Alexa জুলিয়েটের ঝুল বারান্দায়

জুলিয়েটের ঝুল বারান্দায়

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৮ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:৫১ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘ছবি ঘর আসাদ’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

‘ছবি ঘর আসাদ’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

কাল্পনিক চরিত্ররাও কিছু কিছু সময়ে বাস্তব পৃথিবীর মানুষদের চেয়ে অধিকতর জীবন্ত এবং প্রভাব সৃষ্টিকারী হয়ে উঠতে পারে!

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনন্য সৃষ্টি ‘দেবদাস’ চরিত্র। ১৯১৭ সালে ‘দেবদাস’ উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হবার পর থেকে যুগে যুগে প্রেমিক দেবদাসের অবিমৃষ্যকারিতা, দেবদাস-পার্বতী-চন্দ্রমুখীর ত্রিমুখী প্রেম এবং অন্তিমে দেবদাসের করুণ মৃত্যুর বর্ণনা বা মৃত্যুদৃশ্য চোখের কোণায় জল টেনে আনেনি, এমন পাষাণ হৃদয়ের বাঙালি আদৌ ছিল কিনা সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই।

১৯৩৫ সনে প্রম‌থেশ বিশি নির্মিত ও অভিনীত দেবদাস থেকে শুরু করে ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শাহরুখ খানের আধুনিক ‘দেবদাস’ মুভি শুধুমাত্র বাংলা ভাষাভাষীদের নয়, পুরো উপমহাদেশ এমনকি পৃথিবীময় মানুষজনের নীরব অশ্রুপাতের কারণ হয়েছে।

শুধুমাত্র দেবদাস নয় পৃথিবীর বিভিন্ন সাহিত্যেই বাস্তবের চেয়ে বেশী প্রভাব সৃষ্টিকারী চরিত্র অনেকই আছে। যেমন সুনীলের ‘সেই সময়’ এর নবীন কুমার, লিও টলস্টয়ের আন্না কারেনিনা, আরব্য রজনীর আলিবাবা বা সিন্দাবাদ, এডগার রাইজ বারোজের ‘টারজান’, ব্রিটিশ লেখিকা জে. কে. রাউলিং এর হ্যারি পটার, এমনকি কার্টুন ছবি ‘ফ্রোজেন’ এর কুইন এলসা।

২০১০ সালের গ্রীষ্মকাল। ইতালির ভেরোনা শহর। আমি এসেছি মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্যে। ভেনিস ও রোমে যাবার পথে। মজার ব্যাপার হল, ভেরোনা শহর ছেলেবেলা থেকেই আমার পরিচিত। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের (তখনও মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ) সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে আমাদের ইংরেজির প্রভাষক ওয়ালিউল্লাহ স্যার দ্রুত পঠন হিসেবে আমাদেরকে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের Taming of the Shrew পড়াচ্ছেন। এই সময়েই আমরা প্রথম জানতে পেরেছিলাম ইতালিতে রোম এবং ভেনিস ছাড়াও ভেরোনা নামের এই শহরটি আছে। এই ভেরোনা শহরের এক যুবকই উপন্যাসের ক্যাথারিন নামের সবচেয়ে মুখরা রমণীটিকে বশীভূত করতে সক্ষম হয়েছিল। ‘Romeo and Juliet ‘ আমি পড়েছি নীচের ক্লাসের দিকেই, পৃথিবীর অপরাপর কিশোর, কিশোরী বা যুবক-যুবতীদের ন্যায়। এই গল্পের ঘটনাস্থলও এই ভেরোনা শহর!

সুতরাং ১৯৯৯ সালে আমেরিকান চলচ্চিত্রকার জন মেডেন যখন রোমিও-জুলিয়েটের কাহিনীকে ভিত্তি করে রোমান্টিক কমেডি ড্রামা ‘Shakespear in Love’ মুভি তৈরি করলেন এবং তা সাতটা একাডেমী পুরস্কার জিতে নিল, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মুভিটা দেখার। অনেকটা ছেলেবেলার ফেলে আসা অতীতকে পুনঃপরিভ্রমণ (revisit) করার মত।

মুভির প্রধান চরিত্র উইলস বা উইলিয়াম শেক্সপিয়ার একজন যুবক বয়সী উঠতি কবি, নাট্যকার ও অভিনেতা। ভালবাসার জীবন বিশীর্ণ হয়ে পড়লে তার অন্তর্গত সৃষ্টিশীলতার অভাব ঘটে। নতুন নাটক লিখতে ব্যর্থ হয় সে বারংবার। একই সময়ে নাটকে অভিনয় করার প্রবল ইচ্ছে নিয়ে ভিওলা (Viola) নামের এক অভিজাত বংশের যুবতী পুরুষের পোশাকে অডিশন দিতে আসে উইলস এর কাছে। কারণ সে সময়ে (১৫০৩ সাল) ইংল্যান্ডে আমাদের দেশের মত ছেলেরাই নাটকে মেয়েদের ভূমিকায় অভিনয় করতো। মেয়েদের অভিনয় করার অনুমতি ছিল না।

ঘটনাক্রমে উইলস এর কাছে ভিওলার আসল পরিচয় উদঘাটিত হয়ে গেলে তারা পরস্পরের সাথে ভালবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ভালবাসাই উইলস এর ভেতরে সৃষ্টিশীলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসে।অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বিনী দেবীর সান্নিধ্যে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতা দিয়ে তার বিশ্বকবির জীবন শুরু করার মত। উইলস বা উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার সমস্ত নান্দনিকতা দিয়ে সৃষ্টি করে তার নাটক ‘রোমিও এন্ড জুলিয়েট’।

কিন্তু এই যুগলের ভালবাসা সার্থক হবার নয়। এলিজাবেথিয়ান ট্র্যাজেডির অন্তর্দ্বন্দ্ব বা মানসিক টানাপোড়ন সৃষ্ট ট্র্যাজিক পরিণতির কারণে। এখানে ভিওলা এক অনূদার রাজপুত্র লর্ড ওয়েসেক্স এর বাগদত্তা। সুতরাং নাটকের প্রদর্শনী শেষে মহারানী ভিওলার অভিনয়ে মুগ্ধ হলেও পুরুষের বেশে অভিনয় করার জন্যে শাস্তি হিসেবে লর্ড ওয়েসেক্স এর সাথে ভিওলার বিবাহ অনুমোদন করেন। নির্ধারিত হয় যে, বিয়ের পর নববিবাহিত দম্পতি জাহাজে করে আমেরিকায় তাদের তামাক চাষের ক্ষেত্রে চলে যাবেন। উইলস এর সাথে আর কখনোই দেখা হবে না।

তবে ভিওলার ভালবাসা ইতিমধ্যেই উইলসের অন্তর্গত সৃষ্টিশীলতাকে বিকশিত করেছে। তার কলম ছুটে চলে নতুন সৃষ্টির প্রবাহ নিয়ে। ভিওলা চলে যাবার পর ভিওলার প্রতি ভালবাসার অর্ঘ দিয়ে সে সৃষ্টি করে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাস্টারপিস ‘The Twelfth Night’।

মুভির শেষ দৃশ্যে উইলস/ উইলিয়াম শেক্সপিয়ার লিখতে লিখতে ভাবছেন, “My story starts at sea, a perilous voyage to an unknown land. A shipwreck. The wild waters roar and heave. The brave vessel is dashed all to pieces. And all the helpless souls within her drowned. All save one. A lady. Whose soul is greater than the ocean, and her spirit stronger than the sea's embrace. Not for her a watery end, but a new life beginning on a stranger shore. It will be a love story. For she will be my heroine for all time. And her name will be Viola.” পটভূমির দৃশ্যপটে ভাসছে ডুবে যাওয়া এক জাহাজ থেকে সাঁতরে এক যুবতী নারী উঠছে এক নিবিড় সমুদ্র সৈকতে। ‘The Twelfth Night’ এর প্রেক্ষাপট!

ছবিতে আর একটা দৃশ্য আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল। সেটা হলো ভেরোনা শহরে জুলিয়েটের বাড়ীর ব্যালকনি বা ঝুলবারান্দা, যেখানে উইলস ও ভিওলা পরস্পরকে ভালবাসা নিবেদন করে। ইতালিতে আগমনের পর যখন শুনলাম ভেরোনাতে জুলিয়েটের বাড়ী আছে, তখন আমার সেই ঝুলবারান্দা দেখার প্রবল লোভে পেয়ে বসলো।

জুলিয়েটের বাড়ীর সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই আপনার চোখে পড়বে দুই পাশের দেয়ালের গায়ে বিকীর্ণ অসংখ্য হস্তলিখিত ভালোবাসার নোট। এদের ভেতর দিয়ে পেছনের দেয়ালকে দেখাই যায় না। পর্যটকদের বিশ্বাস এই দেয়ালের গায়ে যদি তারা কোন ভালবাসার প্রতিজ্ঞার কথা লেখে তবে তা কোনদিনই ভঙ্গ হবে না।

ভেতরে ঢুকতেই উঠানের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ব্রোঞ্জের তৈরি জুলিয়েটের সোনালী রঙের মূর্তি। সবাই এর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। স্পর্শ করে দেখছে! জুলিয়েটের মূর্তির বামদিকে মাথার ওপরে সেই বিখ্যাত ঝুল বারান্দা যেখানে দাঁড়িয়ে রোমিও জুলিয়েটকে তার অন্তহীন ভালবাসার কথা বলেছিল!

জানা গেল, জুলিয়েটের বাড়ীটি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ‘দাল ক্যাপেলো’ নামক এক পরিবারের মালিকানায়। ভেরোনা শহর কর্তৃপক্ষ ১৯০৫ সালে এই পরিবার থেকে বাড়িটি কিনে নেয়। মজার ব্যাপার হল বিখ্যাত ব্যালকনি বা ঝুলবারান্দাটি বিংশ শতাব্দীর পূর্বে এতে যোগ করা হয়নি!

কিন্তু এতে কার কি আসে যায়? কাল্পনিক রোমিও ও জুলিয়েট সেই কবে থেকে সত্যের চেয়েও বেশি ভালবাসার আলো বিকিরণ করে যাচ্ছে সারা জগৎময়।

সম্প্রতি শুনেছি জুলিয়েটের ঝুল বারান্দাটাও ইদানিং মুক্ত করে দেয়া হয়েছে পর্যটকদের জন্যে। তারা এতে দাঁড়িয়ে টাকার বিনিময়ে যুগল সেলফি তুলছে।

“বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর”!

লেখক: মেজর (অবসরপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই