জুতার গাছ!

জুতার গাছ!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৭ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:১১ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: জুতার গাছ

ছবি: জুতার গাছ

গাছে ঝুলছে জুতা। অবাক করাকাণ্ড! বিরাট এক গাছ ভর্তি জুতা আর জুতা। গাছের পাতার চেয়ে জুতার সংখ্যা বেশি? বাহারি সব লাল, নীল, সবুজ, হলুদ রঙের বাহারি সব জুতা। তবে এর রহস্য কী?

মানুষ তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড স্মরণীয় করে রাখতে কত কিছুই না করেন। এটিও তার এক নমুনা মাত্র। ভালোবাসার সম্পর্কে যাতে ফাটল না ধরে এজন্য ব্রিজ অব প্যারিসে গিয়ে যে দম্পতিরা তালা মেরে আসেন সে তথ্য তো সবারই জানা। তেমনই এক আশ্চর্যজনক কর্মকাণ্ড হলো গাছে জুতা ঝুলানোর লড়াই। গাছে হাজারো রকমের জুতা- স্যান্ডেল, স্লিপার, হাই হিল, স্কেট সু।

জুতার গাছসবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই জুতার গাছ পুরো বিশ্বের কয়েকশ স্থানে রয়েছে। এমনকি যে কেউ তার কোনো অর্জন, জয়, পরাজয় কিংবা দুঃখ, হতাশা ইত্যাদি স্মরণীয় করে রাখতে গাছে জুতা ঝুলানোর রীতি চালু করতে পারে। তবে এই জুতার গাছের উৎপত্তি ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক ইয়ত্তা নেই। ধারণা করা হয় অন্তত একশ বছরের পুরনো এক রীতি এটি।

এর উৎপত্তি ঘটে উত্তর আমেরিকায়। এরপর ইংল্যান্ড এবং পরবর্তীতে পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদদের মতে, সেনাবাহিনী কর্তৃক এই রীতির উদ্ভব ঘটেছিল। যখন সৈন্যরা চাকরি ছেড়ে চলে যেতেন তখন নিজেদের বুটগুলো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ফেলে দিতেন তারা। সেগুলোই নাকি পরবর্তীতে অন্যদের ব্যবহারের জন্য গাছে ঝুলিয়ে রাখা হত।

গাছে নেই পাতা শুধুই জুতাআবার অনেকের মতে, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ব্যক্তিরা যদি গাছে জুতা বেঁধে রাখেন তবে তারা মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন। আবার ইংল্যান্ড ও ইউরোপে কেউ মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা এক জোড়া জুতা গাছে ঝুলিয়ে রেখে মৃত ব্যক্তির আত্মার তুষ্টি কামনা করেন। আবার অনেকেই বলেন, বদ্ধ উন্মাদের কাজ এটি। মাতাল হলেই লোকে এমন কাজ করতে পারে। 

তবে ভার্জিনিয়ার ব্রুস সারসিন জানান ভিন্ন এক জুতা গাছের কথা। এটি টরেন্টো থেকে ৯০ কি.মি. উত্তরে দক্ষিণ বেভারটনের লেক রিজ রোডের জুতা গাছটির একটি বিশেষ অর্থ বহন করে। তিনি বলেন, আমার বড় ভাই জর্জ ১৯৯০ সালে এই গাছটিতে তার এক জোড়া জুতা ঝুলিয়ে রাখেন। তিনি অসহায়দের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ যাদের জুতা নেই তারা যেন এটি নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। ঠিক যেন মানবতার স্বার্থে এই উদ্যোগটি তিনি নেন। 

গাছের মেগডালেও জুতা ঝুলছেএই কাজ আমার মায়ের কাছ থেকে শেখা। তিনি কির্কল্যান্ড লেকে বসবাস করতেন। অনেক অভাবের সংসার ছিল তার। আমার মায়েরা মোট ১৪ ভাই বোন ছিলেন। তাই কখনো জুতা পড়ার ভাগ্য তাদের ছিল না। কারণ খাবার যোগাতেই তার বাবা হিমশিম খেতেন। এই কষ্ট আমার মা কখনো ভুলেননি। তাই যাতে অন্যের উপকার হয় এজন্য গাছে জুতা ঝুলাতে বলেন আমদের।

এরপর আমি ১৯৯১ সালে আমার ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ার পর ওই গাছে গিয়ে নতুন এক জোড়া ছেলে শিশুর জুতা ঝুলিয়ে আসি। পরবর্তীতে যখন কন্যা সন্তান জন্মেছে তার জন্য গাছে আরেক জোড়া জুতা ঝুলিয়ে আসি। এরপর থেকে এই বিষয়টি জানাজানি হয়। অনেকেই নবজাতক জন্মের পর এই গাছে জুতা ঝুলিয়ে স্মরণীয় করে রাখে। বর্তমানে ওই গাছটি জুতায় পরিপূর্ণ। এখন আর হয়ত কারো জুতার অভাব নেই। কেউ গাছ থেকে জুতা নিতে নয় বরং রাখতে যান সেখানে।

২০১০ সালে এই জুতার গাছটি আগুনে পুড়ে যায়গাছের জুতা রয়েছে হাওয়াই, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, সাউথ আফ্রিকা, চীন, রাশিয়া, মধ্য প্রদেশসহ বিশ্বজুড়েই। সবগুলো জুতা গাছের পিছনেই রয়েছে একেকটি অদ্ভুত ও লোমহর্ষক ঘটনা। আমেরিকার ইদাহো রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের একটি বনে এমনই এক জুতা গাছ ছিল। ৬০ বছর পর এই গাছটি ২০১০ সালে রহস্যজনকভাবে আগুনে পুড়ে যায়। 

মিশিগানের সালেমে একটি জুতার গাছ ছিল। ধারণা করা হয়, কোনো এক মানুষখেঁকো সিরিয়াল কিলার এই গাছটিতে জুতা ঝুলানো শুরু করেন। কারণ তিনি ঠিক কতজনের প্রাণ নিয়েছেন সেই নিদর্শনই বোধ হয় রাখতে চেয়েছিলেন। হত্যার পর লাশগুলোর পা থেকে জুতা খুলে সেগুলো গাছে টাঙিয়ে রাখতেন হত্যাকারী। এরকম হাজারো গল্প রয়েছে একেকটি জুতা গাছ নিয়ে।

সূত্র: মিডিয়ামডটকম/টরোন্টোসানডটকম 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস