চে। এর ফলে এক সময় ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ফুটবলের আকর্ষণ। সাফ গেমস কিংবা সাফ ফুটবলে নিজেদের ছায়া হয়ে খেলতে থাকে বাংলাদেশ ফুটবল দল। বাংলাদেশের বিপক্ষে গোলবন্যা বইয়ে দিতে থাকে বিদেশি দলগুলো। শুধু খেলার ফলই নয়, ফুটবলারদের মানেও দেখা দেয় ঘাটতি। উঠে আসেনি আর কোন প্রতিভাবান ফুটবলার। ফলে ফুটবলের যশ ও খ্যাতি সবই অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ফুটবল আবার আশা দেখতে শুরু করে ২০১২ সালে। মাসিক ৫০ হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য সিলেট বিকেএসপির আঞ্চলিক কেন্দ্র লিজ নেয় বাফুফে। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে সিলেটের খাদিমনগরে বিকেএসপিতে শুরু হয় ফুটবল একাডেমি। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। দায়িত্বশীলদের চরম ব্যর্থতা আর উদাসীনতায় সেই একাডেমি বন্ধ হয়ে যায়। বিকেএসপিকে দেয়া হয়নি লিজের সেই টাকাও।

তবে আবার দিন বদলাচ্ছে। জয়ের ধারায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। জিততে না পারলেও সমান তালে লড়ে যাচ্ছে ফুটবলাররা। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের শুরু পর্যন্ত মোট ১৫টি ম্যাচ খেলা বাংলাদেশ জিততে পারে মাত্র ১টি ম্যাচে। ৩টি ম্যাচ ড্র। বাকি ১১টি ম্যাচেই হারে বাংলাদেশ। যার মধ্যে আছে জর্দানের কাছে ৮ গোল বা অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৫ গোলের বিশাল ব্যবধানে হার। সেই বাংলাদেশ দলই চলতি বছর ৮টি ম্যাচ খেলে। জয় পেয়েছে ৪টিতে। দুটি ম্যাচ ড্র করেছে জামাল ভুঁইয়ারা। যে দুটি ম্যাচে হেরেছে, সেখানেও প্রতিপক্ষকে সহজে জিততে দেয়নি টাইগাররা।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সম্প্রতি কলকাতার সল্টলেকে ভারতের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ। কিন্তু স্কোরবোর্ড সবসময় সবকিছু দেখায় না। ম্যাচের প্রথমার্ধে সাদ উদ্দিনের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ লিড ধরে রাখে ৮৮ মিনিট পর্যন্ত। প্রায় ৮০ হাজার দর্শককে নীরব করে সল্টলেক কাঁপিয়ে বেড়ান জামাল ভূঁইয়ারা। তবে শেষ মুহূর্তের গোলে কোন রকম ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়েন সুনীল ছেত্রীরা।

যার হাত ধরে বাংলাদেশের এই পুনরুত্থান, তিনি হলেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ জেমি ডে। ইংল্যান্ডে জন্ম নেয়া ৪০ বছর বয়সী এই ইংরেজ বাংলাদেশের ফুটবলের দুর্দিনে ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন। ২০১৮ সালের ১৭ মে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন জেমি ডে। মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে তিনি আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন দেশের ফুটবল কাঠামোতে।

দুই বছর আগেও ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট একই ছন্দে খেলে যাওয়ার মতো সক্ষমতা ছিলো না দেশের ফুটবলারদের। কিন্তু সে দিন বদলেছে। এখন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছে জামাল ভূঁইয়া, সাদ উদ্দিন, ইয়াসিনরা।

বিশেষ করে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে ১-০ ব্যবধানে বাংলাদেশ হারলেও পুরোটা সময় বেশ টক্কর দিয়েছে জেমি ডের শীষ্যরা।

গত ১০ অক্টোবর এশিয়া চ্যাম্পিয়ন কাতারের কাছে ২-০ গোলের হারের আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দুই দলের মাঠের লড়াইয়ে একবারও উঁকি দেয়নি তাদের র‌্যাঙ্কিংয়ে আকাশ-পাতাল দূরত্ব।

২০১৫ সালে মোট নয়টি ম্যাচ খেলা বাংলাদেশ হারে সাতটি ম্যাচেই। এর মধ্যে বড় হারগুলোর মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫-০, জর্দানের বিপক্ষে ৪-০ ও তাজিকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০।

এরপর ২০১৬ সাল বাংলাদেশ শুরু করে জর্দানের বিপক্ষে ৮-০ গোলের বিশাল হারে। এরপর তাজিকিস্তানের কাছে ৫-০ গোলে হারের পর ভূটানের কাছেও হেরে যায় ৩-১ গোলের ব্যবধানে। 

২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর এশিয়া কাপ বাছাই পর্বের সেই ম্যাচের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরে ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছর কোনো ধরনের ফুটবল খেলেনি বাংলাদেশ। লাওসের বিপক্ষে সে ম্যাচে ২-২ গোলে ড্র করে লাল-সবুজের জার্সিধারীরা। পরের মাসে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভূটানের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ।

এরপরই শুরু হয় ‘জেমি ডে’ যুগ। পাকিস্তানকে ১-০ গোলে হারিয়ে শুরু হয় জেমি ডে’র যাত্রা। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট অবশ্য নেপালের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে পরের দুই ম্যাচে কম্বোডিয়া ও লাওসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে কামব্যাক করে লাল-সবুজের জার্সিধারীরা।

এ সময়ে টাইগাররা হারিয়েছে ভূটান, লাওস ও পাকিস্তানকে। এর মধ্যে ভূটানের র‌্যাঙ্কিং এখন বাংলাদেশের চেয়ে ৩ ধাপ ওপরে। লাওস আছে ১ ধাপ ওপরে। পাকিস্তানের অবস্থান র‌্যাঙ্কিং ২০৩।

১৯৯৩ সালের ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৬ নম্বরে। যেটা ১৯৯৬ সালে ১১০ এ উঠে আসে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় অবনমন। ২০০০ সাল নাগাদ ১৫১-তে অবস্থান নেয় বাংলাদেশ। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ছিল ১৭৪তম স্থানে। কিন্তু নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিচে নেমে আসে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে। তখন র‌্যাঙ্কিং দাঁড়ায় ১৯৭। সেখান থেকে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮৮।

নতুন কোচের হাত ধরে বাংলাদেশ কি পারবে তাদের সেই হারানো ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরিয়ে আনতে? সেটা সময়ই বলে দেবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/সালি