ঘুমন্ত রূপার মুখে এসিড ঢেলে দেয় তার মা

ঘুমন্ত রূপার মুখে এসিড ঢেলে দেয় তার মা

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:০৬ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৪:৫৮ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মধুর জীবনের মোড় পাল্টে দেয় একটি নৃশংস ঘটনা। চার বছর ধরে সে তার মুখ দেখাতে পারেনি কাউকে। ঘর থেকে বের পর্যন্ত হয়নি। ২০ বছর আগের ঘটনা। মধু কাশ্যাপের মুখে এক দুর্বৃত্তকারী আচমকাই এসিড নিক্ষেপ করে। সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে যায় তার গাল ও কপালের কিছু অংশ। চোখও অন্ধ হয়ে যায়। 

তবে দমে যাননি মধু। এরপর থেকেই তার জীবন সংগ্রাম শুরু হয়। মানুষের মাঝে চলাফেরাও শুরু করেন। তবে সাধারণ মানুষ তাকে কখনোই ভালোভাবে দেখেনি। ‘একবার তো একজন বলেই ফেললেন, একদম ডাইনির মতো দেখাচ্ছে।’ এমন অনেক অপমান সহ্য করেছেন মধু।

সিরোজ ক্যাফেভারতের আগ্রায় বসবাস করে মধু কাশ্যাপ। এখন প্রতিদিন সকালে তার ঘুম ভাঙে ভালো দিন কাটানোর আশায়। কারণ তার জীবন থেকে সমস্ত মেঘ উড়ে গিয়ে খুশির রোদ ঝলকাচ্ছে।  আয়নার সামনে বসে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে, কোকড়া চুলগুলোকে একপাশে রেখে নিজের দিকে তাকিয়ে অদ্ভূত সুন্দরভাবে হাসেন মধু। এভাবেই এখন তার দিনগুলো শুরু হয়।

বর্তমানে সে একটি ক্যাফেতে চাকরি করেন। শুধু তিনিই নন তার মতো অনেক এসিড ভিকটিমরাই ক্যাফেটিতে চাকরি করছেন। জীবনের সব বাধা পেরিয়ে তারা আজ সফল। নিজেদেরকে সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তৈরি করেছেন। উত্তর ভারতের পর্যটন নগরী আগ্রার ‘শেরোস হ্যাঙ্গআউট ক্যাফে’ই এখন তাদের খুশি থাকার মূলমন্ত্র।

মধু কাশ্যাপআগ্রার এই ক্যাফেটি নারীদের অর্থ উপার্জন এবং গ্রহণযোগ্যতার একটি অন্যতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেখানে তারা কখনো নিজেদের মুখ ঢাকে না। এসিড নির্যাতনের শিকার নারীরা ক্যাফেটিতে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনের ভয়ংকর মুহুর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। এছাড়াও তারা ক্যাফেতে আসা অতিথিদের সঙ্গে নিজেদের ভাব আদান প্রদান করার মাধ্যমেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছেন। ক্যাফের ওয়েটার হিসেবে নিজেদেরকেও সেভাবেই সাজিয়েছেন তারা।

সিরোজ ক্যাফের দেয়ালগুলোও যেনো রুপা ও মধুদের অন্ধকার থেকে আলোতে আসার গল্পগুলো বলে দেয়। এখনো সেই দিনটি কষ্ট দেয় মধুকে। ১৯৯৭ সালের একটি দিন। এক ব্যক্তির সঙ্গে পারিবারিকভাবেই বিয়ে ঠিক হয় মধুর। এর ঠিক কয়েকদিনের মাথায়, মধু দেখলেন একজন লোক তার দিয়ে এগিয়ে আসছেন। তার হাতে একটি কোকের ক্যান ছিল। মধু ততক্ষণাৎ তাকে চিনে  ফেললেন। এই ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ের কথা হয়েছিল আগে তবে মধু সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। এই কথা ভাবতেই লোকটি কোকের ক্যান ছুড়ে মারলেন মধুর মুখে।

সিরোজ ক্যাফের বাইরের দৃশ্যমাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই মধুর মুখের চোয়াল, চোখের পাতা, কান এবং নাক এসিডে গলে যায়। যদিও মধু তার মুখে কয়েকটি অস্ত্রোপচার করেছেন। তবে আদৌ চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখন তার সম্পূর্ণ  মনোযোগ নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি। তিনি চাকরিও খুঁজেছেন অনেকে। শেষমেষ একটি সরকারি চাকরির চেষ্টা করে। তবে তার চেহারার কারণে ফ্রন্ট ডেস্কের চাকরিটা তার ভাগ্যে আর জোটেনি।

২০১৬ সালে মধু সিরোজ ক্যাফেতে ওয়েটার হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর থেকেই তার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে আরো দ্বিগুণ। নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। এখন আর তিনি নিজেকে লুকিয়ে চলেন না। বরং ক্যাফেতে আসা দেশি বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে আলাপচারিতায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। মধু এখন তার স্বামী ও সংসারকে নিজ উপার্জনের অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারছেন। এসিড আক্রমণের শিকার হওয়ার পর মধুর বাগদত্তা তাকে ছেড়ে যাননি বরং ঠিক সময় মতোই তাদের বিয়ে হয়েছে। এরপর থেকেই তার স্বামী তার পাশে থেকেছেন সর্বদা। বর্তমানে মধু তিন সন্তানের জননী।

ক্যাফেতে রয়েছে বইয়ের সাজানো তাঁকআগ্রার এই ক্যাফেতে নয় জন অ্যাসিড ভিকটিম কাজ করে। এছাড়াও এক ডজনের মত নারীর দ্বিতীয় স্থান আগ্রা থেকে ১৮০ মাইল পূর্বে লাকনাউতে। সিরোজ ক্যাফেটি ঠিক আগ্রার তাজমহলের পাশেই অবস্থিত। এতে করে সেখানে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। এইতো সেদিন ইউরোপ থেকে আসা পর্যটকেরা তাদের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ক্যাফেতে। সেখানকার দেয়াল জোড়া বড় টিভির স্ক্রীনে এসিড ভিকটিমদের হৃদয়স্পর্শী সাক্ষাৎকারগুলো দেখছিলেন। অনেকর আবার চোখও ভিজে  উঠছিল। ভিডিওর শেষে তারা বলেছিল, ‘আমরা ভিকটিম নই  আমরা  সার্ভাইভার’।

উজ্জ্বল রঙা এই ক্যাফেটি জুড়ে নীল ও হলুদের সম্ভার। এটিই সিরোজের সাইন। চারপাশের দেয়াল জুড়ে আঁকা রয়েছে এসিড ভিকটিমদের মুখ। বেতের চেয়ার টেবিল যেন আলাদা সৌন্দর্য প্রকাশ করছে ক্যাফেটিতে। এর ঠিক পাশেই বুক সেলফগুলোতে থরে থরে সাজানো আছে বই ও ম্যাগাজিন। যখন এই ক্যাফেটি চালু হয় কেউই জানত না আদৌ এটি চলবে কি-না। তবে দুই বছরের মাথায় গিয়ে ক্যাফেটি সবার নজর কাড়ে। তবে মজার বিষয় হলো এই ক্যাফের কোনো  খাবারের নির্দিষ্ট দাম ধার্য করা নেই।

ক্যাফেতে বসে আছেন অতিথিরামধুর মতই আরেক নারী রুকাইয়া খাতুন। তিনি বাবুর্চির সঙ্গে কাজ করেন। জানান, মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার বড় বোনের স্বামী তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। যথারীতি রুকাইয়া অস্বীকার করেন। তবে থেমে যায়নি তার দুলাভাই। প্রতিশোধ নেয় এসিড নিক্ষেপ করে। আজো সেই ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে রুকাইয়া। 

এসিড আক্রমণের শিকার নারীর সংখ্যা অনুযায়ী ভারত সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। এর পার্শ্ববর্তী দুই দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানও রয়েছে তালিকায়। অপরাধীরা প্রতিশোধ নেয়ার আশাতেই এই ঘৃণিত কাজ করে থাকে বলে জানান এসিড সার্ভাইভার্স ট্রান্স ইন্টারন্যাশনালের সহকারি পরিচালক জাফ শাহ। 

দেয়ালজোড়া গ্রাফিতিতার মতে, নির্যাতিতা যাতে পরবর্তীতে তার মুখ সমাজে না দেখাতে পারে এই আক্রোশেই বেশিরভাগ নারীর মুখেই এসিড নিক্ষেপ করা হয়। ‘যদি এসিড হামলার শিকার কোনো নারী ঘর থেকে না বেরিয়ে মুখ লুকিয়ে ঘরেই বসে থাকে তখন অপরাধীরা  মুচকি হাসে। কারণ সে যা চেয়েছিল তাই তো হচ্ছে,এজন্য  অবশ্যই সব বাধা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে সমাজের সামনে আঙুল উচিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে নিজের মেধা ও মননকে। নিজের মত করে বাঁচতে হবে তাদেরকে।’ এমনটিই বলেন জাফ শাহ।

ঘটনার পর খাতুন অবশ্য পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা করেন তবে তা কাজে আসেনি। কারণ তার বোনের শ্বশুর বাড়ি পরিবার অনেক অনুনয় বিনয় করে অপরাধীর পক্ষে হয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে তাদেরকে। তবে দমে যাননি রুকাইয়া। নিজেকে সেভাবেই তৈরি করেছেন তিনি।

তারা সবাই আজ স্বাবলম্বীসিরোজে কাজ পাওয়ার পর তিনি গত বছর আবারো অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। আজ তিনি সাহসী নারী। কয়েক বছর আগেও তিনি ওড়নায় মুখ ঢেকে চলেছেন। তবে এখন আর তিনি কিছুই পরোয়া করেন না। কারণ তিনি স্বাবলম্বী ও স্বাধীন। রুকাইয়ার বয়স এখন ৩৩ বছর। বিয়েও হয়েছে তার। ঘরে সাত বছরের এক ফুটফুটে ছেলে সন্তানও রয়েছে।

বিশ্বে প্রথম এসিড হামলার মতো ঘটনা শুরু হয় ১৭০০ সালের শেষের দিকে। যুক্তরাজ্যে তখন শিল্প বিপ্লব চলছিল। আর তখনই এসিড তৈরি শুরু হয় বলে জানান জেফ শাহ। সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত সব জায়গাতেই এসিড সহজলভ্য। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার জন এসিড হামলার শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি। বরং দিনকেদিন এই সংখ্যা আরো বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে দলীয় হামলার একমাত্র অস্ত্রই হলো এসিড। 

তারা কেউই নির্যাতিতা নন, সবাই যোদ্ধাসিরোজ ক্যাফের ম্যানেজার রূপা সা হলেন আরেকজন এসিড  ভিকটিম। ২০০৮ সালে সবে ১৫তে পা দিয়েছেন। শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিলেন রূপা, সৎ মা হঠাৎই তার মুখে ঢেলে দেয় এসিড। যদিও পরে তার মায়ের দুই বছরের জেল হয়েছিল। তবে ছাড়া পাওয়ার পর তার বাবা সেই মায়ের সঙ্গেই সংসার করেন। তবে ঘর ছাড়তে হয় রূপাকেই।

সে তার চাচা-চাচীর বাড়িতে চলে আসে। বর্তমানে তার বয়স ২৬ বছর। সেলাইয়ে পারদর্শী সে। বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে এখন সে ক্যাফেতেই বিক্রি করে। এরপর থেকে তার বাবার সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ রাখেননি রূপা। তাই নিজের পদবী পাল্টে ফেলেছেন তিনি। রূপা সা। এই সা হলো ‘স্টপ এসিড অ্যাটাক’ এর শর্ট ফর্ম

সূত্র: গালফ নিউজ 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস