জান্নাতের সুন্দর দৃশ্যাবলী 

জান্নাতের সুন্দর দৃশ্যাবলী 

পর্ব-১

নুসরাত জাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৪ ৩১ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:০৫ ৩১ মে ২০২০

জান্নাত। যা আজ পর্যন্ত কোনো চোখ দেখেনি। কোনো কান যার আলোচনা শোনেনি। কোনো মানুষের দিলে আজ পর্যন্ত যার কল্পনাও জাগেনি। (সহিহ মুসলিম, তিরমিজি শরিফ)। ছবি: প্রতীকী

জান্নাত। যা আজ পর্যন্ত কোনো চোখ দেখেনি। কোনো কান যার আলোচনা শোনেনি। কোনো মানুষের দিলে আজ পর্যন্ত যার কল্পনাও জাগেনি। (সহিহ মুসলিম, তিরমিজি শরিফ)। ছবি: প্রতীকী

মৃত্যুর পরের অবস্থা জানার কোনো রাস্তা মানুষের কাছে নেই। কোনো জ্ঞান, কোনো শাস্ত্র, কোনো প্রচার-মাধ্যম এমন নেই, যা মানুষকে মৃত্যুর পরের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ জানাতে পারে। যে ব্যক্তি দুনিয়া ছেড়ে যায়, সে-ই শুধু সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়। কিন্তু বিদায় হওয়া ব্যক্তির কোনো খবর আমরা রাখি না।

এক বুজুর্গের আশ্চর্য ঘটনা:

একজন বুজুর্গ ছিলেন। মুরিদরা একবার তাকে বলল, হজরত! যে ব্যক্তি দুনিয়া ছেড়ে যায়, সে ফিরে এসে আর খবর দেয় না। সে কোথায় গিয়েছে, তার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে কিংবা সে কী দেখেছে, কিছুই বলে না। এমন কোনো তদবির বলুন, যাতে সেখানকার কোনো খবর আমরা পাই। বুজুর্গ বললেন, এক কাজ কর, যখন আমার মৃত্যু হবে এবং আমাকে কবরে দাফন করা হবে তখন কবরে আমার কাছে একটি কাগজ ও কলম রেখে দিয়ো। আমার যদি কোনো সুযোগ হয় তাহলে আমি সেখানে কী ঘটে, তা তোমাদেরকে লিখে জানাব। এ কথা শুনে লোকেরা খুব খুশি হলো। বললো- যাক, একজনকে তো পাওয়া গেল।

যখন বুজুর্গের ইন্তেকাল হলো, তার অসিয়ত মোতাবেক দাফন করার সময় তার লাশের পাশে কাগজ-কলম রেখে দেয়া হলো। বুজুর্গ মুরিদদেরকে বলে দিয়েছিলেন যে, দ্বিতীয় দিন কবরে এসে তোমরা কাগজ তুলে নিয়ো। তাতে সব খবরাখবর লেখা দেখবে। সেমতে পরদিন লোকেরা তার কবরে এসে দেখল, কবরের ওপর একটি চিরকুট লেখা আছে। চিরকুটটি দেখে লোকেরা খুব খুশি হলো। যাক, আজ আমরা সেই দুনিয়ার খবর জানতে পারব। কিন্তু তারা আশ্চর্য হয়ে দেখল, চিরকুটে লেখা আছে, এখানকার অবস্থা দেখার লোক আছে। বলার লোক নেই।

আল্লাহ তায়ালাই জানেন, ঘটনাটি সত্য নাকি মিথ্যা। আল্লাহ তায়ালার কুদরতের পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব না। তাই ঘটনাটি সত্যও হতে পারে কিংবা মিথ্যা ও মনগড়াও হতে পারে। তবে সত্য কথা হলো, সেখানকার অবস্থা বলার মতো কেউ নেই। দেখার মতো আছে। আল্লাহ তায়ালা সেখানকার অবস্থা এতটাই গোপন রেখেছেন যে, কারো কাছেই তা বিন্দুমাত্র প্রকাশ হয় না। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা এবং হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতটুকু বলেছেন তারচেয়ে বেশি সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে কোনো কিছু জানার, কারো কোনো রাস্তা নেই। কোরআন ও হাদিসে সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে যেসব কথা এসেছে, সেগুলো থেকে কিছু আলোচনা তুলে ধরতে চাই।

সর্বনিম্ন জান্নাতির জান্নাতের অবস্থা:

হজরত মুগিরা ইবনে শোবা (রাদি.) বর্ণনা করেন, হজরত মুসা (আ.) আল্লাহ তায়ালাকে জিজ্ঞাসা করেন, হে পরোয়ারদিগার! জান্নাতবাসীদের মধ্যে সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারী কে হবে? উত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন সব জান্নাতি জান্নাতে চলে যাবে এবং জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে চলে যাবে। একব্যক্তি জান্নাতে না গিয়ে জান্নাতের আশপাশের এলাকায় বসে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি যখন দুনিয়ায় ছিলে তখন অনেক বড় বড় বাদশার নাম শুনেছ। সেই বাদশাদের মধ্য থেকে তোমার পছন্দ অনুযায়ী চারজন বাদশার কথা বর্ণনা কর। এরপর সেই বাদশাদের রাজত্ব যতটুকু ছিল তন্মধ্য থেকে যতটুকু অংশের তুমি পার নাম উল্লেখ কর। লোকটি বলবে, ইয়া আল্লাহ! আমি অমুক অমুক বাদশার কথা শুনেছি। তাদের রাজত্ব অনেক বড় ছিল। তারা অনেক বড় নেয়ামত লাভ করেছিল। আমার মন চায় আমারও সেইরূপ রাজত্ব হোক। এরপর সে একে একে চারজন বাদশার রাজত্বের কথা বলবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি তো চার বাদশার রাজত্বের বর্ণনা দিলে কিন্তু সেই বাদশারা যেই সুখ ভোগ করেছিল সে সম্পর্কে তো তুমি শুনেছ। সেই নেয়ামতরাজি ও বিলাসসামগ্রীর মধ্য থেকে যা তুমি পেতে চাও তা উল্লেখ কর। এরপর লোকটি একে একে বিভিন্ন সুখ ভোগের উপকরণের বর্ণনা দেবে। এরপর বলবে, আমি চাই এসব উপকরণ আমিও লাভ করি

এরপর আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি যেসব বাদশার নাম বললে, যেসব রাজত্বের বর্ণনা দিলে, যেসব নেয়ামত ও সুখসামগ্রীর কথা উল্লেখ করলে, তুমি যদি তা পেয়ে যাও, তুমি সন্তুষ্ট হবে তো? লোকটি বলবে, হে আল্লাহ! এরচেয়ে বড় নেয়ামত আর কি হতে পারে? আমি অবশ্যই সন্তুষ্ট হব। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আচ্ছা, তুমি যতগুলো রাজত্বের কথা বলেছ, যেসব নেয়ামত এবং সুখসামগ্রীর কথা বলেছ, তারচেয়ে দশগুণ বেশি আমি তোমাকে দান করলাম।

আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে বলেন, জান্নাতের সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারী, যে সবচেয়ে নিম্ন স্তরের জান্নাত পাবে, সে এই ব্যক্তি। মুসা (আ.) বলেন, যখন সর্বনিম্ন ব্যক্তির এই অবস্থা, তখন যে ব্যক্তি আপনার পছন্দনীয় বান্দা হবে, যে সর্বোচ্চ স্তরের জান্নাত লাভ করবে তার অবস্থা কি হবে? উত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুসা! যে আমার প্রিয় বান্দা হবে, তার পুরস্কারের জিনিসগুলো আমি নিজ হাতে তৈরি করে তার ভাণ্ডারে মোহর মেরে সংরক্ষিত করে রেখেছি। তাতে এমন জিনিসও আছে,

وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, " إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ, أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ

যা আজ পর্যন্ত কোনো চোখ দেখেনি। কোনো কান যার আলোচনা শোনেনি। কোনো মানুষের দিলে আজ পর্যন্ত যার কল্পনাও জাগেনি। (সহিহ মুসলিম, তিরমিজি শরিফ)।

আরেকজন সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারীর জান্নাত:

অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি বলেন, সর্বশেষে যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে হবে এমন ব্যক্তি, যাকে তার বদআমলের কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ মানুষ মুমিন হলেও যদি বদআমল করে তা হলে প্রথমে বদআমলের শাস্তি তাকে ভোগ করতে হবে। তাই প্রথমে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। লোকটি জাহান্নামে জ্বলতে থাকবে। একসময় সে আল্লাহকে বলবে, হে আল্লাহ! জাহান্নামের উত্তাপ ও গরম আমাকে একেবারে ঝলসে দিয়েছে। আপনি যদি কিছুক্ষণের জন্য আমাকে জাহান্নাম থেকে বের করে উপরে কিনারায় বসিয়ে দেন, যাতে কিছুক্ষণের জন্য আমি আগুনে পোড়া থেকে বেঁচে যাব, তা হলে আপনার বড় মেহেরবানি হবে।

আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবেন, যদি আমি তোমাকে বসিয়ে দিই তখন তুমি বলবে, আমাকে আরেকটু দূরে নিয়ে বসান। লোকটি তখন বলবে, হে আল্লাহ! আমি ওয়াদা করছি, একবার আপনি এখান থেকে বের করে উপরে বসিয়ে দেন। আমি সামনে যাওয়ার জন্য কিছুই বলব না। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ঠিক আছে, আমি তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। এরপর তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে উপরে কিনারায় বসিয়ে দেয়া হবে। কিছুক্ষণ সেখানে বসার পর যখন তার হুশ-জ্ঞান ফিরে আসবে। ক্ষণকাল পর সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বের করেছেন এবং এখানে বসিয়েছেন কিন্তু জাহান্নামের উত্তাপ এখান পর্যন্ত আসছে, কিছুক্ষণের জন্য আমাকে একটু দূরে স্থান দিন যাতে এই উত্তাপ না আসে।

আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি একটু আগেই ওয়াদা করেছ যে, দূরে যাওয়ার জন্য কিছুতেই বলবে না, আর এখনই তুমি ওয়াদা ভঙ্গ করছ? সে বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে আর একটু সামনে বেড়ে বসতে দিন তাহলে আমি আর কখনো কিছু বলব না এবং কিছুই আপনার কাছে চাইব না। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাকে কিছুটা দূরে সরে বসতে দেবেন। দূরে সরে এসে বসার পর সেখান থেকে তার জান্নাত দৃষ্টিগোচরে আসবে। কিছুক্ষণ পর সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনি তো আমাকে জাহান্নাম থেকে বের করেছেন। এখন তো আমি জান্নাত দেখতে পাচ্ছি। আমাকে একবার অনুমতি দিন, আমি একটু জান্নাত দেখে আসি এবং জান্নাতের দরজার কাছে গিয়ে দেখি জান্নাত কেমন।

আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি আবার ওয়াদা ভঙ্গ করছ। লোকটি বলবে, হে আল্লাহ! যখন আপনি নিজ অনুগ্রহে এখান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন তখন আমাকে জান্নাতও একপলক দেখার সুযোগ দিন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তোমাকে একনজর জান্নাত দেখালে তুমি বলবে, আমাকে সামান্য ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ দিন। লোকটি বলবে, ইয়া আল্লাহ! আমাকে শুধু জান্নাত একপলক দেখার সুযোগ দিন। এরপর আমি আপনার কাছে আর কিছুই চাব না।

আল্লাহ তায়ালা তাকে একঝলক জান্নাত দেখাবেন। জান্নাতকে একঝলক দেখার পর লোকটি আল্লাহ তায়ালাকে বলবে, হে আল্লাহ! আপনি আরহামুর রাহিমিন, সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। যখন আপনি আমাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন, হে আল্লাহ! তখন আপনি নিজ অনুগ্রহে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, দেখ আমি তো তোমাকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, তুমি ওয়াদা ভঙ্গ করবে। আচ্ছা, যাও, যখন আমি তোমাকে স্বীয় রহমতে এ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। এবার আমি তোমাকে তাতে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছি। জান্নাতে তোমাকে এত বড় স্থানের মালিক বানাচ্ছি, পুরা জমিনের আয়তন যতটুকু। 

লোকটি বলবে, হে আল্লাহ! আপনি আরহামুর রাহিমিন। অথচ আমার সঙ্গে আপনি মজাক করছেন? আমি কোথায় আর জান্নাতের এত বড় মালিকানা কোথায়? আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি মজাক করছি না। সত্যিই তোমাকে জান্নাতের এত বড় মালিকানা দান করলাম। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, তিরমিজি শরিফ)।

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে