ঘুষ নেয়ার আগে হাতে স্যানিটাইজার ঘষলেন ওসি!

ঘুষ নেয়ার আগে হাতে স্যানিটাইজার ঘষলেন ওসি!

লালমনিরহাট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৩:৪৫ ১২ আগস্ট ২০২০  

হাতে স্যানিটাইজার ঘষছেন লালমনিরহাট সদর থানার ওসি মাহফুজ আলম

হাতে স্যানিটাইজার ঘষছেন লালমনিরহাট সদর থানার ওসি মাহফুজ আলম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে লালমনিরহাট সদর থানার ওসি মাহফুজ আলম ঘুষের টাকা নেয়ার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে নিয়েছেন। সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে তাকে ও ঘুষদাতাকে বলতে শোনা গেছে- ‘টাকায় ভাইরাস বেশি ছড়ায়’।

ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি পরিবারিক মামলার বাদীকে হেনস্থা করার কৌশল জানতে আসামিপক্ষের কয়েকজন লোক ওসি মাহফুজ আলমের কাছে এসেছেন। কৌশল হিসেবে ওসির পরামর্শ মোতাবেক তারা বাদীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ও ১০ হাজার টাকা নিয়ে এসেছেন। অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে এই ১০ হাজার টাকা ওসিকে দিতে হবে। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তাকেও তিন হাজার টাকা দিতে বলেন ওসি।

আরো দেখা গেছে, ওসি মাহফুজ আলম আসামির অবস্থান জানার পরও তাকে জামিন নিয়ে বাদীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এরপর ঘুষের টাকা নেয়ার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে নেন তিনি। একইসঙ্গে ঘুষদাতাকেও স্যানিটাইজার এগিয়ে দেন তিনি।

ভিডিওতে ওসি মাহফুজ বলেন, তোমাদের বাদীর (কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে বাদী দেখিয়ে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়) তো জামিন হয় নাই। জামিন না হতেই থানায় হাজির হয়ে এজাহার দেয়া হলে তো বেআইনি হবে। জামিনের কাগজসহ এসো, অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে। মামলা না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঝামেলা করা যাবে না। ঝামেলা হলে তোমরা প্যাঁচে পড়ে যাবে।

ঘুষ দাতা: আমরা ঝামেলা করি নাই, করব না। প্রয়োজনে ওদিকে (তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদীর এলাকায়) কেউ যাব না।

ওসি মাহফুজ: মামলা এখানে একটা করে দেব, কোর্টেও একটা মামলা করবা এবং চেক ডিজঅনার করবে। এভাবে ঘুরবে (আঙ্গুল ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেন), চড়কির মতো ঘুরবে। যারা বুদ্ধিদাতা তারা হেরে যাবে। তোমাকে ঠাণ্ডা মাথায় করতে হবে। গরম করা যাবে না।

ঘুষ দাতা: আস্তে আস্তে করতে হবে। একটা একটা করে। স্যার টাকা আজকে দিব না কি মামলার দিন?

ওসি বললেন, সেটা তোমাদের ব্যাপার।

ঘুষ দাতা: স্যার, আপনাকে কমিটমেন্ট করতে হবে। যেদিন মামলা হবে, সেই দিনই আসামি ধরতে হবে।

ওসি: আসামিরা পুরুষ তো?

এরপর টাকা লেনদেনের সময় ঘুষ দাতা বলেন, স্যার, স্যানিটাইজারটা একটু দেন। ওই সময় ওসি মাহফুজ কাজ ফেলে স্যানিটাইজার দিয়ে নিজেও হাত ঘষে করে নেন এবং ঘুষ দাতার হাতেও স্যানিটাইজার দেন।

ঘুষ দাতা: স্যার, টাকা থেকেও করোনা ছড়ায়। তদন্ত কর্মকর্তাকে আগে এক হাজার টাকা দিয়েছি স্যার।

এরপর ঘুষ দাতা পকেট থেকে টাকা বের করে টেবিলে রাখলে ওসি মাহফুজ আলম তা নিয়ে প্যান্টের পকেটে রেখে বলেন, টাকা দিয়ে বেশি ছড়াচ্ছে। এখানে কত টাকা দিয়েছ?

ঘুষ দাতা: ১০ হাজার আছে স্যার।
 
ওসি: ওহ ঠিক আছে। ওকে (মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে) আরো দুই হাজার টাকা দিও। ও মন খারাপ করেছে। ওকে খুশি রাখতে হবে।

ঘুষ নেয়ার ভিডিও প্রসঙ্গে ওসি মাহফুজ আলম বলেন, কবে, কীভাবে, কার কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছি সেটি আমার জানা নেই। আমাকে ছোট করতে কোনো এক পক্ষ ভিডিওটি এডিট করতে পারে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সদর থানায় মামলা করতে এবং আসামি ধরাতে এভাবে টাকা গুণতে হয়। অনেক সময় টাকার অংক বেশি হলে আসামি চোখের সামনে থাকলেও তাকে গ্রেফতার করা হয় না। কিংবা আসামিদের টাকার জোরে বাদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা নিয়ে হয়রানি করা হয়। ফলে ঠুনকো বিষয় নিয়েও একাধিক মামলা বা হয়রানির শিকার হতে হয় মানুষকে। টাকার জোরে বেঁচে যায় অপরাধীরা আর বঞ্চিত হয় ভুক্তভোগী। অনেক সময় আসামির টাকার জোরে বাদীকে চাপ দিয়ে থানা চত্বরেই বসানো হয় সালিশ বৈঠক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই থানায় চাকরির সুবাদে ওসি মাহফুজ আলমের বিশাল সিন্ডিকেট ও দালাল চক্র গড়ে উঠেছে।
 
লালমনিরহাটের এসপি আবিদা সুলতানা বলেন, এ ধরনের একটি খবর জানতে পেরেছি। তবে ভিডিওটি আমাদের হাতে এখনো আসেনি। ভিডিও হাতে পাওয়ার পর তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো পুলিশ সদস্য দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে ছাড় দেয়া হবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর