Alexa জনৈক ধর্ষকের জবানবন্দী

জনৈক ধর্ষকের জবানবন্দী

প্রকাশিত: ১৫:৫৭ ৮ জানুয়ারি ২০২০  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

(আমরা যারা নিবন্ধ লিখি তাদের মাঝেমধ্যে খুব সমস্যায় পড়তে হয়। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এমন একটা বিষয় নিয়ে লিখতে বলেন যে সে সম্পর্কে আমার জ্ঞান হয়ত পুঁথিগত। যেমন আজ, সম্পাদক মশাই বললেন– আজ লিখুন ধর্ষণ নিয়ে। উত্তর দিলাম– এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান বড় কম। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে ধর্ষণের নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে একটা লিখেছিলাম তো। তা উনি বললেন– আজ অন্য আঙ্গিক নিয়ে লিখুন। সম্প্রতি দিল্লির নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের জন্যে চার ধর্ষক ও খুনিকে ২২ জানুয়ারি সকাল ৭টায় ফাঁসি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত সাত বছর ধরে বিভিন্ন আদালতে নির্ভয়া মামলা চলেছে। এতদিনে অপরাধীদের ফাঁসির আদেশ হলো। অপরদিকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় ধর্ষককে গ্রেফতারও করেছে র‍্যাব। হয়তো বিচারও হবে। জানা যাবে অপরাধীদের জবানবন্দীও। কিন্তু আইনের আওতায় তারা কখনোই সত্যি কথা বলে না। আমরাও কখনো উৎসাহী হই না ওদের সত্যি কথা শুনতে। কিন্তু আজ আমার মনে হল একজন ধর্ষকের অকপট জবানবন্দী আপনাদের শোনানো যাক।  ২০১৫ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের এক সাংবাদিকের কাছে এক ধর্ষকের দেয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখলাম) 

আমি জ্যাক। বাড়ি ইংল্যান্ডের একটি মফস্বল আধা শহরে। আমার বাবা-মা খুব একটা স্বচ্ছল ছিলেন না। দুজনেই কাজে যেতেন কিন্তু ফিরতেন মদ্যপ হয়ে। আমার দিকে নজর প্রায় কিছুই ছিল না। সরকারি স্কুলে বিনা পয়সায় এখানে পড়ার সুযোগ আছে। তাই কী করব! স্কুলে যেতাম। আমি কী করি কোথায় যাই তা নিয়ে আমার বাবা-মা’র কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। আমি পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের মতো বড় হয়েছি। স্কুল আমার ভালো লাগতো না। পাড়ার বখাটে ছেলেদের একটি দলের সদস্য ছিলাম।

এখানে পয়সা রোজগার করার কিছু ব্যবস্থা আছে। কুলিগিরি করে, গাড়ি পরিষ্কার করে কিছু কামানো যায়। সেই কামাই দিয়ে ড্রাগ কিনতাম। একটু বেশি কামালে মদ। কাজেই ড্রাগ আর এলক্যাহল আমাদের জীবন সঙ্গী হয়ে উঠল। আমাদের একটা মজার খেলা ছিল। নতুন মার্সিডিজ গাড়ির চাকা ছুরি দিয়ে ফুটো করে দেয়া। কী যে আনন্দ পেতাম। গাড়ির মালিক কী মনে করবে, কতো পাউন্ড লাগবে একটা টায়ার লাগাতে এ সব চিন্তা মাথায় আসতো না মোটেই। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ির এই অবস্তা দেখে মালিকের আমাদের ডাকা ছাড়া উপায় ছিল না। আমরা গাড়ি ঠেলতাম। পয়সা পেতাম। দু-একজন গাঁইগুঁই করত বটে। কিন্তু আমার খুব আনন্দ লাগতো ফিস ফিস করে চাকার বাতাস ধীরে ধীরে বের হয়ে গাড়িটা নেতিয়ে যাওয়া দেখতে। দামী গাড়ির সাইড মিরর ভাঙ্গাও ছিল আমার আরেক মজার খেলা। এর মধ্যে আমার এক বন্ধুর তার বান্ধবীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক হয়েছিল প্রেমিকার অনিচ্ছায়। যদিও আমার বন্ধুটি মনে করেছিল তা সহবাসই। কোনো অপরিচিত স্থান নয়, ঘটনা যে ঘটেছে তার নিজের বিছানাতেই। তবে সেটা যে একটি অন্যায় গর্হিত কাজ সে ধারণাটাই আমার তখন ছিলনা। আমি সে কথা বলেও ছিলাম বন্ধুটিকে। আমিও তো আমার স্কুলের সাথী ও প্রতিবেশী মেয়েদের সঙ্গে আমি একই কাজ করেছি। অবশ্য এসব নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।  

আমি ভাবতাম জগতের যা কিছু সব আমার উপভোগ্য, এতে কারো বাধা দেয়ার অধিকার নেই,কারো নিষেধ করা উচিত নয়। সবার আগে আমার অধিকার আমার উপরে কেউ নেই। আমি কারো জন্যে নই সব আমার জন্যে।

এর মধ্যে অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল তবে কোনোটাই রোমান্টিক ছিল বলবো না। আমি একটা জিনিষই জানতাম যে, আমার সেক্সের প্রয়োজন, ব্যস মেয়ে একটা হলেই হলো আমি তাকে প্রস্তাব দিতাম। রাজি না হলে জোর চালাতাম। মনে করতাম আমার যেহেতু সেক্স ভাল লাগে মেয়েদেরও ভাল লাগার কথা। মেয়েদের তাড়িয়ে বেড়ানো আমার নেশা ছিল। আসলে পর্ণোগ্রাফি খুব দেখতাম। তখন সব কিছুই এক্সাইটিং সব কিছুই সুন্দর আর আনন্দের মনে হতো। সব চেয়ে ভাল লাগতো নিজের শক্তি প্রদর্শনিতে। আমি যে পুরুষ এটা সকলে জানুক।

এর মধ্যে আমার এক বান্ধবী জুলি একদিন আমার ঘরে এল। বাসায় তখন কেউ নেই। সে এসেই সে আমাকে ড্রাগ ছেড়ে দিতে উপদেশ দিতে থাকে। উপদেশ শুনতে শুনতে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল। তর্কের এক পর্যায়ে সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। চলে গেলি, ভাল ছিলি, আবার এলি কেন? এক ঘণ্টা পরে জুলি যখন ঘরে ফিরে আসে আমি তখন পূর্ণ মাতাল। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকে জোর করে সোফার উপর শুইয়ে দেই। সে বাধা দিতে থাকে। সে যত বাধা দিতে থাকে আমার হিংস্রতা ততই বাড়তে থাকে। এটা কোনো ভেবেচিন্তে করা ঘটনা ছিলনা। আমি আজও বুঝি না কেন সেদিন আমি এমন করেছিলাম। এখন মনে হয় একটা কিছু আমার মস্তিষ্কে একটি সিগন্যাল বা নির্দেশকের কাজ করেছিল। না হলে আমি সুস্থ মাথায় আমার বান্ধবীকে কেন ধর্ষণ করবো? হয়ত এর একটি কারণ ছিল ড্রাগ ডিলারদের পাওনা বহু টাকার ঋণ আর কিছুদিন যাবত অন্যান্য বিষয় চিন্তা করে আমি নিজেকে বড়  বঞ্চিত ভাবতে সুরু করেছিল্ম। আমি আদৌ সুখী ছিলাম না। যদিও সেই রাতে জুলিকে ধর্ষণ করাতে আমার কোনো প্রকারের দুঃখ বা অনুভুতি ছিল না। সারা রাত সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি জুলি ঘরে নেই। কিছুক্ষণ পরেই দরোজায় শব্দ শুনতে পাই। দরজা খুলে দেখি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে, পাশেই পুলিশের ভ্যান। আমি আদালতে সরাসরি স্পষ্টভাবে আমার দোষ স্বীকার করে নিয়েছিলাম।  আমি দোষী সাব্যস্ত হলাম। তিন বছরের জেল হলো।   

কারাগারে গিয়ে দেখলাম একটি বিশেষ কক্ষ আমার মতো যৌন অপরাধীদের জন্যে রাখা আছে। অন্যদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। যৌন অপরাধীরা বিভিন্ন ধরনের পরিবার থেকে আসে। দেখলাম অনেকেই বয়ষ্ক এবং শিক্ষিত সমাজ থেকে আসা। খুব কম অপরাধীরাই তাদের অপরাধ নিজে থেকে স্বীকার করেন। বেশিরভাগ লোকেরাই ধর্ষণের জন্যে মেয়েটিকেই দায়ী করেন এই বলে যে নারীই পুরুষকে সেক্স করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু আমি  জানতাম যে আমিই দোষী, সমস্যা আমার মধ্যে ছিল, নারীর মধ্যে নয়। কারাগারে এক কক্ষের লোকেরা অন্য কক্ষের লোকের অবস্থা জানতে পারে না। তবে আমাদের গ্রুপ থেরাপি হত। থখন যে থেরাপিস্ট তারা একে অন্যের পেছনের কাহিনি জানতে পারত, কারণ এখানে সকলেই সকলের অভিজ্ঞতা ঘটনার প্রেক্ষাপট সহ সব কিছু বর্ণনা করতে হয়। গ্রুপ থেরাপি টিচারের কাছে অনেকেই মিথ্যা বলার চেষ্টা করে কিন্তু টিচাররা এতোই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ যে, শান্ত শিষ্ট আলাপচারিতার মাধ্যমে তারা কোনো না কোনোভাবে সত্যটা অপরাধীর মুখ থেকে বের করেই ছাড়েন। থেরাপি ক্লাসে কথা বলার সময় অনেককেই বলতে শুনলাম যে, তারা মনে করতেন নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব প্রকৃতি নির্ধারিত, নারী পুরুষের চেয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবেও দূর্বল। আর নারীকে কিচেনেই মানায় ভালো। আমিও ছোটবেলা থেকেই এমনটি মনে করতাম, অবশ্য এটা আমি আমার বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলাম।

আঠেরো মাসের পর যখন আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো আমার পায়ে ট্যাগ লাগিয়ে আমার উপর কার্ফিউ জারি করে দেয়া হলো। আমার চলাফেরা করার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হলো। জেল থেকে বের হয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যেই আবার ধরা পড়ি রাস্তায় অশ্লীলতা প্রদর্শণেররজন্যে। এই অপরাধে আরো ১ বছরের সাজা হলো। ১ বছর পর বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে আরো ১ বছর, সব মিলিয়ে সর্বমোট মোট ৩ বছর জেল খেটেছি।

তিন বছর জেলের শাস্তি, ছয় বছরের ট্রেইনিং আর দুই বছরের কাউন্সেলিং নেয়ার পর আমি এখন অনেক পরিণত, ভাল মন্দ যাচাইয়ের ব্যাপারে অনেক সচেতন। আমি জেল খানায় আসার পর বুঝতে শুরু করলাম জুলিকে আমি কত ভীষণভাবে মিস করছি। আমি নিজের দেহে মনে অনুভব করতে থাকি জুলির শারীরিক মানসিক ব্যথা। আমি আমার মন থেকে চিন্তা থেকে জুলিকে এক মুহূর্তের জন্যেও সরাতে পারিনি। আমার জেলের শাস্তি, দীর্ঘ দিনের ট্রেইনিং ও কয়েক মাসের কাউন্সেলিং শেষে যখন জেল থেকে মুক্তির দিন ঘনিয়ে আসলো আমার মণে হল কী করি, কোথায় যাই, কার কাছে যাই আমি ভেবে কূল পাই না। আমি কি পারবো নিজেকে কনট্রোল করতে? আমি কি স্বাভাবিক সুস্থ হতে পেরেছি? আমি জানি কোথাও কাজ পেতে হলে নিয়োগকর্তার কাছে আমাকে আমার সব কিছু প্রকাশ করতে হবে। আর স্বাভাবিক পথে বাঁচতে হলে আমাকে কাজ করতেই হবে। আমি আমার নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ আমি এখনো জানি না, বুঝে উঠতে পারি না, কোন্ সে শক্তি আমার মস্তিষ্কের কোন্ সেই উপাদান যা আমাকে অপরাধে উৎসাহিত করতো? সেটা কি আমার মধ্যে আর নেই? আমি শাস্তিভুক্ত যৌন অপরাধীদের সমাজে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্তাপক ‘সার্কেল’ চিকিৎসা প্রোগ্রামের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরা একটি অবৈতনিক যৌন অপরাধীদের সাহায্যকারী ভলিন্টিয়ার দল। তারা আমাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে, যে কোনো প্রকারের সমস্যায় পড়লে আমি যেন তাদেরকে ফোন দেই, তারা ততক্ষণাৎ আমার সাহায্যে চলে আসবেন।

এই দেবদূতদের সাহায্যে আমি ক্রমে সমাজে স্থিতি লাভ করি। কিন্তু আমার অন্তরে অনুতাপের আগুন, দ্বিধান্বিত মন। আমি জুলির কাছে ক্ষমা চাইব ঠিক করলাম। আমি সাহস করে জুলির নম্বরে ফোন করলাম। বুকে প্রলয়ের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, হাত কাঁপছে, কণ্ঠ আড়ষ্ট, অপর প্রান্থ থেকে হ্যালো সুর শোনা যাচ্ছে। আমি হ্যালো বলতেই শুনলাম– হ্যালো জ্যাক, তুমি কেমন আছ? আমি আর কথা বলতে পারছি না শুধুই ভাবছি, জুলি আমার নাম্বার আজও ডিলিট করেনি?

- হ্যালো জ্যাক, আর ইউ ওকে?

- জুলি, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে ফোন করেছি। উড ইউ ফরগিভ মি, প্লিজ?

- ডেভিড, আমি সব কিছু জানি, সব শুনেছি, প্রার্থনা করি তুমি সুখি হও। আমার বিশ্বাস তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।

- থ্যাংক ইউ জুলি, থ্যাংক ইউ, গুড বাই। 

ক্ষমা পেয়ে আজ আমি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। মানুষের সুখে আমি আনন্দিত হই, মানুষের দুঃখে আমি ব্যথিত হই। আমার মন চায় আমি জীবনে যাদের দুঃখ দিয়েছি, যাদের অনিষ্ট করেছি, যার গাড়ি ভেঙ্গেছি তাদের সকলের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসি। কিন্তু তারা অনেকেই আমার থেকে বহু দূরে অজানা কোথাও চলে গেছেন আর অনেকেই এই পৃথিবীতে আর নেই। তাই রোজ মনে মনে বলি – হে ঈশ্বর, তুমি আমায় ক্ষমা কর। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর