চন্দন গাছের শহরে বাইসাইকেল আরোহী

চন্দন গাছের শহরে বাইসাইকেল আরোহী

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০৩ ২১ জুন ২০২০   আপডেট: ২১:০৪ ২১ জুন ২০২০

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

‘ভ্রূ-পল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে
সুগন্ধের সঙ্গ পাবো দ্বিপ্রহরের বিজন ছায়ায়’- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমি লাওস ভ্রমণে গিয়েছিলাম দুই যুগেরও অধিকাল পূর্বে। বর্তমান অবধি এই সময়কালে লক্ষাধিক বার নিজ অক্ষের উপরে পৃথিবীর আহ্নিক গতি সম্পাদিত হয়েছে। আট সহস্রাধিকবার পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে এসেছে। যেহেতু দিনপঞ্জি লেখার অভ্যাস আমার কস্মিনকালেও ছিল না এবং বিষয়টা নিয়ে ভবিষ্যতে আমি লিখতে পারি এমন চিন্তাও কখনই ছিল না, সেহেতু বিস্মৃতি আমাকে কিছুটা হলেও লেখার সময়ে বিভ্রান্ত করছে। বিশেষ করে মেকং নদীর যে স্থানটা দিয়ে নৌকায় করে অতিক্রম করেছিলাম তা নিয়ে আমি এখনও যথেষ্টই কনফিউজড। যদিও মেকং এর অপর তীরে নংখাই শহর পর্যন্ত রাতের বেলায় এসেছিলাম বলে মনে পড়ে, তবে শুধু মনে আছে যে, নদীর দুই পাড়ই ছিল যথেষ্ট খাড়া। এবং সম্ভবত সময়টা ছিল শুষ্ক ঋতু। অক্টোবর কিংবা নভেম্বর মাস। একটা বিষয় উল্লেখ করার মত যে, মেকং নদী কম্বোডিয়া এবং লাওসে একরকম ছিল না। কম্বোডিয়ার স্টুং ট্রেং এলাকাতে নদীটি ছিল আমাদের যমুনার মত প্রশস্ত, কিন্তু এখানে খরস্রোতা, কিন্তু সংকীর্ণ। লাওসের পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবার কারণে। নদীর এক তীর থেকে অন্য তীর স্পষ্ট দৃশ্যমান। নদীর ভেতরে ভাসছিল অনেকগুলো রঙবেরঙের ইঞ্জিন চালিত নৌকা, যার একটাতে করে আমি ভিয়েনতিয়েনের তীরে এসেছিলাম। তবে নদীর জল সেই সময়ে ঘোলাটে, নাকি স্বচ্ছ ছিল তা আমার মনে নেই।

একটূ প্রসঙ্গান্তরে যাই। এই ধরণের খাড়া পাড়ের একটি নদীতে আমি শৈশবে হেমন্ত বা শীতকালে নদীর পাড় থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নীচে নামতাম এবং জল অতিক্রম করার পর অপর তীরের তলদেশ থেকে থেকে ৬০ ডিগ্রি কোণে ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা করতাম। ধনুক থেকে তীর ছোড়ার মত তীব্র গতিতে। মুহূর্তের ভেতরে বিনা ক্লেশে নদীর তলদেশ থেকে পাড়ে ওঠে পড়তাম। কারণ শিশুরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব মুক্ত। আমার শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। নদীর অপর পাড়ের ঠিক উপরে ছিল আমার ফুপুর বাড়ি। বিমল আনন্দের এক স্থান। স্বর্গের মত। এখন নেই। নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। জায়গাটা এখন ধূধূ বালুচর!

ছবি: আন্তর্জাল

মেকং খাঁড়া পাড় বেয়ে অপর তীরে লাওসে উঠতেই স্কাইলাইনের উপরে আমার সাথে সাক্ষাৎ ৪/৫ জন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ বাঙালি যুবকের। এরাই বাংলাদেশের প্রথম বা দ্বিতীয় জেনারেশন, যারা শ্রমিকের চাকুরি নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। এদের প্রাথমিক গন্তব্য ছিল মধ্য প্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশমালা। অতঃপর এই গন্তব্য ক্রমশ বিস্তৃত হয় মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দাঁড়িয়ে আছে এদের ওপরে ভর করে। এদের কর্তৃক উপার্জিত বিদেশিক মুদ্রার উপরে। কিন্তু বিদেশে এদের অনেকেই যে কি অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হয় তা আমরা অনেকেই জানি না। অধিকাংশ সময়েই ভিনদেশের প্রায় সকল সামাজিক ও মানবিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত হয় এরা। যুবক ৪ জনের সবাই ব্যাঙ্ককে চাকুরি করে। শ্রমজীবীর ভিসা নিয়ে। ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পূর্বেই বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে পুনরায় ভিসা নিয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসার কথা তাদের। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ফিরে গেলে পুনরায় ফিরে আসা নাও হতে পারে। ফিরতে পারলেও যে খরচ হবে, তা উপার্জন থেকে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা পার্শ্ববর্তী লাওস বা ভিয়েতনামে ঢুকে পড়ে। অতঃপর কিছু টাকা-পয়সা খরচ করে নিজস্ব পদ্ধতিতে সেখান থেকে পুনরায় থাইল্যান্ডের ভিসা সংগ্রহ করে। এতে অন্তত তাদের কোন পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হবে না। থাইল্যান্ডের পুলিশ ভীষণ শক্তিধর। রয়্যাল থাই পুলিশ। সবাই ভয় পায় তাদের।

যুবকেরাই আমাকে বলে দেয় কিভাবে ভিয়েনতিয়েনে যেতে হবে। কোথায় থাকার জায়গা পাওয়া যাবে। আমি নিজেও বিখ্যাত কোন হোটেলে উঠতে আগ্রহী নই। জীবনকে দূর থেকে দেখার মধ্যে কোন আনন্দ নেই। একটা টুকটুক গাড়ি (অনেকটা আমাদের দেশের ট্যাক্সির মত) ভাড়া করে আমি ভিয়েনতিয়েনের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। মাত্র কয়েক ক্রোশ দূরে। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় হতে ভিয়েনতিয়েন ছিল লাওসের রাজধানী। কিন্তু ১৮২৭-২৮ সালে থাইল্যান্ড অর্থাৎ শ্যামদেশ আক্রমণ করে ধূলার সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল এই শহরকে। এরপর লাওস ফ্রান্সের উপনিবেশ হয়ে গেলে এই শহরকে ফরাসি স্টাইলে পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং একে লাওসের প্রশাসনিক রাজধানীর মর্যাদা দেয়া হয়।

লাও ভাষায় ভিয়েনতিয়েনকে উচ্চারণ করা হয় ‘ভিয়েন চান’ (Vieng Chan) হিসেবে। এর অর্থ ‘চন্দন গাছের শহর’ বা City of Sandalwood। প্রাচীনকালে নাকি এই শহরে প্রচুর চন্দন কাঠের গাছ ছিল। আমি অবশ্য আমার স্বল্পকালীন ভ্রমণের সময়ে শহরের ভেতরে কোন চন্দন গাছ দেখিনি। একটু পর পর নান্দনিক সৌন্দর্যের বৌদ্ধ মন্দির বা প্যাগোডা ছাড়া। প্রতিটি মন্দিরেই ধূপ জ্বলে সকাল সন্ধ্যা। গন্ধে মধুময় হয়ে থাকে সারাদিনমান। রাস্তায় সকাল-বিকাল সারিবদ্ধ শিশু মঙ্কদের গমনাগমন আপনার চোখে মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দেবে। একটা শান্ত সমাহিত ভাব বিরাজ করে চারদিকে।

প্রায় দেড় লাখ অধিবাসীর বাস এই শহরে। উঁচু বিল্ডিং নেই বললেই চলে। শহরের ইমারতগুলো লাও, থাই, ফরাসী, রাশিয়া, এমনকি আমেরিকার স্থাপত্য সংস্কৃতি বহন করে। উজ্জ্বলতায় ব্যাংককের তুলনায় অনেক বিবর্ণ হলেও ভীষণ মায়াবী নগর ভিয়েনতিয়েন। আমাদের দেশের মংলা নদীবন্দরের মত। বন্দর শহর। শহরের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে মেকং নদী। উত্তর-পশ্চিম হতে কাস্তের মত বেঁকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়েছে। দূর থেকে দেখতে চাঁদের মত মনে হয়। ভিয়েনতিয়েনের আরেক নাম তাই ‘চাঁদ শহর’। চাঁদ শহর নামটা ভাবতেই আমার চাঁদ সদাগরের কথা মনে পড়ে যায়। বেহুলা-লখিন্দরের কথা। মহাস্থান গড়ের কথা। পাহাড়পুর আর শালবনের বৌদ্ধবিহারের কথা। মানবিক এই সভ্যতা কতভাবেই না এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিস্তার লাভ করেছিলো। লুম্বিনিতে জন্ম নেওয়া গৌতম বুদ্ধের চিরন্তন শান্তির বানী সহকারে।

নিরুত্তাপ, শান্ত শহর। ভিয়েনতিয়েন। নগরে প্রবেশের পর প্রথমেই আপনার দৃষ্টিতে আসবে বিশাল নান্দনিক প্রবেশ তোরণ। এটার নাম পাটুক্সাই বিজয় স্তম্ভ (The Patuxai, The Arch or Gate of Triumph)। ১৯৬০ এর দশকে এই তোরণ গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি শহরের জনপ্রিয় ও বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। লাওসের মানুষ বিদেশি ঔপনিবেশিকদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করে মুক্তি অর্জন করেছিল। সেই সংগ্রামের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ স্থাপত্যটি নির্মাণ করা হয়। উচ্চতা ৪৫ মিটার, বিস্তার ২৪ মিটার। দূর থেকে দেখলে দিল্লির বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়া গেইট’ এর মত মনে হয়। বিশাল প্রশস্ত এক এভিন্যুর শেষ প্রান্তে এর অবস্থান। এভিন্যুটিতে প্রচুর সংখ্যক নারী-পুরুষ চলাফেরা করছে। অধিকাংশই সাইকেল অথবা মোটরসাইকেলে। টুকটুকের চালক আমাকে জানাল যে, আমেরিকার টাকা দিয়ে এখানে একটা বিমানবন্দর করার কথা ছিল। কিন্তু লাওস সরকার বিমানবন্দরের পরিবর্তে এই তোরণটি তৈরি করে।

ভিয়েনতিয়েন শহরের কেন্দ্রস্থল হতে তিন মাইল উত্তর-পূর্বে ফা থাট লুয়াং (Pha That Luang) নামে একটা বিশাল বৌদ্ধস্তূপ রয়েছে। এটি নির্মিত হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে (১৫৬৬ সালে) এবং পুনঃনির্মিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে। এটি লাওসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ। পুরাণ অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব ৩ শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের ধর্মপ্রচারকারীরা এখানে বুদ্ধের একটি পাঁজরের হাড়কে রাখার জন্যে একটা মন্দির তৈরি করেছিল। মধ্য ষোড়শ শতাব্দীতে রাজা সেথারিরাট (King Setthathirat) লুয়াং প্রেবাং থেকে রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে স্থানান্তর করার পর মন্দিরটির স্থানে এই বৌদ্ধস্তূপ নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করেন। নির্মিত বৌদ্ধস্তুপটি স্বর্ণপত্র দিয়ে আবৃত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮২৮ সালের থাই আক্রমণে এটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানের স্তূপটি ১৮৬০ সালে প্রাপ্ত স্থাপত্য নকসার উপরে ভিত্তি করে ফরাসী স্থাপত্যবিদরা তৈরি করেছেন। স্তূপটি পরপর স্থাপিত তিনটি সমতলের উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম সমতলের দৈর্ঘ ৬৯ মিটার ও প্রস্থ ৬৮ মিটার। দ্বিতীয় সমতলের প্রতি দিককার দৈর্ঘ ৪৮ মিটার এবং তৃতীয় সমতলের প্রতি দিককার দৈর্ঘ ৩০ মিটার। ভূমি থেকে শীর্ষ পর্যন্ত এর উচ্চতা প্রায় ৮৫ মিটার। অনেকগুলো ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে স্তূপটির চতুর্দিকে।

ছবি: আন্তর্জাল

শহরের অধিবাসীরা প্রায় সবাই সাইকেলে অথবা মোটরসাইকেলে চলাফেরা করে। হোটেলের এক এটেন্ডেন্টের কথা অনুযায়ী আমি ভিয়েনতিয়েন শহরের একটা ম্যাপ সংগ্রহ করলাম। অতঃপর একটা সাইকেলের দোকান থেকে দুই ডলার দিয়ে সারাদিনের জন্য সাইকেল ভাড়া করলাম। আমি অবাক হয়ে গেলাম এ কারণে যে, মাত্র দুই ডলারের বিনিময়ে আমাকে ওরা সাইকেলটা দিয়ে দিল। একবারও সন্দেহ প্রকাশ করলো না আমি সাইকেলটা নিয়ে আদৌ ফিরে আসব কিনা!

কম্বোডিয়াতেও আমি একই বিষয় লক্ষ্য করেছি। মানুষের ওপরে প্রবল বিশ্বাস। থালাবারিভাতে আমার এই কর্মস্থলে মেকং নদীর পাড় ঘেঁষে একটা মাটির রাস্তা নদীর সমান্তরালে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল। এই রাস্তার উপরে কিছুদূর পর পর কাঠের তৈরি টঙের ওপরে ছোট্ট দোকান। ছনের চাল দেয়া। প্রতিটা দোকানেই একটা করে হাড়ি অথবা কাঁচের জার রাখা ছিল। হাড়ি বা জারের ভেতরে ‘রাইস ওয়াইন’ কম্বোডিয়ার দেশি মদ। হয়ত বা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ‘দোচোয়ানী’র মদের মত। পাশেই রাখা চায়ের কাপের আয়তনের খালি গ্লাস। মজার ব্যাপার হল দোকানের ভেতরে কোন বিক্রেতা অবস্থান করত না। এই বিক্রেতাদের অধিকাংশই ছিল নারী। তারা বেশীরভাগ সময়েই অবস্থান করত তাদের বাড়ির কুটিরে। আর সারা দিনমান ধরে পথচারীরা রাস্তা দিয়ে যাবার সময়ে নিজেরাই গ্লাস ভর্তি করে এই সুধা পান করত এবং একটা কাঠের বা টিনের খোলা বাক্সের ভেতরে মূল্য পরিশোধ করে চলে যেত। গোধূলির পূর্বেই পুরো দেশ মাতাল হয়ে গেলেও মদের টাকা না দেওয়ার অভিযোগ কখনই উঠত না।

পরবর্তী দুইদিনে আমি ভিয়েনতিয়েনের সাইকেল আরোহীদের ভিড়ে মিশে গেলাম। পর্যটকের কোন দৃষ্টিই আমার ভেতরে নেই। নিতান্তই গ্রাম্য যুবকের দৃষ্টি দিয়ে আমি পৃথিবীকে দেখি। বিখ্যাত স্থান দর্শনের কোন মোহই আমার ভেতরে জন্মায়নি। ফলে সারাদিন সাইকেলে করে পই পই করে ঘুরে বেড়াই। ভবঘুরের মত যে কোন জায়গায় থামি। পথের পাশের লোকজনের সাথে গল্প করি। সবাই বন্ধু প্রবণ। হাসিখুশি। শহর জুড়ে অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির। মঙ্ক দিয়ে গিজগিজ করছে। রমরমে অতিথিশালা। নাম ‘বানপাক’। অতিথিশালায় ঢুকে দেখি কৃত্তিম উজ্জ্বল আলোর ভেতরে যুবক–যুবতীরা নাচছে। কাছেই আমার পূর্ব পরিচিত মেকং। তীরের পাথরগুলোর উপরে ছলাৎ ছলাৎ করে ঢেউ ভেঙে পড়ছে। চাঁদের আলোর ভেতরে ভিয়েনতিয়েনকে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়। রাত গভীর হবার পূর্বেই আমি সাইকেলের দোকানে সাইকেল জমা দিয়ে দেই।

রাতে দোকানে বাইসাইকেল জমা দিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকেছি। ডিনার করতে। রেস্টুরেন্টের একধারে বিশাল একটা ডান্স ফ্লোর। মাথার ওপরের গ্লোবের মত ত্রিমাত্রিক ঘূর্ণায়মান বল। সেখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ক্যালিডোস্কোপ থেকে সৃষ্ট বর্ণিল সপ্ত রঙা আলোর মত। অপার্থিব পরিবেশ। লাওসের ভাষায় গান হচ্ছে। সুরটা আমার পরিচিত। ধীরলয়ে। কম্বোডিয়ায় আমাদের দলের দোভাষী নারার কণ্ঠে আমি এ ঘরানার গান অনেক শুনেছি। মন খারাপ থাকলেই সে গান করে, গিটার বাজায়। নারা চমৎকার গিটার বাজাতে পারে। কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ে সে থাইল্যান্ডের এক শরণার্থী শিবিরে থাকত। জীবিকার জন্যে থাইল্যান্ডের ‘পাব’গুলোতে প্রতিনিয়ত গিটার বাজিয়ে গান গাইতে হতো তাকে।

আমার পাশের টেবিলে দুই তরুণ-তরুণী। গায়ের রঙ হরিদ্রাভ। যে কোন মঙ্গোলিয়ানের গায়ের রঙ যা হয়। আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তবা আমার শরীরের নিবিড় গাঢ় রঙ তাদেরকে আকৃষ্ট করে থাকতে পারে। যেমনটা আমরা হয়ে থাকি সাদা চামড়ার মানুষদের দেখলে। ডিনার শেষ করতেই তরুণ-তরুণী দুজনেই আমার পাশে এসে বসলো। ছেলেটাই প্রথম হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। ‘হ্যালো’ বলে। জিজ্ঞেস করল, ‘কোন দেশ থেকে এসেছ তুমি?’ আমি বাংলাদেশের নাম বলতেই ভীষণ অবাক। চিনতেই পারল না। আমি পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ার নাম বলতেই দুজনের চোখেই উজ্জ্বল আলোর দ্যুতি খেলে গেল। সঙ্গের মেয়েটা আমাকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো আমি শ্রীদেবী অথবা হেমা মালিনীকে চিনি কিনা।

বোম্বের এই দুই নায়িকা কম্বোডিয়াতেও ভীষণ জনপ্রিয়। আমার কর্মস্থল থালাবারিভাতে ছোট্ট একটা টিনের ছাদ ও কাঠের দেয়ালের তৈরি সিনেমা হল আছে। সন্ধ্যার পর দুই তিনটা শো হয়। একবার ‘শোলে’ ছবির বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের দলের দোভাষী নারাকে নিয়ে আমি ঢুকেছিলাম। কিছুক্ষণের জন্যে। কম্বোডিয়ার ‘খেমার’ ভাষায় ডাবিং করা চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে শুনতে ১০ মিনিটেই কান ঝালাপালা হবার জোগাড়। এই সিনেমা হলটা এমন একটা জায়গা যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকল কম্বোডিয়ানরাই মিলিত হয়। হিন্দি, থাই অথবা হংকং এর মারপিটের ছবি দ্যাখে! আনন্দে উদ্বেলিত হয়। এই সময়ে আপনার কখনোই মনেই হবে না যে, এই দেশ দীর্ঘদিন যাবত গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়ে আছে! এবং পলপট নামের একজন নৃশংস হত্যাকারী গণহত্যার মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে!

ছেলেটা মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দিল, ‘আমার বান্ধবী। নাম ...। তুমি কি একা এসেছ?’

আমি মাথা নাড়তেই দুজনেই একসাথে হেসে দিল। পাশ থেকে এক বর্ষীয়সী একজন লাওসের নাগরিক আমাদের কথা শুনছিলেন।

তিনি বললেন, ‘ইউ শ্যুড নট ট্রাভেল এলোন! ইফ এনিথিং হ্যাপেনস টু ইউ, ইওর প্যারেন্টস উইল নেভার নো এবাউট ইট।”অপরিচিত মানুষের প্রতি তার মায়া দেখে আমি বিমুগ্ধ।

এই যুগলই আমাকে জানালো যে, ভিয়েনতিয়েনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর শহর লুয়াং প্রেবাং। লাওসের পুরনো রাজধানী। হাজার বছরের পুরনো শহর। অসংখ্য মন্দির ও বেশি পুরনো স্থাপত্য রয়েছে। প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়নাভিরাম। পর্যটকরা এই শহরকে ‘দুনিয়ার স্বর্গ’ বলে ডাকে! আমি শখের পর্যটক! তাৎক্ষণিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম লুয়াং প্রেবাং-এ যাবো!

ছবি: আন্তর্জাল

লুয়াং প্রেবাং যেতে বিশেষ পাস বা অনুমতির প্রয়োজন হয়। একই দেশের মধ্যে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে ছাড়পত্র বা অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে পারে এটা আমার ধারণায় ছিল না। পরদিন সকাল বেলায় আমি সোজা চলে গেলাম ওদের ফরেন মিনিস্ট্রিতে। এক যুবক আনন্দিতভাবে আমাকে অভ্যর্থনা করল। আমি কম্বোডিয়ায় শান্তিরক্ষার কাজে নিয়োজিত আছি শুনে খুব খুশি। যুবককে ‘লুয়াং প্রেবাং’ যাবার কথা বলতেই সে আমাকে বলল, ‘তোমার পাসপোর্টটা রেখে যাও। আমি অনুমতি নিয়ে রাখবো। আগামীকাল সকাল ৯ টায় এসে নিয়ে যেয়ো।’

আমি যুগপৎ ভাবে বিস্মিত এবং শঙ্কিত! বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে অপরিচিত কাউকে পাসপোর্ট দেবার পর আর যদি ফেরত না পাই? তবে আমার কি হবে? তবুও সাহস করে তার কাছে পাসপোর্ট রেখে হোটেলে প্রত্যাবর্তন পূর্বক বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে শুরু করলাম। দুই ডলারের বিনিময়ে সারাদিনের জন্যে বাইসাইকেল ভাড়া দেবার বিষয়টি আমাকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করলো। পরের দিন নয়টার অনেক আগেই ফরেন মিনিস্ট্রিতে পৌঁছে গেলাম। তার কক্ষে ঢুকতেই সে হাসিমুখে আমাকে পাসপোর্ট হাতে দিলো। গমনের অনুমতিসহ।

‘Where I went in my travels, it's impossible for me to recall. I remember the sights and sounds and smells clearly enough, but the names of the towns are gone, as well as any sense of the order in which I traveled from place to place.’- Haruki Murakami, Norwegian Wood

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই