জিহাদুন নফস ও আত্নার প্রকারভেদ

জিহাদুন নফস ও আত্নার প্রকারভেদ

পর্ব-১

মো. রাকিবুল ইসলাম  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২৩:০৮ ৫ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২৩:১৮ ৫ জুলাই ২০২০

‘যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে সে অবশ্যই সফলকাম হয়। আর যে নিজেকে কলুষিত করবে সে নিশ্চয়ই ব্যর্থ মনোরথ হয়।’ (সূরা: আশ-শামস, আয়াত: ৭-১০)।

‘যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে সে অবশ্যই সফলকাম হয়। আর যে নিজেকে কলুষিত করবে সে নিশ্চয়ই ব্যর্থ মনোরথ হয়।’ (সূরা: আশ-শামস, আয়াত: ৭-১০)।

নফস ও রুহের  মধ্যে  পার্থক্য ও তার সংজ্ঞা: নফস ও রুহ এর মধ্যে প্রকৃত অর্থে কোনো পার্থক্য নেই, যদিও পারিভাষিক অর্থে পার্থক্য আছে। যেমন প্রাণীকে নফস বলা হয়। কিন্তু রুহ বা আত্না বলা হয় না- যেমন আল্লাহ বলেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ

‘প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু।’ (সূরা: আলে-ইমরান-১৮৫)। 

এতে বুঝা যায় যে; দেহ ও আত্নার মিলিত সত্তাকে নফস বলা হয়।

আর শুধু মাত্র আত্নাকে রুহ বলা হয়। একদা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ইহুদিরা রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, আল্লাহ তায়া বলেন, ‘হে নবী তুমি বলো রুহ হলো আল্লাহর একটি আদেশ।’ (সূরা বানী ইসরাঈল-৮৫)।

নফস সেটাই যা আল্লাহ মানব দেহে ফুঁকে দিয়েছেন। মৃত্যুর সময় যা দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেন তোমরা কি দেখনি মৃত্যুর মানুষের চোখ তাকিয়ে থাকে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন হ্যাঁ? হে আল্লাহর রাসূল (সা.)। তখন তিনি বললেন তা, তো ওই সময় যখন তার চোখ তার নাফসকে দেখতে থাকে। (সহিহ মুসলিম হা: ৯২১)।

জিহাদুন নফস এর সংজ্ঞা:  ইসলাম আত্নার কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ না করতে উৎসাহিত করেছেন নফসকে ইলাহী ফরমানের  দিকে নিবিষ্ট করার লক্ষে নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে বলা হয় জিহাদুন নফস বা অন্তরের সংগ্রাম।

আত্নার প্রকারভেদ: আত্না তিন প্রকার। যথা: (১) নফসে আম্মারাহ (২) নফসে লাওওয়ামাহ (৩) নফসে মুত্বমাইন্নাহ।

(১) নফসে আম্মারাহ: এর স্বভাবগত চাহিদা হলো মন্দকামনা, শয়তানের অনুসরণ-কু-প্রবৃত্তির বাসনা, চরিতার্থ করা। যাতে করে হারাম কাজ করা তার জন্য সহজ হয়। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَا أُبَرِّىءُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلاَّ مَا رَحِمَ رَبِّيَ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অর্থ: ‘আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু।’  (সূরা: ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)।

(২) নফসে লাওওয়ামাহ বা ধিক্কার দানকারী আত্না: এ প্রকারের আত্নায় ও মন্দ-শয়তানি কুমন্ত্রনা, কু-প্রবৃত্তির বাসনা ইত্যাদি জিনিসের উদয় হয়। তবে পরক্ষনেই এই নাফসের অধীকারী ব্যক্তি তার কৃত কর্মের জন্য নিজেকে অধিক ধিক্কার দেয়, ও লজ্জাবোধ করে। কারণ তাতে সামান্যতম হলেও ঈমানের জ্যোতি বিদ্যমান। যেমন: আল্লাহ তায়া বলেন,

لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ

وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ

অর্থ: ‘আমি শপথ করি কেয়ামত দিবসের।  আরো শপথ করি সেই আত্নার যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।’ (সূরা: আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ১-২)।

(৩) নফসে মুত্বমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্না: এই প্রকারের আত্না আল্লাহর আনুগত্য ও জিকির দ্বারা মনে প্রশান্তি অনুভব করে, এবং সব প্রকার আনুগত্যের কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ লাভ করে এবং সমস্ত অন্যায় থেকে সে পরিপূর্ণ রুপে মুক্ত থাকে। যেমন: আল্লাহ বলেন,

يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ

ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً

فَادْخُلِي فِي عِبَادِي

وَادْخُلِي جَنَّتِي

অর্থ: ‘হে প্রশান্ত আত্না- তুমি প্রশান্ত চিত্তে তোমার পালনকর্তার দিকে ফিরে চলো। অতঃপর আমার বান্দাদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে যাও  এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সূরা: ফজর, আয়াত: ২৭-৩০)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا

فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا

قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا

وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا

অর্থ: ‘শপথ প্রাণের আর তার যিনি তাকে সুবিন্যাস্ত করেছেন। অতঃপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎ কর্মের জ্ঞান দান করেছেন। যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে সে অবশ্যই সফলকাম হয়। আর যে নিজেকে কলুষিত করবে সে নিশ্চয়ই ব্যর্থ মনোরথ হয়।’ (সূরা: আশ-শামস, আয়াত: ৭-১০)।

আত্নাশুদ্ধি ও তার প্রয়োজনীয়তা: আত্নাকে ভালো কাজ সমূহের মধ্যে আবদ্ধ রাখাই হলো আত্নাকে মন্দ চাহিদা থেকে নিবৃত্ত রাখার বড় হাতিয়ার। কেননা পশ্চিমা সভ্যতা, অশ্লীলতা ও বর্বরতা মানব সভ্যতাকে পশুতে পরিণত করেছে, যা জাহিলিয়াতকে ছাড়িয়ে গেছে। পশ্চাত্যের এ বর্বরতা বিশ্বব্যাপী সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ছোট-বড় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এ বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলিম সমাজ। পশ্চিমা সভ্যতার এই তরতরে কুড়াল কোপে প্রত্যেকটি মানুষ হারিয়ে ফেলেছে তার জীবনের দিক ও গতি। ভুলে গিয়েছে তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ছেড়ে দিয়েছে তার ধর্ম-কর্মকে। মূলত পার্থিব জীবনের চাকচিক্যই কিন্তু একটি জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য নয়। এমন অবস্থাতে মুসলিম সমাজের সবার উচিত হলো পাশ্চাত্য সভ্যতাকে পরিহার করা এবং তার মনের কামনা-বাসনা আধিক্যের লাগাম টেনে ধরে আত্নাকে অবদমন করা। কেননা আলী (রা.) বলতেন, আত্নার অবদমনের মাধ্যমেই জিহাদের ফলাফল অর্জিত হয়।’ (গুরারুল হিকাম  হা: ৪৬৫৫)।

নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ: নফস বেশির ভাগ সময়ই খারাপ কর্মের নির্দেশনা দেয়। তাই আমাদেরকে নফসের বিরোধিতা করে তাকে সিরাতে মুস্তাকিমের পথে পরিচালনার জন্যই, নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে মূলতঃ এ জিহাদই হলো সর্বোত্তম জিহাদ। যেমন: রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো যে, আল্লাহর জন্য স্বীয় কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে। (তিরমিযী, সিলসিলা সহিহ হা: ১৪৯১)।

কীভাবে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো: নফসের বিরুদ্ধে সর্বদাই সংগ্রাম অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি। যার মাধ্যমে আমরা কু-প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি। কিন্তু এই জিহাদ করার পথ আমাদের সবাইকে জানতে হবে।

নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদের কতিপয় পন্থা নিন্মে আলোচনা করা হলো-

(১) ইলমে দ্বীন হাসিল করা: ইলমে দ্বীন হাসিলের মাধ্যমে আমরা কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারি। কেননা ধর্মীয় জ্ঞানই হলো মূল হাতিয়ার। যা খারাপ নির্দেশকে নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদে অগ্রনী ভূমিকা রাখে। আর এই জ্ঞানের মৌলিক উৎস হলো কোরআন ও সহিহ হাদিস। যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রাসূলের (সা.) নিকট অবতীর্ণ ওহির সূচনা হয়েছিল। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে