জামালপুরে যমুনার পানি বেড়ে নতুন এলাকা প্লাবিত  

জামালপুরে যমুনার পানি বেড়ে নতুন এলাকা প্লাবিত  

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১৬ ১৫ জুলাই ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। বুধবার দুপুর পর্যন্ত যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পউবো) জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ এবং পানি মাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান।

এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সরিষাবাড়ি, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও জামালপুর সদরের চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। কোথাও পানির তোড়ে রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে মহিষবাথান-মাহমুদপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫০ মিটার ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে ১০টি গ্রামে। নিশ্চিত করেছেন ইউএনও আমিনুল ইসলাম। বন্যার পানিতে দেওয়ানগঞ্জ-তারাটিয়া-সানন্দবাড়ি পাকা সড়কে সিএনজি ট্রাক বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া  ডাংধরা ইউপির কাউনিয়ারচর টু জোয়ানেরচর রাস্তা পানির স্রোতে ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। 

হারুয়াবাড়ী আদর্শপাড়া মেইন রাস্তা, সানন্দবাড়ী বাজারের দক্ষিণ পাশে, জিঞ্জিরাম সেতুর দক্ষিণ পাশে, মিতালী বাজারের উত্তর পাশে, ঝালোরচর বাজারের দক্ষিণ পাশেসহ দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন রাস্তা পানিতে ডুবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদ ও ভূমি অফিসসহ কয়েকটি সরকারি দফতর। বিভিন্ন বাজারে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় ভোগান্তিতে রয়েছে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দেওয়ানগঞ্জ পৌর এলাকা ও ৮ ইউপির বাসিন্দাদের। সরিষাবাড়ির আওনা ইউপির কুমারপাড়ার ৯ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে একটি বেরিবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ওই এলাকার জনসাধারন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

এদিকে দেওয়ানগঞ্জ বাজার রেলস্টেশনে বন্যার পানির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টি ইসলামপুর পর্যন্ত চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামালপুর রেল স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার শেখ উজ্জ্বল মাহমুদ এবং দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশন মাস্টার আব্দুল বাতেন।

তারা জানান, ইসলামপুর পর্যন্ত ট্রেন আসবে এবং ইসলামপুর স্টেশন থেকেই ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবে। তারা আরো বলেন, এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জামালপুর থেকেই ট্রেন ঢাকা ফেরত যাবে। অপরদিকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের মন্ডল বাজার অদূরে পাকা রাস্তাটি নদীতে বিলিন হচ্ছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ি, বকসিগঞ্জ ও জামালপুর সদর ৭টি উপজেলার ৬৮টি ইউপির মধ্যে প্রায় ৪০টি ইউপির বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

এদিকে ইসলামপুর উপজেলার সাপধুরী, বেলগাছা, চিনাডুলী, কুলকান্দি ইউপির যমুনার দ্বীপ চরের লোকজন নৌকার অভাবে তাদের ঘরের ধান চাল এমনকি গৃহপালিত পশু নিরাপদ স্থানে নিতে পারছে না বলে বেলগাছা ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানিয়েছেন।

 বন্যা কবলিত এলাকার গুলোর মধ্যে রয়েছে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা চুকাইবাড়ী, চিকাজানী, বাহাদুনাবাদ, চর আমখাওয়া, দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউপি ও দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা, ইসলামপুর উপজেলার পার্থর্শী কুলকান্দি, বেলগাছা, চিনাডুলী, নোয়ারপাড়া, ইসলামপুর সদর, পলবান্দা গোয়ালের চর, গাইবান্দা, চরগোয়ালীনী, চরপুটিমারী ইউনিয়ন ও ইসলামপুর পৌরসভা। মেলান্দহ উপজেলার, কুলিয়া, দুরমুঠ, মাহমুদপুর, শ্যামপুর, নাংলা, আদ্রা,ফুলকোচা, ঝাউগড়া ও ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন। মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা জোড়খালী, বালিজুড়ি ও চর পাকেরদহ ইউনিয়ন। সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা, আওনা, পোগলদিঘা, সাতপোয়া ও কামরাবাদ, ভাটার ইউনিয়ন। বকশিগঞ্জ উপজেলার সাদুরপাড়া, মেরুরচর, বগারচর, ইউনিয়ন, জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষীরচর,তুলশিরচর, লক্ষ্মীরচর, মেস্টা, কেন্দুয়ার  ইউপির আংশিক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। 

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষসহ গৃহপালিত পশু গরু, মহিষ, ছাগল হাঁস, মরগি পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বন্যা কবলিত মানুষগুলো উচু বাঁধে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। বানভাসিদের শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধা পানির, গো খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। 

এদিকে চলতি বন্যায় জামালপুর জেলায় বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ জন মারা গেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী বলেন, বন্যার্ত মানুষের জন্য এরইমধ্যে সারা জেলায় ৩১০ মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৪ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আরো ত্রাণ রয়েছে যা চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হবে।

জামালপুর সিভিল সার্জন ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানান, এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় ৮০টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এদিকে দেওয়ানগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পানি ঢোকায় কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দেওয়ানগঞ্জ আরো ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি উঠেছে বলেও জানান তিনি।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং এ বন্যা দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ