চরাঞ্চলের ফসল খেসারি কলাই

চরাঞ্চলের ফসল খেসারি কলাই

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: ডেইলি ‍বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি ‍বাংলাদেশ

এবার যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদীর জেগে ওঠা চর জুড়ে শুধু খেসারি কলাইয়ের চাষ হয়েছে। চারপাশে ফুটে আছে নীল রঙের খেসারি কলাই ফুল। ক্ষেতের পাশের সড়ক দিয়ে হেঁটে চলা পথিকের মনেও আনন্দ দিচ্ছে ফুলের মৌ মৌ গন্ধ। ফুল থেকে মধু সংগ্রহে মৌমাছির দল গুন গুন শব্দে চারদিক মুখরিত করে তুলছে। কৃষক মুখরিত মৌমাছির গুন গুন সুরে গান শুনে।

অনেকেই খেসারি কলাইয়ের শাক সংগ্রহ করেছেন খাওয়ার জন্য। মাঝে এ খেসারি ক্ষেত গরুকে খাওয়ানো হত। কালের আবর্তে আজ তা ভিন্নরূপ নিয়েছে। বাজারে এর চাহিদা থাকায় দিন দিন কৃষকরা খেসারি কলাই চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুর সদর উপজেলাসহ সরিষাবাড়ি, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় খেসারির চাষ করা হয়েছে। চরাঞ্চলের আবাদি ও অনাবাদি জমিতে কৃষকরা বাড়তি লাভের আশায় খেসারি ডালের চাষ করেছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফসলের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা হচ্ছে। চরাঞ্চলের নদী বিধৌত পলিমাটির জমি উর্বর থাকার কারণে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে খেসারির ফলন ভালো হয়। ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে খেসারি চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলায় গত বছর ৩৫৬ হেক্টর জমিতে খেসারি চাষ করা হলেও চলতি বছরে ৫৬০ হেক্টর জমিতে খেসারি চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে জামালপুর সদরে ২০, সরিষাবাড়িতে ৩০, মেলান্দহে ৫, ইসলামপুরে ৩২০, মাদারগঞ্জে ১৫০, দেওয়ানগঞ্জে ৩৪ ও বকশীগঞ্জে ১ হেক্টর জমিতে খেসারি চাষ করা হয়েছে।

কৃষকরা জানায়, খেসারি আবাদ করার পর একটু পরিচর্যা করলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। সাধারণত কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে কৃষক জমিতে খেসারি কলাইয়ের বীজ রোপণ করেন। এটি মূলত শীতকালীন ফসল। খেসারি রোপা আমন ধান ক্ষেতে ছিটিয়ে রোপণ, পতিত খেতে কোনো রকম চাষ দিয়ে এবং কোথাও কোথাও পলি মাটিতে সারিবদ্ধভাবে মাটিতে পুঁতে রোপণ করা যায়।

সরিষাবাড়ি উপজেলার আওনা, কুলপাল, স্থল, উল্লাহ, কুমারপাড়া, ঘুইঞ্চা, পোগলদিয়া ইউপির চরকালিকাপুর, চরপোগলদিঘা, বিন্নাফৈর, দামোদরপুর, কালিপুর, শ্যামপুর, পিংনা ইউপির নলসান্ধা, ডাকাতিমেন্দা, কবলীবাড়ি, রসপাল, সাতপোয়ার চর ছাতারিয়া, আদ্রা, চর নান্দিনা এলাকার বিভিন্ন চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে খেসারি কলাই চাষ করা হয়েছে। এছাড়াও জেলার মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জে শীতকালীন রবি শস্য খেসারি কলাইয়ের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পথচারী আব্দুল কালাম আজাদ জানান, এ পথ দিয়ে যতক্ষণ হেঁটে যাই, খুবই ভালো লাগে। ফুলে ফুলে ভরে যাচ্ছে কৃষকের খেসারি ক্ষেত। ফুলের মুধ নিতে মৌমাছি ছুটছে চারদিকে গুন গুন সুরে গান গেয়ে। শুধু আমি না অনেকেই বিকেলে এ পরিবেশে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিতে হেঁটে বেড়ায়।

কুলপাল চরের কৃষক আল আমিন জানান, খেসারি চাষে শ্রম খুবই কম। ক্ষেতে রোপা আমনের মাঝে খেসারি ও মাসকলাই এক সঙ্গে ছিটিয়ে রোপণ করা যায়। আমন ধান কাটার পর আস্তে আস্তে খেসারি ও মাসকলাই বেড়ে উঠে। মাসকলাই তুলে নেয়ার পর পুরো শীতের মাঝে ক্ষেতে শুধু খেসারিই থাকে। তখন একটি গাছ চারদিকে ছড়িয়ে ফল
আসার আগেই শীতের উষ্ণুতায় পুরো খেত ঢেকে যায়।

কৃষক বারিক জানান, খেসারি চাষ পুরোটাই লাভ। এক সঙ্গে আমরা তিনটি ফসল পাই। রোপা ধানের খেতে খেসারি ও মাসকলাই বুনে দেই। ধান কাটার পর খেসারি ও মাসকলাই বড় হতে থাকে। আর খেসারির গাছে ফুল আসার আগেই মাসকলাই তুলতে হয়। পরে শুধুই খেতে খেসারি কলাই থাকে। আর এ সময় থেকেই আস্তে আস্তে ফুলে ফুলে ভরা যায় পুরো ক্ষেত।

কৃষক সেজাব আলী জানান, খেসারি মূলত যে সময়ে ক্ষেতে থাকে তখন কোনো ফসলই থাকে না। ওই সময় জমি পতিত থাকার চেয়ে খেসারির আবাদ করা উত্তম। এছাড়া এখন বাজারে খেসারির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা আগের তুলনায় অনেক হারে আবাদ বৃদ্ধি করেছে।

শীতকালীন রবিশস্য খেসারি ডালের ভালো ফলন হওয়ায় এলাকার অনেক চাষির ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন বলে চাষি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আরো জানান, উপযুক্ত আবহাওয়া, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ না থাকায় এ বছর খেসারির ফলন ভালো দেখা যাচ্ছে।

ইসলামপুরের কৃষক হাফেজ, বেলায়েত হোসেন, ঈমান আলী ও কুদরত উল্যাহ জানান, আমন মৌসুমে আমন ধান কাটার পর জমিতে শুধু খেসারি কলাই ছিঁটিয়ে এ ফসলের আবাদ করা যায়। এর জন্য বাড়তি কোনো সার কিংবা কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। এ ফসল আবাদে উৎপাদন খরচ একেবারেই কম। এতে কৃষক বেশি লাভবান হন।

দেওয়ানগঞ্জের কৃষক আমিনুল, কামরুল, ফকির ও আবুল জানান, খেসারি ডালের স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে প্রতিবছর উপজেলার বাইরে এ খেসারি ডাল বিক্রি করে তারা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।

সরিষাবাড়ি উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, খেসারি ডাল আবাদের মৌসুমে কৃষকদেরকে পূর্বেই এ ফসলের
আবাদ, ভালো বীজ বপণ ইত্যাদি বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেয়া হয়। তাছাড়া সময় সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনিটরিং করায় এ ফসল আবাদে প্রান্তিক চাষিরা বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
 
তিনি আরো জানান, মাঝখানে খেসারির আবাদ কমে গিয়েছিল। বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি জমিতে খেসারির চাষ হচ্ছে।
আরো বেশি হারে খেসারি ডাল আবাদ করার জন্য কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন জাতের বীজ সরবরাহ এবং রোগ বালাই থেকে ফসল রক্ষার জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, চলতি বছর উপজেলার কৃষকরা লোকসান কমাতে ও অধিক লাভের আশায় খেসারি চাষ বাড়িয়েছে। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই এ ফসল ঘরে তোলা যায়। চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় খেসারি ফলন ভালো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামীতে এর চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর