Alexa জামালপুর রেলস্টেশন যেন বারো ভূতের আখড়া!

জামালপুর রেলস্টেশন যেন বারো ভূতের আখড়া!

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩৫ ২ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জামালপুর রেল স্টেশনের প্রধান সমস্যা টিকেট কালোবাজারি। রয়েছে মোবাইল চোর, পকেটমার, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীর উপদ্রব। এছাড়া সন্ধ্যার পর ভীড় জমে ভাসমান যৌন কর্মীদের। আছে হিজড়াদের দৌরাত্ম্য। সব মিলিয়ে জামালপুর স্টেশনটি যেন বারো ভূতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রেল কর্মকর্তাদের যোগসাজস আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জামালপুর-ঢাকা রেলপথে চারটি আন্তঃনগর, তিনটি মেইল, দুইটি কমিউটার ও দুইটি লোকাল ট্রেনসহ ১২টি ট্রেন চলাচল করে। জামালপুরসহ শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ এ রেলপথ দিয়ে যাতায়াত করেন। আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সঠিক সময়ে ঢাকা-জামালপুর চলাচল করলেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ব্রহ্মপুত্র, অগ্নিবীণা ও যমুনা। লক্করঝক্কর বগিতে নেই ওয়াশরুমের লক। দূর্গন্ধে ভরা ওয়াশরুমগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, জামালপুর স্টেশন মাস্টার শাহাবুদ্দিনই টিকেট কালোবাজারিদের সঙ্গে জড়িত। তার নির্দেশে প্রতিদিন সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীদের কাছে টিকেট বিক্রির আগেই ৬৫ শতাংশ টিকেট কেটে ফেলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। টিকেট দেয়া শুরুর স্বল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যারা লাইনের অগ্রভাগে দাঁড়ান তাদের ভাগ্যে থাকে ৩০ থেকে ৩৫টি টিকেট। অগ্রিম টিকেট কেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিস্থিতি বুঝে চড়াদামে কালোবাজারিদের কাছে পাচার করা হয়।

এছাড়া স্টেশন মাস্টার শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মাসে দুইশ লিটার ডিজেল ক্রয় দেখিয়ে ভুয়া-ভাউচারে বিল উত্তোলন করে আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে।

গেটম্যান কাইলা রিপনের মাধ্যমে টিকেট খুচরা কালোবাজারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। কালোবাজারির প্রধান ফকিরপট্টির ব্ল্যাকার লিটন। তার মাধ্যমেই স্টেশন এলাকার জামাল, লিটন-২, জুয়েল, দুলাল, হারুন, কালা জনি, রবি, সুজনসহ সঙ্ঘবদ্ধ কালোবাজারিরা স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকেই টিকেট সংগ্রহ করেন।

জামালপুর রেলস্টেশন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কয়েকজন নেতা ও বুকিং স্টাফ জানান, স্টেশন মাস্টারের নির্দেশেই কয়েকজন কালোবাজারিকে প্রতিদিন চারটি আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট দেয়া হয়। স্টেশন মাস্টার জবাবদিহিতা এড়াতে অধিকাংশ সময় তার অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে বাইরে অবস্থান করেন।

তারা আরো বলেন, অপরদিকে ভাড়াটিয়া লোক দিয়েও প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব টিকেট বিক্রয় করা হয়। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিভিন্ন স্পটে টিকেট পৌঁছে দেয়া হয়। এ অবস্থা শুধু জামালপুর স্টেশনেই সীমাবদ্ধ নয়। সরিষাবাড়ি, তারাকান্দি, মেলান্দহ, ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনেও একই অবস্থা।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, জামালপুর রেল স্টেশনে দিনের বেলায় হকার, ভিক্ষুক, মোবাইল চোরের উপদ্রব শেষ না হতেই সন্ধ্যার পর শুরু হয় যৌন কর্মীদের আনাগোনা। তারা অনেক সময় টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া নানাভাবে হয়রানিও করে। এদের সাথে জড়িত হোটেল মালিক ও স্থানীয় চক্র।

প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে যৌন কর্মী, টিকেট কালোবাজারি ও ছিনতাইকারীদের শাস্তি দিলেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।

ট্রেন যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনে একটি চক্র অনেকদিন থেকেই এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এভাবে তারা প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।  

এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী আব্বাস উদ্দিন বলেন, জামালপুর থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য স্টেশন থেকে টিকেট না পেয়ে কালোবাজারির কাছ থেকে বেশি টাকায় টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। স্টেশন মাস্টারের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহরের দয়াময়ী রোডের মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি জানান, ট্রেনে চলাচল সবচেয়ে নিরাপদ। তাই সাধারণ মানুষ ট্রেনে চলাচল করতে বেশি পছন্দ করেন। তবে টিকেটের যে বিড়ম্বনা, তা খুবই দুঃখজনক।

ট্রেনে হয়রানির বিষয়ে শহরের বোষপাড়ার শিক্ষার্থী মানিক মিয়া বলেন, ট্রেনে ভিক্ষুক, হকার আর হিজড়ার উৎপাত লেগেই থাকে। হিজড়ারা জামালপুর স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে উঠে যাত্রীদের হেনস্থা করেন। তারা ময়মনসিংহ স্টেশনে নেমে যাওয়ার পর আবার নতুন করে আরেক গ্রুপ উঠে। ঢাকা পর্যন্ত পালাক্রমে চলে তাদের উপদ্রব।

জামালপুর রেলস্টেশন

হিজড়াদের ব্যাপারে রেলস্টেশন এলাকার প্রভাষক মনোয়ার হোসেন বলেন, আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেনে হিজড়াদের আচরণে তিনি খুবই হতবাক। অবস্থা দেখে মনে হয় যাত্রীরা তাদের কাছে জিম্মি।

টিকেট না পেয়ে হতাশ স্টেশন রোডের আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, রেলের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণে অনলাইনে টিকেট পাওয়া যায় না। তাই টিকেটের সন্ধানে ছুটে আসতে হয় স্টেশনে। কিন্তু এখানে এসেও ভোগান্তির শেষ নেই।

এদিকে জামালপুর জিআরপি থানার কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধেও টিকেট কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। তারা আসনবিহীন টিকেট প্রত্যাশী যাত্রীদের টিকেট না কাটার পরামর্শ দেন। এরপর ট্রেন আসার মুহূর্তে সরাসরি স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে হকারের মত টিকেট বিক্রি করেন।

তবে রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাপস চন্দ্র পন্ডিতের দাবি, জিআরপি পুলিশের কেউই এ ঘটনার সাথে জড়িত নয়। এরপরও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্টেশনের এক কর্মচারি জানান, জামালপুর স্টেশনটি দীর্ঘদিন থেকেই একটি চক্রের কাছে জিম্মি। এ চক্রের নির্দেশে চলে সব কার্যক্রম। এ চক্রের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা।

প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী আজিজুল হক জানান, রেল ভ্রমণ নিরাপদ। যাতায়াত খরচ কম। তাই সিট না থাকলেও বিভিন্ন জরুরি কাজে দাঁড়িয়ে ঢাকায় যেতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, স্টেশনে ট্রেনের অবস্থানের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

সরিষাবাড়ির রেলযাত্রী মুকুল বলেন, অসুস্থ মাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নেয়া প্রয়োজন। তাই অগ্রিম টিকেট নিতে এসেছিলাম। কাউন্টারে টিকেট না পাওয়ায় চড়াদামে কালোবাজারির কাছ থেকে কিনতে হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালোবাজারির এক সদস্য জানান, ১৯০ টাকার সোভন টিকেট ৫শ’ থেকে ৬শ’, ২২৫ টাকার সোভন চেয়ার ৮শ’ থেকে ১ হাজার, প্রথমশ্রেণির চেয়ার ৩৫০ টাকার স্থলে ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকায় বিক্রি করা হয়।

আরেক টিকেট কালোবাজারি বলেন, ‘যতো দোষ আমাদের। অতিরিক্ত টাকা শুধু আমরাই পাই না। এর সাথে অনেকেই জড়িত। সরিষাবাড়ি, তারাকান্দি, ইসলামপুর, মেলান্দহ, দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোনো কিছুই হয় না। সব দায় আমরা নেবো কেনো।’

জামালপুর স্টেশন মাস্টার শাহাবুদ্দিনের দাবি, বর্তমানে অর্ধেকের চেয়েও বেশি টিকেট অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে বিক্রি হয়। আর যাদের প্রয়োজন তারা আগেই টিকেট কিনে নেন। শেষ সময়ে যারা আসেন তারা টিকেট পান না। আবার বৃহস্পতিবার, ছুটির দিন বা বিশেষ সময়ে টিকেট সঙ্কট দেখা দেয়।

তিনি আরো বলেন, অনলাইনে ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রির ঘোষণার পর বাকি টিকেট স্টেশন কাউন্টারে বিক্রি করা হয়। তাই নির্ধারিত ট্রেনের টিকেট যাত্রার ১০ দিন আগেই বিক্রি হয়ে যায়। এতে কাউন্টারে যাত্রীদের চাপ আরো বেড়ে গেছে। তাই বিক্ষুব্ধরা টিকেট না পেয়েই আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস