দূরবীনপ্রথম প্রহর

জনগণের চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, সিইসিকে ধন্যবাদ

আফরোজা পারভীন
আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। 'অবিনাশী সাঈফ মীজান' প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য 'ডিসিসড' চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমরা সাধারণ মানুষ কিন্তু অসেচেতন নই। চোখে দেখলেই যে সেটা বিশ্বাস করে নেব এমনও নয়। ঘটনার গভীরে যাবার বা বিবেচনা করার বোধ আমাদের আছে। তাই একজন রিকশাওয়ালকেও আমরা নির্বাচন বা রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষাণাত্মক আলাপ করতে শুনি।

নির্বাচন নিয়ে কম শঙ্কার কথা তো শুনলাম না। ভোট আগেই হয়ে যাবে, ভোট দিতে যাওয়া যাবে না, তাড়িয়ে দেবে, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখবে, সহিংসতা হবে এমন অজস্র কথা।

আর একটা বড় আশঙ্কা ছিল নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে তো? খালেদা জিয়া কারাগারে। মূল নেতৃত্বহীন এই দল শেষাবধি নির্বাচনে যাবে তো? সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে ভেটাররাও উৎসাহিত বোধ করে। দুএকটি দল নিয়ে যে নির্বাচন তা যেন কেমন পানসে মনে হয়। অধিক দল আর অধিক প্রার্থী থাকলে ভোটারের বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করার, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার সুযোগ বেশি থাকে। তাই সাধারণ ভোটাররাও সবসময় চায়, সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক নির্বাচন হোক। আর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পায়। নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে লজ্জা পেতে হয় না আমাদের।

তবে এবার অনেকদিন পর জনগণের প্রত্যাশা পূর্ণ হয়েছে । এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ড. কামালের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট । বিএনপি তাদের অংশীদার। যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি ছাড়াও অন্যান্য দলও রয়েছে। রয়েছে বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী। সে হিসেবে নির্বাচনের মাঠ এবার ছিল জমজমাট।

এবার নির্বাচনে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে আমরা দেখেছি। অবশ্য সে কৃতিত্ব ড. কামাল হোসেনেও। তিনি সংলাপ করতে চেয়ে চিঠি দিলে সঙ্গে সঙ্গে সরকারপ্রধান সাড়া দেন। পর পর তিনবার তাদের সঙ্গে সংলাপ করেন। এবং একে একে ১৪০ টি দলের সঙ্গে তারা সংলাপে অংশ নেন। ফলশ্রুতিতে দলগুলি নির্বাচনে অংশও নিয়েছে।

তবে বিএনপি নির্বাচনের আগে থেকেই অভিযোগ জানিয়ে আসছিল তাদের নাকি প্রচারণা করতে দেয়া হচ্ছে না এই কথা বলে। কিন্তু তারা প্রচারণা করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন, মারধোর করেছে, এমন কোনো খবর আমরা পাইনি। এমনকি রাস্তাঘাটে তাদের একটা পোস্টারও আমরা দেখিনি। পোস্টার লাগাতে তাদের কি কেউ বাধা দিয়েছিল? আমাদের চেনাজানা হেভিওয়েট প্রার্থীদের কাউকেই কিন্তু গ্রেফতার হতে দেখিনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ছিলেন বিএনপির যেসব হেভিওয়েট রাজনীতিবিদ তাদের আমরা সক্রিয় দেখেছি। যা আমাদের ভালো লেগেছে। অনেকে নির্বাচন করতে পারেননি দন্ডপ্রাপ্ত ঋণখেলাপী বা অন্যকারণে। আইনে এলাউ না করলে তো পারবেন না এটা সহজ কথা। অনেকে আবার আদালতে গিয়ে প্রার্থীতা ফেরতও পেয়েছেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হয়েছেন। সেটা কী নির্বাচনজনিত কারণে বা অন্যকারণে তাও আমরা জানি না। ভোটের মাঠে তো সবই চালিয়ে দেয়া যায়।

তবে এবার একজন নির্বাচন কমিশনারের অযাচিত কথা ও আচরণের জন্য জনগণ প্রচণ্ড বিভ্রান্ত হয়েছে। নির্বাচন সম্পর্কে জনমনে ভীতির সঞ্চার করেছেন তিনি দিনের পর দিন। অতীতে যা কখনই হয়নি। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সাংবিধানিক হলেও তাদেরও আচরণবিধি রয়েছে। তাঁরা শপথ নিয়েছেন। একবার তিনি বলেছেন ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, নির্বাচনের পরিবেশ নেই, ইভিএম ব্যবহার সঙ্গত নয়’ । দুবার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সভা বর্জন করেন তিনি। এখানেই শেষ নয়। সাংবাদিকদের কাছে উক্ত কমিশনার তার বাক স্বাধীনতা খর্ব, অস্তিত্বে আঘাত, মিথ্যাচার এসব কথাও বলেন। তিনি সিইসিকে, ‘সব কমিশনার সমান’ একথাটা মনে রাখতেও মনে করিয়ে দেন। কাজেই শঙ্কা আরো ঘনীভূত হয়। মনে হয় ক্ষমতাসীন দল বুঝি জোরজবরদস্তি করে নির্বাচনে জিততে চাচ্ছে। এরপর নির্বাচনের আগে তিনি সাংবাদিকদের ডেকে আলাদা বার্তা দেন। তখন শঙ্কা মাত্রা ছাড়ায়। ভোটাররা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। এমনকি নির্বাচনের দিনও তিনি বলেছেন, ‘ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট পাননি। বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন কেমন নির্বাচন হচ্ছে। তার একার পক্ষে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব না। আর নির্বাচনকে তার একক রেসপনসিবিলিটি বলেও তিনি মনে করেন না’। তিনি মগবাজার ইস্পাহানি কেন্দ্রে বিএনপির কোন এজেন্ট দেখেননি বলেও জানান। তার এই কথাতে নির্বাচন আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে । এ যেন অনেকটা সেরকম, রাজা যত বলে, পারিষদ বলে শতগুণ। বিএনপি বা অন্য দলগুলি নির্বাচন নিয়ে যতটা শঙ্কা দ্বিধা বা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলো তার চেয়ে যেন অনেক বেশি ছিলো এই কমিশনার।

অনেকে সোসাল মিডিয়ায় লিখেছে, জানতাম তিনি বিএনপি, কিন্তু বিএনপির ক্যাডার জানতাম না। আমরাও জানতাম না। জানতাম তিনি বিএনপি থেকে মনোনীত। তবে জানি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কথা ও কাজে সচেতন থাকা দরকার। আর সবসময় একই কথা বলা দরকার। খালেদা জিয়ার নির্বাচনের ব্যাপারে চার কমিশনার একমত হন আর তিনি দ্বিমত পোষণ করেন। তখন তিনি স্পষ্ট করে তার অবস্থানটি বুঝিয়ে দেন।

সবকিছু দেখে শুনে ভেবেছিলাম, ভোটের নামে বুঝি প্রহসন হবে। ভোটের দিন আমার ছেলে ভোট দিয়ে এসে পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করল। তারপর সারাদিনই বসে ছিলাম টিভির সামনে। সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘জনগণ যে রায় দেবে তিনি তাইই মেনে নেবেন’। একই কথা বললেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলামকে। তারা দুজনই সকালে ভোট দিয়ে ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ড. কামাল বলেছেন, ‘পরিবেশ দেখে তিনি উৎসাহিত। তার চেয়েও বেশি বয়সের মানুষ লাঠি নিয়ে তিনতলায় গিয়ে ভোট দিয়েছে’। তবে তারা বিচ্ছিন্ন দু একটি কেন্দ্র সম্পর্কে অভিযোগ করেছেন। সিইসি বলেছেন, দু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে ভোটগ্রহণ ভালো হয়েছে। আর ভোটগ্রহণে কোন সমস্যা হলে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া আছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে ছিলো ভারত ও কানাডার পর্যবেক্ষক। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা এমনকি বৃদ্ধরাও ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে ছিল উচ্ছ্বসিত। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলব, আর পুরোনো পদ্ধতি আঁকড়ে বসে থাকব এমন কেমন কথা!

নির্বাচনের দিন সকালে ফখরুল ইসলাম ও ড. কামাল পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের দিক থেকে অভিযোগ বাড়তে থাকে। ড. কামাল বলেন, ঢাকার বাইরে তারা এজেন্ট দিতে পারেননি, বা পারলেও সে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। রাতেই ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এটা শহিদদের সাথে বেইমানি, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেইমানি। তিনি পুনঃনির্বাচন দাবি করেছেন। তিনি শহিদদের কথা বললেন, শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বললেন অথচ নির্বাচন করলেন জামাতীদের সঙ্গে নিয়ে। ড. জাফরউল্লাহ আর কাদের সিদ্দিকীর মতো লোকও একই পথে হাঁটলেন। জাফরউল্লা সরাসরি যোগ না দিলেও একসাথে বসলেন। এই আদর্শিক পরিবর্তন আমাদের মর্মাহত করে। যাক যা বলছিলাম, রুহুল কবির রিজভী দুবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন নানা অনিয়মের প্রশ্ন তুলে। ৬৯ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। এটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো নতুন ব্যাপার নয়। নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৭ জন। তার বেশ কয়েকজনই আওয়ামী লীগের কর্মী। আওয়ামী বিএনপি জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন কর্মী আহতও হয়েছেন।

ভোট জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সে অধিকার প্রয়োগ করতে তীব্র শীতে পায়ে হেঁটে, যুবক বৃদ্ধা অন্তসত্তা নারীরা কেউ কেউ চার পাঁচবার রিকশা বদলে ভোট দিতে গিয়েছিল। তারা চেয়েছিলেন একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে। তারা ভোট দিয়েছেন। আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, একটি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছে। অন্তত একটি ভোটারও কোনো অনিয়মের কথা বলেনি।

আওয়ামী লীগ সরকার তাদের দু’মেয়াদে কি করছেন, কতটা করেছেন সেই খতিয়ানে না গিয়েই একটা কথা আমি বলতে চাই, তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন। যা এই অর্ধ শতকে কোনো সরকার করেনি। উন্নয়ন তো শুধু অবকাঠামো বা উপরিকাঠামোর হয় না, উন্নয়ন হয় বোধের, আবেগের। শহিদ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারটি আমার কাছে আল্লাহর নিয়ামতের মতো মনে হয়।

আর হ্যাঁ, এখন উক্ত নীতিবান সৎ কমিশনার সাহেব ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি বলছেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, এই নির্বাচন ঐতিহ্য সৃষ্টি করবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারেরও ভূয়সী প্রশংসা করছেন তিনি। সংবাদে বেরিয়েছে, ‘তিনি পাল্টি মারলেন।’ জাতির সামনে তার ইমেজটা কি হলো তা কি তিনি বুঝতে পারছেন!

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা একট সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার পেয়েছি এতেই আনন্দিত। নতুন সরকারকে অনুরো করব, দল মতের উর্দ্ধে উঠে সবাইকে সাথে নিয়ে আমরা যাতে এগিয়ে যেতে পারি সেই লক্ষ্যে কাজ করুন। বড় বড় নীতির কথা যারা বলেছেন তাদের অতীত খতিয়ে দেখুন । উন্মোচন করুন তাদের বহুরূপী রূপ । উপড়ে ফেলুন ক্ষতিকর আগাছা। আমরা চাই, সুখে শান্তিতে নিরাপদে বাস করতে, চাই সৎ মানুষ। সিইসি স্যার একজন নির্লোভ নির্ভেজাল অনাড়ম্বর খাঁটি মানুষ। প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে কাজ করা ব্যাপক অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তাঁকে অসংখ্য জানাই, আগাগোড়া কথা কাজে এক থাকার জন্য। একটা চমৎকার নির্বাচন উপহার দেবার জন্য। অভিনন্দন সিইসি স্যার! স্বাগতম নতুন সরকার!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর