Alexa চাইলেই বর দেয় লাল দুর্গা! 

চাইলেই বর দেয় লাল দুর্গা! 

সাখাওয়াৎ লিটন, মৌলভীবাজার থেকে ফিরে ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৫৪ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: লাল দুর্গা

ছবি: লাল দুর্গা

‘তুমি আমার কাছে বর (আশীর্বাদ) চাও। আমি তোমাকে বর দিব।’ এমনই আশ্বাস দিয়েছিলেন লাল দুর্গা। তিনি নাকি তার ভক্তকে যথাযথ বর প্রদান করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, লাল দুর্গা স্বয়ং অধিষ্ঠান করেন। এটি জাগ্রত প্রতিমা। জানলে অবাক হবেন, উপমাহাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের দুর্গা মূর্তি এটি। 

লাল বর্ণের দেবী মূর্তি দেশের আর কোথাও নেই। যে কারণে এই প্রতিমার কাছে ভক্তদের অনেক আশা-আকাঙ্খা। পুরাণ অনুযায়ী দেবী দূর্গার লাল রূপকে দেবী কাত্তায়নী, ষষ্ঠ অবতার দেব দুর্গার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেবী দুর্গার রূদ্র রূপকে প্রতিফলিত করে লাল রং। এ থেকে অনেকের ধারণা লাল রঙা দূর্গা দেবী জাগ্রত। রয়েছে আলাদা শক্তি। চাইলেই পাওয়া যায় বর।

সর্বানন্দ দাস তৎকালীন সরকারের অধীনে আসামের শিবসাগরে মুন্সি পদে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন সাধক পুরুষ। একবার আসামের কামরুপ-কামাক্ষ্যায় বেড়াতে গিয়ে পূজার জন্য পাঁচ বছরের একটি মেয়ে চাইলে স্থানীয়রা তাকে একটি মেয়ে দেন। মহাষ্টমীর দিনে সর্বানন্দ দাস ওই মেয়েকে পূজা করার মনস্থ করেন, সেই সঙ্গে তার বাড়িতে পূজা সম্পন্ন করার জন্য তার স্ত্রী ও কর্মচারীকে নির্দেশ দেন। 

ভগবতীর জ্ঞানে ছয় ঘণ্টা পূজা শেষে প্রণাম করার সময় সর্বানন্দ দেখেন, কুমারীর গায়ের রং পরিবর্তন হয়ে লালবর্ণ ধারণ করেছে। মেয়েটির মধ্যে স্বয়ং দেবী ভর করে। মেয়েটি তখন সর্বানন্দ দাসকে বলে, তুমি আমার কাছে বর (আশীর্বাদ) চাও। আমি তোমাকে বর (আশীর্বাদ) দেব। সর্বানন্দ দাস তখন তার কাছে বর (আশীর্বাদ) চাইলেন। দেবী তখন নির্দেশ দিলেন পাঁচগাঁওয়ের প্রতিমার রং হবে লাল। লাল রঙের প্রতিমা প্রসঙ্গে সর্বানন্দ দাস বংশের উত্তরাধিকারী সঞ্জয় দাস এমনটিই উল্লেখ করেন। 

লাল দুর্গাসেই থেকে এখানে লাল বর্ণের মূর্তির পূজা হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন আনাচে কানাচে থেকে দেবী ভক্তরা এই লাল রঙের দূর্গা মূর্তিকে দর্শন করতে আসেন। মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার ও রাজনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার উত্তরে পাঁচগাঁও গ্রাম। সেই গ্রামে উদযাপিত হয় উপমহাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের জাগ্রত দুর্গা দেবীর পূজা। 

বৃষ্টি ভেজা শরৎ সকাল, শুভ্র কাশবন, আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দেখলেই বাঙালির মনে উৎসবের রং লেগে যায়। শুরু হয় নানা ব্যস্ততা। বরাবরের মতো এবারও দুর্গাদেবী কেন্দ্রিক ব্যস্ততা শুরু হয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে। তবে এখানকার আমেজটা একটু ভিন্ন। উপমহাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের জাগ্রত দুর্গাদেবীর পূজা হয় এখানে। প্রথমদিন অর্থাৎ মহালয়া থেকেই দেখা যায় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর ঢল। 

এ ঐতিহ্য প্রায় তিনশত বছরের। উপমহাদেশের আর কোথাও লাল বর্ণের দুর্গাপূজা হয় না - জানালেন পাঁচগাঁও দুর্গাপূজার পরিচালক সঞ্জয় দাস। ডেইলি বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এটি তাদের পারিবারিক পূজা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া প্রায় তিনশত বছর ধরে এখানে এ পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করেন পূজার সময়। প্রতিবছর এখানে লোকসমাগম বেড়েই চলেছে। তাদের সামাল দিতে মাঝেমধ্যে হিমশিম খেতে হয়। এরপরও এখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

দেবী দর্শনের জন্য উপমহাদেশের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন হিন্দু ধর্মালম্বী ভক্তরা। অষ্টমী ও নবমী পূজার দিনে সেখানে এতো ভীড় থাকে যে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ভক্তরারা পায়ে হেঁটে পূজা মন্ডপ দর্শনে যান। পূজার সময় মহিষ বলীর পাশাপাশি কয়েক শত পাঁঠা বলী দেয়া হয়। প্রতি বছর ষষ্ঠী থেকে দশমীর বিসর্জনের দিন পর্যন্ত পাঁচ দিনে দেবী দর্শনে লাখো ভক্তের পদচারণায় নীভৃত এই গ্রামটি হয়ে ওঠে কোলাহল মুখর পরিবেশ।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভক্তদের আনাগোণায় মুখরিত থাকে মন্দির প্রাঙ্গণহাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুণ্যর্থীরা তাদের নানা মানত নিয়ে ছুটে আসেন। কেউ হোমযজ্ঞ দেন, কেউ প্রদীপ ও আগরবাতি জ্বালান। কেউবা পশু বলী দেন। পূজা মন্ডপকে ঘিরে আশেপাশের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এখন মেলা বসে। কয়েকশত দোকানে বেচাকেনা হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেলা বসে প্রতিবছর এখানে। নানা জাতের পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা। এর মধ্যে আছে খই, মোয়া-মুড়ি, বাতাসা, জিলাপি, গোল্লা, বাঁশি, বেলুন, ঝুমঝুমি প্রভৃতি। যেন অন্যরকম প্রাণ পায় পূজাস্থল। 

প্রতিবছরই মৃৎশিল্পীরা সুন্দর সাজে সাজিয়ে তৈরি করেন এশিয়ার একমাত্র এই লাল প্রতিমা। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তারা আঁকেন দেবীর টানা টানা দুটি চোখ। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও বংশপরম্পরায় অপরূপ সাজে নির্মাণ করেন দেশের একমাত্র দূর্গাদেবীর লাল প্রতিমা। মহালয়ার দিন গিয়ে দেখা যায়, কয়েক হাজার মানুষের পদচারণা। কেউ হোম যজ্ঞ দিচ্ছেন, কেউ প্রদীপ ও আগরবাতি জ্বালাচ্ছেন। কেউবা দেবেন পশু বলি। ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদে স্বর্ণ ও শাড়ি কাপড়ও উপহার হিসেবে নিয়ে আসছেন। শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে সবকিছু। স্থানীয় প্রশাসনও সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাবু মুন্না রায় জানান, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় পূজা হয় পাঁচগাঁও গ্রামে। কারণ সেখানে স্বয়ং দুর্গার আবির্ভাব হয়। এজন্য ভক্তদের উপস্থিতিও থাকে বেশি। তাছাড়া এখানে ভক্তরা যা মানত করেন ভগবানের কৃপায় তাদের সে মনস্কামনা পূরণ হয়। এবার পুরো জেলায় সর্বজনীন ৮৬০টি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৩৮টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনসহ সরকার সার্বিকভাবে আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/রনি/নিশি/সুইটি