Alexa ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া ও এর মর্মার্থ (পর্ব-১)

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া ও এর মর্মার্থ (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪১ ১৬ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৮:৪৩ ১৬ জানুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মাসনুন দোয়ার আলোচনা চলছে। সকালবেলা প্রাথমিক প্রয়োজন সেরেই সাধারণত মানুষ বাইরে যায়, কোথাও যাওয়ার সময় যখন বাইরে পা রাখবে তখন এই দোয়া পড়বে, 

بِسْمِ اللَّهِ ، واعتصمتُ بالله، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، ، ولاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ
 العلى العظيم

উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি আমানতু বিল্লাহি, ওয়াতাসিমতু বিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি ওয়ালা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আজিম।

অর্থ : আল্লাহ তায়ালার নামে (ঘর থেকে বেরুচ্ছি) আমি অপবিত্রতা হতে আল্লাহ তায়ালার কাছে নিবৃত্তি কামনা করি এবং আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো শক্তি ও ভরসা নেই (তিরমিযী, আবু দাউদ, আহমদ)।

উল্লিখিত দোয়ায় এমন দু’টি বাক্য আছে যা প্রত্যেক মুসলমানেরই মুখস্থ থাকে। (এক) বিসমিল্লাহ। (দুই) ওয়ালা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আজিম।

এই দুই বাক্যের মধ্যখানে আরো দু’টি বাক্য রয়েছে। (এক)  واعتصمتُ بالله (আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি) এবং (দুই) تَوَكَّلْتُ عَلَى 
اللَّهِ (আল্লাহর ওপর ভরসা করছি) দু’টি বাক্যই বেশ ছোট। আশা করি কারো জন্য মুখস্থ করা তেমন কঠিন হবে না।

আল্লাহ তায়ালার সাহায্য গ্রহণ কর: উল্লেখিত দোয়ার অর্থ হলো, আমি আল্লাহ তায়ালার নামে ঘরের বাইরে কদম রাখছি। আমি আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় ও সাহয্য গ্রহণ করছি। মানুষ সাধারণত কোনো প্রয়োজনকে সামনে রেখেই ঘর থেকে বের হয়। কেউ বের হয় কারো সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। কেউ যায় বাজারে কেনা কাটার উদ্দেশ্যে। কেউ যায় বেচা বিক্রির উদ্দেশ্যে। কেউ যায় চাকরির উদ্দেশ্যে। কেউ বের হয় চাষাবাদের উদ্দেশ্যে। কেউ জানে না এসব উদ্দেশ্য সফল হবে কী না। 

তাই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, যখন তোমরা কোনো উদ্দেশ্যে ঘরের বাইরে যাও তখন আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা কর। এবং বলো, নিজের কাজে আমি যেসব উপায় গ্রহণ করেছি, সেগুলো নিছক বাহ্যিক উপকরণ। কিন্তু আয় আল্লাহ আসল সাহায্য কেবল আপনার কাছেই প্রার্থনা করছি।

আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা কর: যেমন, কেউ কোথাও যেতে চাইলে তার বাহ্যিক অবলম্বন হলো, যান বাহনের ব্যবস্থা কর যাতে সহজেই গন্তব্যে পৌঁছা যায়। কিন্তু কেউ কি নিশ্চিত জানে যে, যানবাহন পাওয়া যাবে? বাহন পাওয়ার কেউ কি জানে, এই বাহন তাকে কোন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে? কিংবা এই বাহন তাকে আদৌ সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে কি না? অথবা কেউ কি জানে যে চলার পথে কোনো দুর্ঘনা ঘটবে না কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। চলতে ফিরতে এসব সংশয় আল্লাহ তায়ালার সাহায্য চেয়ে বলো, আয় আল্লাহ! আমি কেবল বাহ্যিক উপায় অবলম্বন করেছি, এসব উপায় উপকরণের ওপর আমার কোনো ভরসা নাই। আমার ভরসা কেবল আপনার সাহায্যের ওপর।

এই সফর ইবাদত বনে যাবে: এভাবে যে ব্যক্তি সফরকালে নিজের সব ইচ্ছা অনিচ্ছা আল্লাহ তায়ালার নিকট অর্পন করে বলে, আয় আল্লাহ, আমি আপনারই আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং আপনারই ওপর ভরসা করছি। এসব বাহ্যিক আসবাব উপকরণের এই সব যানবাহনের কোনো কিছুর ওপরই আমি ভরসা করি না। আয় আল্লাহ! আমার ভরসা কেবল আপনার ওপর। যে ব্যক্তি তার জীবনের সব বিষয়ের আশ্রয় আল্লাহ তায়ালার হাওলা করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা কি তাকে সাহয্য করবেন না? যখন আল্লাহ তায়ালার সাহায্য এসে যাবে, এই সফর তখন ইবাদত বনে যাবে।

সকল শক্তি সামর্থ্য আল্লাহর দান: আলোচ্য দোয়ার শেষ অংশে বলা হয়েছে,

ولا حول ولا قوة الا بالله العلى العظيم

কারো কোনো ক্ষমতা ও সামর্থ্য নেই মহা মহীয়ান আল্লাহ তায়ালার সামর্থ্য ও ক্ষমতা ছাড়া, আল্লাহ তায়ালা আমাকে আমার চলার শক্তি দিয়েছেন। আমি যেই যানবাহনে চড়ছি, সেটিও আল্লাহ তায়ালার দেয়া শক্তি সামর্থ্য নিয়ে চলছে। এই বাহনের সাহয্যে যদি গন্তব্যে পৌঁছুতে পারি, তা হলে এই পৌঁছাও আল্লাহর দান। কেননা আল্লাহ তায়ালার শক্তি সামর্থ্য ছাড়া কারুরই কোনো শক্তি সামর্থ্য নেই। সুতরাং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দোয়া পড়া সুন্নত। এতদ্বারা আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক মজবুত ও দৃঢ় হবে এবং এই বাইরে যাওয়াটা ইবাদতে পরিণত হবে।

বাজার অপছন্দনীয় জায়গা: ঘর থেকে বের হওয়ার পর প্রয়োজনীয় কেনাকাটার উদ্দেশ্যে কিংবা দোকান খোলার জন্য বাজারে যেতে হতে পারে। বাজারের ব্যাপারে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

أَحَبُّ البلاد إلى الله مساجدُها، وأبغضُ البلاد إلى الله أسواقها

উচ্চারণ : আহাব্বুল বিলাদি এলাল্লাহি মাসাজিদুহা ওয়া আবগাজুল বিলাদি ইলাল্লাহি আসওয়াকুহা।

অর্থ : পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচাইতে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদ। যেখানে আল্লাহ তায়ালার বান্দারা তার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে সিজদা করে এবং তার দাসত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটায়, আর আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচাইতে অপ্রিয় জায়গা হলো বাজার। কেননা, বাজারে পাপাচার ও ফিসক ও ফুজুরি অতিমাত্রায় পাওয়া যায়।

বাজারে সংঘটিত পাপাচার: বাজারের ভেতর ব্যবসায়ীরা গ্রাহক ও ক্রেতাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য নানান রকম গুনায় জড়িয়ে পড়ে, যেমন, দোকানিরা অশ্লীল ছবি সাজিয়ে রাখে, এর ফলে পুরুষের কামোত্তেজনা জেগে ওঠে, নারীকে মনে করা হয় এক ধরনের পণ্য, তাদের এক এক অঙ্গ দোকানে প্রদর্শন করা হয়, গ্রাহক যাতে আমার দোকান থেকে পণ্য ক্রয় করে, তা ছাড়া এখানে সবসময় মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণার চর্চা চলতেই থাকে। পণ্যের গুনগত মান নিয়ে মিথ্যাচার চলে হরহামেশাই। মোট কথা, ধোঁকা প্রতারণা, মিথ্যা অশ্লীলতা, উলঙ্গপনাহ বহুত রকম গুনাহ প্রতিনিয়ত বাজারে সংঘটিত হয়। এ কারণেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের নিকট সবচেয়ে অপ্রিয় জায়গা হলো বাজার।

কেয়ামতের দিন যে ব্যবসায়ী অপরাধী সাব্যস্ত হবে: তবে সঠিক অর্থে যদি মুসলমানদের বাজার হয় এবং ত্রেতা বিক্রেতা সবাই যদি ইসলামী অনুশাসন মেনে চলে তা হলে বাজরও হতে পারে ইবাদত খানা। কেননা আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বৈরাগ্য শিক্ষা দেননি যে, দুনিয়াদারি ছেড়ে আমাদেরকে জঙ্গলে চলে যেতে হবে। তিনি বরং আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন দুনিয়ায় থেকে ইসলামী বিধি বিধান মেনে চলার। ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে যেমন বলেছেন,

إن التجار يبعثون يوم القيامة فجارا إلا من اتقى الله وبروصدق

অর্থ : ব্যবসায়ীদেরকে কেয়ামতের দিন ফুজ্জার হিসেবে হাজির করা হবে। তবে যেসব ব্যবসায়ী আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে, সততা ও সত্যবাদিতার সঙ্গে ব্যবসা করে তারা ব্যতীত। ফাজের শব্দের বহু বচন ফুজ্জার। এ ফুজ্জার অর্থ গুনাহগার অপরাধী।

আমানাতদার ব্যবসায়ীর হাশর হবে নবীদের সঙ্গে: অন্যদিকে আর এক হাদিসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ীকে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে হাশর করাবেন।’ (তিরমিযী, দারেমী)। হাট বাজারে মানুষ সাধারণত অন্যের পকেটের টাকা খসানোর জন্যই বসে থাকে। এ কারণেই বাজার অধিকাংশ গুনাহ ও নাজায়েজ কাজ সংঘটিত হয়। এখানে মানুষ মিথ্যা বলে, মিথ্যা কসম খেয়ে নিজের প্রতি অন্যকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। তাই নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারকে নিকৃষ্ট স্থান আখ্যা দিয়েছেন।

প্রয়োজন ছাড়া বাজারে যাবে না: বাজার যেহেতু নিকৃষ্ট জায়গা, তাই প্রয়োজন ছাড়া বাজারে যাবে না। প্রয়োজন হলে তো যেতেই হবে। কিন্তু খামোখা ঘোরা ঘুরির উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়া উচিত না। কেননা, বাজার হলো সব রকম অন্যায় অপরাধের স্থান। গুনাহর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় আশয়ের অভাব নেই। জানা নেই, কোনো গুনাহর ফেসে যাই কী না সেখানে। তাই প্রয়োজন ছাড়া বাজারে যাবে না। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে