জাপায় আসছে পরিবর্তন, ফিরছেন দলছুটরা

জাপায় আসছে পরিবর্তন, ফিরছেন দলছুটরা

কাজী লুৎফুল কবীর ও সোহেল রাহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪২ ২৮ মে ২০১৯  

ডেইলি বাংলাদেশ

ডেইলি বাংলাদেশ

এরশাদ সহোদর জিএম কাদেরের হাত ধরে জাতীয় পার্টিতে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফিরছেন দলছুটরা। আসছেন নতুন অনেক উৎসাহি ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি। যোগ দিচ্ছেন দেশের বড় বেশ কয়েকটি দলের নেতারাও। এরইমধ্যে অনেকে যোগাযোগ শুরু করেছেন। দলছুটরাই নিয়ে আসছেন তাদের। আর সেই সঙ্গে দলে আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন। পালাবদলে প্রথমধাপে হাওয়া লেগেছে মহাসচিব পদে।  

১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর গত ৩৩ বছরে মহাসচিব পদে এসেছেন ডজনখানেক নেতা। গুরুত্বপূর্ণ ওই পদে আবারো আসছে পরিবর্তন। দায়িত্ব পেতে প্রস্তুত প্রায় অর্ধডজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। চলছে জোর লবিং। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও নীতি নির্ধারণী ফোরামে তদবিরে ব্যস্ত পদ পেতে ইচ্ছুকরা। মাঝে-মধ্যে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের কাছেও। সঙ্গ দিচ্ছেন তাকে। এদিকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা হচ্ছে ৮টি অতিরিক্ত মহাসচিবের পদ। তবে আপাতত নিয়োগ দেয়া হবে দু’জনকে।

লবিং-গ্রুপিং আর তদবির যাই হোক না কেন, জনগণের রাজনৈতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পার্টি আধুনিক করতে প্রাধান্য পাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, রাজনৈতিক ধারায় পরিবর্তন আনতে পার্টিকে অধুনিকায়ন করতে হবে। এছাড়া ক্ষমতার হাল ধরার মতো করে তৈরি করতে হবে দলকে। সক্রিয় রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের পরই জাতীয় পার্টির অবস্থান। কিন্তু দল ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদীরা ঘুরে দাঁড় করানোর পথে ষড়যন্ত্রের জাল পেতে রাখেন।  

জাপা সূত্রের দাবি, ৩৩ বছরে জাপার মহাসচিব পদে ডজন খানেক নেতার আসা-যাওয়া রাজনীতিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এরশাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে সবাই এসে শুধু নিজকে অলঙ্কৃত করেছেন। গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। কেউ আবার ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পার্টিকে চালিয়েছেন নিজের মতো করে। পছন্দের অযোগ্য ব্যক্তিদের বসিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। নিজের প্রয়োজনে কাউকে দিয়েছেন পদন্নোতি, অথবা অব্যাহতি বা বহিষ্কার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অযোগ্যদের দেয়া হয় পদন্নোতি। যে, যখন যে পদে বসার যোগ্য নয়, তখন অর্থ লেনদেনে তাকে দেয়া হয়েছে পদন্নোতি। আর তাতে দিনে দিনে দল ছেড়ে গেছেন জনপ্রিয় নেতা, শক্তিশালী কর্মী বাহিনী। দেশজুড়ে আকারে ছোট হয়ে এসেছে জাপা। আবার কেউ কেউ সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ভেঙেছেন দল। নিজে হয়েছেন শব্দ সংক্ষেপে নামধারী দলের চেয়ারম্যান বা মহাসচিব। জাতীয় পার্টি ভেঙে গড়া এমন অনেক দল হারিয়েও গেছে কালের স্রোতে। তবে দল ভেঙে যে নেতাই গিয়েছেন, নিয়ে যেতে পারেননি লাঙ্গলভক্ত কর্মীবাহিনী। তাই এ ধরনের নেতাদের বাদ দিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয় করে পার্টিকে শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই নতুন নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য আগে শক্তিশালী করতে হবে তৃণমূল। তাই প্রতি বিভাগে একজন করে অতিরিক্ত মহাসচিব করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। ওই ৮ জনের কাজ হবে নিজ নিজ বিভাগে পার্টিকে শক্তিশালী করে যোগ্যদের পদায়ন করা। যে কোনো কর্মসূচির জন্য কর্মী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপা সূত্রের দাবি, মহাসচিব হিসেবে মশিউর রহমান রাঙ্গা পুরোপুরি ব্যর্থ। তাছাড়া তিনি পার্টির কাজে টাকা খরচ করতেও রাজি নন। এমনকি পার্টির নেতাকর্মীদের আপদ-বিপদের খবর না রেখে তিনি বেশিরভাগ সময় সাবেক মহাসচিবের দরবারেই পড়ে থাকেন বলে অভিযোগ পার্টির মধ্যম সারির কেন্দ্রীয় অনেক নেতার। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার (উপজেলা) নির্বাচন থেকে শুরু করে আজ অবধি তৃণমূলের কোনো খবর নেননি রাঙ্গা। তাই তৃণমূল নেতাদের দাবি পার্টির জন্য ত্যাগ শিকারে যোগ্য এমন কাউকে করা হোক মহাসচিব। এরইমধ্যে তৃণমূল থেকে নেয়া হয়েছে একটি তালিকাও। সেই তালিকায় রয়েছেন কাজী ফিরোজ রশিদ, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, গোলাম কিবরিয়া টিপুর নাম। রাজনীতি ও সাংগঠনিক দক্ষতা, এলাকা ভিত্তিক জনপ্রিয়তা ও আর্থিক সামর্থের ওপর ভিত্তিতে করা হয়েছে ওই তালিকা। 

পার্টিতে গুঞ্জন রয়েছে ঈদের পর মন্ত্রিসভায় যোগ দিচ্ছে জাপা। এতে দলের চার থেকে পাঁচজনের জায়গা হবে। যদি তা হয়, তবে মন্ত্রিসভায় সুযোগ পাওয়া নেতারা পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকবেন না।

এছাড়া সাংগঠনিক দক্ষতায় অতিরিক্ত মহাসচিব পদে এগিয়ে আছেন অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, সৈয়দ দিদার বখত, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, ব্যারিস্টার শামিম হায়দার পাটোয়ারি, তাজ রহমান ও হাসিবুল ইসলাম জয়। তবে যে চারজনকেই অতিরিক্ত মহাসচিব হিসেবে বেছে নেয়া হোক না কেন, তাদের মধ্যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী তরুণ সংগঠক পার্টি যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয়। কিন্তু ‘একজনকে দুই পদ নয়’- এ নীতিতে চলতে চান নতুন নেতৃত্ব। বিশেষ করে দলের নীতি নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কাজে লাগাতে চান অভিভাবক হিসেবে। তাদের কোনোভাবেই সাংগঠনিক পদে এনে তৃণমূল ও কেন্দ্রে যোগ্যদের সাংগঠনিক তৎপরতা থেকে দূরে বা নিষ্ক্রিয় রাখতে চান না। 

সূত্রটি জানায়, পার্টিতে বিভক্তি তৈরির চক্রান্ত থেমে নেই। সুবিধাবাদী গ্রুপটি সব সময় এরশাদ পরিবারে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে ফায়দা লোটার চক্রান্তে লিপ্ত থাকে। কারণ তারা চায় চেয়ারম্যানের পরিবারের কোনো সক্রিয় সদস্য যেনো পার্টির দায়িত্বে না থাকেন। তারা এমন একজনকে নেতৃত্বে চায় যিনি পার্টি ও জনগণ থেকে দূরে থাকবেন। তিনি যেন সব সময় বির্তকিত ও সমালোচিত অবস্থানে থাকেন। কলাগাছের মতো শুধু চেয়ারম্যান হয়ে বসে থাকবেন আর তার নাম ভাঙিয়ে গ্রুপটি গরিব নেতাকর্মীদের টাকা লুটপাট করে যাবেন। তারাই জি এম কাদেরের নেতৃত্বে রাজনীতি করতে সঙ্কোচ বোধ করেন।

এমন একটি গ্রুপ তৈরি করে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। তার সঙ্গে আছেন এরশাদের প্রেস সেক্রেটারি সূনীল শুভরায়, সাবেক ফ্রীডম পার্টি নেতা জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়সল চিশতি, রওশন আরা মান্নান, মেজর অবসরপ্রাপ্ত খালেদ আখতার, আতিকুর রহমান আতিক, ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার, নারায়ণগঞ্জের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আহসান শাহজাদা, বেলাল হোসেন, সুমন আশরাফ, মিজানুর রহমান, দ্বীন ইসলাম, মোহাম্মদ নোমান মিয়া, জিয়াউর রহমান, বিপুল গাজী, কাজী আবুল খায়ের, হেলাল উদ্দিন হেলাল, মাসুদুর রহমান মাসুম, সাবেক ছাত্রনেতা হাসান মিরু ও ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী। তৃণমূল নেতাকর্মীদের আপত্তি জালালী কি করে সাংগঠনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন? তিনি তো সূনীলের মতো পলিটিক্যাল সেক্রেটারি নন যে, যখন তখন যে কোনো সিদ্ধান্তে তার মাথা ঘাতে হবে?

ওই গ্রুপটি নানাভাবে পার্টির অন্যান্য প্রেসিডিয়াম ও কেন্দ্রীয় সদস্যদের নিজেদের পক্ষে নিতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। 

তৃণমূলের নেতাদের অভিযোগ ও মহাসচিব পরিবর্তন সম্পর্কে পার্টির নয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, সিনিয়র নেতারা কে কখন কি করছেন, তা তৃণমূল নেতারা সবসময় নজরে রাখেন। তাই কে কি ভুল করছেন তারা ভালো বলতে পারবেন। সে জন্য তৃণমূলের মতামতকে অবশ্যই সম্মান জানানো উচিত। তিনি বলেন, মহাসচিব পরিবর্তনের বিষয়ে আমার জানা নেই। আর অতিরিক্ত মহাসচিব পদ যদি পার্টির জন্য ভালো হয় তাহলে আমার দ্বিমতের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, চক্রান্তের কথা বললেন- রাজনীতিতে সব দলেই এ ধরনের ছোট বড় কিছু থাকে। তবে কে চক্রান্ত করছে তার সঙ্গে জড়িত না থাকলে বলা মুশকিল। এটাই সত্যি আপনি যেমন শুনেছেন আমিও তেমনি শুনেছি। এছাড়া যা রটে তার কিছুটা সত্যতা তো থাকেই। তবে চক্রান্ত যেই করুক সেটা তার নিজের ক্ষতিই বয়ে আনবেন।

এদিকে দলের প্রয়োজনে যেসব নেতাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- সাবেক এমপি শেখ আবুল হোসেন, সাবেক এমপি আব্দুল গাফফার বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট মহানন্দ সরকার, মহানন্দের মেয়ে সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুভদ্রা সরকার, অ্যাডভোকেট অচিন্ত কুমার দাশ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ওমর ফারুক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মল্লিক মহিউদ্দিন, সাবেক এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সাবেক জেলা জাপার সভাপতি অ্যাডভোকেট স.ম বাবর আলী, সাবেক কাউন্সিলর ও ডেপুটি মেয়র এবং সাবেক এমপি মোক্তার হোসেন, সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, জাপার সাবেক মহাসচিব খালেদুর রহমান টিটো, সাবেক এমপি ফিরোজ কবির, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম বাচ্চু, হারুন অর রশিদ, সাবেক এমপি বর্তমানে বিএনপি জোটে থাকা জাফার জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লিংকন, জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমানে বিএনপি জোটে থাকা জাফর জাপার মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার, সাবেক জাপা নেতা এম.এ আল মামুন, আব্দুস সাত্তার মোড়ল, স.ম মনোয়ার, মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম তরিক, মোহাম্মদ সরাফত হোসেন বাবলু, মোহাম্মদ পলাশ, গাজী আব্দুর রউফ, মোহাম্মদ ইউনুস আহমেদ, নড়াইলের সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল আহমেদ, জেলা জাপার সাবেক সভাপতি শরীফ মুনির, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট তোজম্মেল শেখ টিটোর ছেলে জয়সহ জাপার দুঃসময়ের অনেক কাণ্ডারি দলে ফিরতে চান। এর মধ্যে ঈদের পরই পার্টিতে ফিরছেন আহসান হাবিব লিংকনসহ বেশ কয়েকজন নেতা।

এছাড়া বিভিন্ন সময় পার্টি থেকে বহিস্কৃত বা অব্যাহতি দেয়া নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এরইমধ্যে বরিশাল জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন তাপসের বহিস্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগামী দু’মাসের মধ্যে আরো অনেকের বহিস্কার বা অব্যাহতি আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।   
  
ডেইলি বাংলাদেশ/এস.আর/এসআই/এলকে