ঘুরতে গিয়ে ভারতের বিশ্বকাপ জয়

তৃতীয় বিশ্বকাপ -১৯৮৩

ঘুরতে গিয়ে ভারতের বিশ্বকাপ জয়

রুশাদ রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৫৭ ২১ মে ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৩ বিশ্বকাপের ম্যান অফ দ্য ফাইনাল হয়েছিলেন মহিন্দার আমারনাথ। ’৭৫ ও ’৭৯ বিশ্বকাপে মাত্র একটি ম্যাচ জিতেছিল ভারত। আমারনাথের মতে, ভারতীয়দের কাছে তৃতীয় বিশ্বকাপটি ছিল নিতান্তই ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার মত। তখনকার ভারত দলের সবাই ছিল বয়সে তরুণ এবং কেউই বিয়ে করেননি। ইংল্যান্ডে যাওয়ার কথা মাথায় আসতে তারা ভাবে ‘ ইংল্যান্ড যাচ্ছি, বড় চুল রেখে যাচ্ছি।’

ভারতের সেই বিশ্বকাপ জয়ের পেছনের গল্পে অবদান রয়েছেন অনেকের। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল অধিনায়ক কপিল দেবের। বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলতে নামবে তার আগে কপিল দেব খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে একবার হারাতে পারি, তাহলে কেন আমরা তাদেরকে দ্বিতীয়বার হারাতে পারবো না’ কপিলের এই কথা শুনে তখন ড্রেসিং রুমে থাকা প্রায় সব খেলোয়াড়ই ভড়কে গেল। 

বিশ্বকাপ দলের একজন শ্রীকান্তের ভাষ্যমতে, ‘সে কী পাগল হয়ে গেছে? সে বলতে চাচ্ছে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে সে হারাবে? তাদের দলে যে চারজন পেস বোলার আছে তাদেরকে আজীবন আমরা ভয়ার্ত চোখেই দেখব। কিন্তু কপিল বলছে তাদের হারাবে!  

কপিল খুব সিরিয়াস ছিলেন। অবশেষে, তার সঙ্গে সম্মতি জ্ঞাপন রেখে আমরাও তাদেরকে হারানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করি।’

অনেকের মতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ এটি। এর অনেকগুলো কারণ ছিল। আন্ডারডগ ভারতের সবাইকে চমকে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় চমক। 

ফাইনালে ১৮৩ রান করেও টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই ছিল তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় অঘটন। অঘটনের বিশ্বকাপে বাদ যায়নি অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ড। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। তাছাড়া টানা দুইবার সেমিফাইনাল খেলা নিউজিল্যান্ডও ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপে পেরুতে পারে নি গ্রুপ পর্বের গণ্ডি। 

টানা তৃতীয়বারের মত ইংল্যান্ডে হওয়া এই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। আগের দুই বিশ্বকাপে যেখানে দলগুলো গ্রুপে মাত্র ৩টি ম্যাচ খেলত, সেখানে এই বিশ্বকাপে প্রতিটা দল ৬টি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। ৮টি দল ২ গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লড়াই করে। শ্রীলংকা এবং জিম্বাবুয়ে বাছাইপর্ব খেলে বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেয়। প্রত্যেক দলকে ৬০ ওভার করে বল করতে হবে এবং সবাই সাদা পোশাকেই খেলবে। বলের রঙ হবে লাল। মোটকথা আগের দুই বিশ্বকাপের মতই সবকিছু শুধু ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এই যা। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মোট ১৫টি স্টেডিয়ামে হয় বিশ্বকাপের ম্যাচ।  

বিশ্বকাপের শুরুর দিন থেকেই চমকের জন্ম দিতে থাকে এই টুর্নামেন্ট। প্রথম ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৪ রানে হারায় ভারত এবং অস্ট্রেলিয়াকে ১৩ রানে হারিয়ে অঘটনের জন্ম দেয় জিম্বাবুয়ে। কোন ভারতীয় সমর্থকই কল্পনা করতে পারেনি ভারত সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হবে।

বিশ্বকাপের আগে খেলা ৪০টি ম্যাচের ভেতর মাত্র ১২টি ম্যাচে জয় পেয়েছিল ভারত। জয়ের গড়ের দিক দিয়ে তারা কেবল শ্রীলংকার উপরে ছিল। 

আগের দুই বিশ্বকাপে ভারত মাত্র একটি ম্যাচে জয় পেয়েছিল। তাও বিশ্বকাপের সবচেয়ে দুর্বল দল পূর্ব আফ্রিকার বিপক্ষে। এমন পারফরম্যান্স নিয়ে ভারত ’৮৩ বিশ্বকাপে পদার্পন করে। এমন না যে ভারত ভালো খেলতে পারতো না, তবে ধারাবাহিকতা ছিল না তাদের। বিশ্বকাপের আগে মার্চ মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তারা অনায়াসেই হারায়। যার প্রতিফলন ঘটে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও। সেখানেও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে নিজের সামর্থ্য জানান দিতে থাকে কপিল দেবের দল।  

গ্রুপ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পেলেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়টা অতো সহজে আসেনি তাদের। তাদের বিপক্ষে মাত্র ১৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে ভারত। কিন্তু কপিল দেবের অবিস্মরণীয় ইনিংস যা কেবলমাত্র শতাব্দীতে একবারই দেখা যায়, এমন ইনিংসে ভর করে ২৬৬ রানের পুঁজি পায় তারা। কপিল দেব অপরাজিত থাকেন ১৭৫ রানে। 

ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয় ভারত। কিন্তু জোয়েল গার্নার, ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং, স্যার এন্ডি রবার্টসের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ১৮৩ রানেই অলআউট ভারত। কিন্তু তারপরেও থমে থাকেনি ভারতীয়রা। মাত্র ১৮৪ রানের লক্ষ্য তখনকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কাছে ছিল মামুলি ব্যাপার। টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের সামনে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ১৪০ রানেই অলআউট হয়ে যায়। 

ফাইনালে ভারতের বোলিংয়ের ইনিংসের একটি মজার ঘটনাও রয়েছে। এক পর্যায়ে ক্রিজে ছিল স্যার ভিভ রিচার্ডস। তখন অধিনায়ক কপিল দেবের কাছে বারবার বোলিং করার জন্য বল চাচ্ছিলেন ভারতের পেসার মদন লাল। মদন লালের এক ওভারে ২-৩টা বাউন্ডারি মেরেছিলেন ভিভ। তখন কপিল বললেন, ‘মদন দা, তোমার একটু ব্রেক নেওয়া দরকার। কিছুক্ষণ পর আবার বোলিংয়ে নিয়ে আসব তোমাকে।’ 

মদন লাল বললেন, ‘কপিল, আমাকে বলটা দাও। আমি ভিভকে একবার আউট করেছি, আমি আবারও তাকে আউট করবো। প্লিস! আরেকটা ওভার দাও।’ মদন লালের নিজের প্রতি এতটাই বিশ্বাস ছিল কপিল তাকে শেষ পর্যন্ত বোলিং দিতে বাধ্য হলেন।  

পরে সেই মদন লালের বলেই ভিভ রিচার্ডস আউট হলেন এবং সে ম্যাচে জয়ের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বকাপের ছোঁয়া পায় ভারত। রচিত হয় ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায়। 

এক নজরে প্রথম বিশ্বকাপ:

সেমিফাইনালঃ ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড

চ্যাম্পিয়নঃ ভারত
রানার্সআপঃ ওয়েস্ট ইন্ডিজ

ফাইনাল ম্যাচের স্কোরকার্ডঃ 

ভারতঃ ১৮৩ অলআউট। ৫৪.৪ ওভার। 
শ্রীকান্ত ৩৮। স্যার এন্ডি রবার্টস ৩/৩২

ওয়েস্ট ইন্ডিজঃ ১৪০ অলআউট। ৫২ ওভার। 
ভিভ রিচার্ড ৩৩। আমারনাথ ৩/১২

ফলাফলঃ ভারত ৪৩ রানে জয়ী। 

টুর্নামেন্টের কিছু উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্সঃ 

# ৩৩৮/৫ শ্রীলংকার বিপক্ষে পাকিস্তানের দলীয় সংগ্রহ। যা বিশ্বকাপের সেরা। 
# ৩৮৪ ইংল্যান্ডের ডেভিড গাওয়ার বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩৮৪ রান করেন। 
# ১৭৫* জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভারতের কপিল দেব এক ইনিংসে ব্যক্তিগত ১৭৫* রানে অপরাজিত থাকেন যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। 
# বিশ্বকাপে সর্বমোট ৮টি সেঞ্চুরি হয়। 
# ইংল্যান্ডের গ্রায়েম ফাওলার সর্বোচ্চ ৪টি হাফসেঞ্চুরি করেন। 
# ভারতের রজার বিনি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ১৮টি উইকেট নেন। 
# ৭/৫১ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইন্সট ডেভিসের বোলিং ফিগার। 
# ১৯৮৩ বিশ্বকাপ সর্বমোট ৮ বার ৫ উইকেট পাওয়ার সাক্ষী হয়। 
# বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট রক্ষক জেফ ডুজন সর্বোচ্চ ১৬ টি ডিসমিসাল করেছেন। 
# বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৭টি ক্যাচ নিয়েছেন ভারতের কপিল দেব। 

ডেইলি বাংলাদেশ/সালি