গোর্খা সেনা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে নেপালে

গোর্খা সেনা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে নেপালে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:১২ ৪ আগস্ট ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

নেপাল থেকে গোর্খা সেনা নিয়োগ নিয়ে ১৯৪৭-এ ব্রিটেন ও ভারতের সঙ্গে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তিটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গাওয়ালি।

শুক্রবার নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স আয়োজিত এক অনলাইনে আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি।

প্রদীপ কুমার গাওয়ালি বলেন, ভারত ও ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের নিয়োগের বিষয়টি ইতিহাসের অংশ হিসেবে পেয়েছে নেপাল। একসময় বিদেশ যাওয়ার জন্য নেপালি যুবকদের অন্যতম উপায় ছিলো এটি। কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐ চুক্তির অনেক কিছু এখন অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

গত বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে গোর্খা সেনা নিয়োগের ৭০ বছরের পুরনো চুক্তিটি ব্যাপকভাবে সংশোধন জন্য ব্রিটেনকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে নেপাল। তবে ওই প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি ব্রিটেন।

এবার ভারতের সঙ্গেও এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী করতে চায় নেপালের সরকার? তাহলে কি নেপাল থেকে ভারত ও ব্রিটেনের সেনা নিয়োগে ইতি টানার কথা ভাবছে নেপালের ক্ষমতাসীন পার্টি?

এক বিবৃতিতে কাঠমান্ডুর সিনিয়র সাংবাদিক ও নেপালের বৈদেশিক নীতির বিশ্লেষক কমল দেব ভট্টরাই বিবিসি বাংলাকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই বিদেশি বাহিনীতে নেপালিদের নিয়োগ বিতর্কিত একটি ইস্যু। তবে ভারত-চীন সীমান্তে চলতি উত্তেজনায় সেই বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, যখনই চীন-ভারত বা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ হয় তখন সেখানে গোর্খা সেনাদের নিয়ে নেপালিদের মধ্যে উদ্বেগ শুরু হয়। কথা শুরু হয় যে আদৌ ভারতের সেনাবাহিনীতে নেপালিদের পাঠানো বন্ধের সময় এসেছে কিনা। নিঃসন্দেহে এই আবেগের মাত্রা বেড়েছে।

বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ৪০ হাজার নেপালি গোর্খা সেনা রয়েছে। তাদের মধ্যে যারা বাড়িতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন তাদের সবাইকে লাদাখ সীমান্তে সংকটের সময় দ্রুত তলব করা হয়।

এরপর থেকেই নেপালি মিডিয়ার আলোচনা-বিতর্কে ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোর্খা সেনাদের নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, চীনের মতো একটি প্রতিবেশী দেশ যার সঙ্গে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে নেপালিদের ভাড়াটে সেনা হিসেবে অংশ নেয়া নৈতিকভাবে উচিৎ কিনা।

নেপালি জনমত:

কমল দেব ভট্টরাই বলেন, খুব বেশি চাপ তৈরি না হলেও চীন ও ভারতের মধ্যে যদি যুদ্ধ হয় তাহলে গোর্খা ইস্যু নিয়ে বিতর্ক আরো বাড়বে।

চীন-ভারত দ্বন্দ্ব নিয়ে নেপালি সরকার এবং রাজনীতিকদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে এবং তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যত বিতর্কই হোক না কেন, ভারতের সেনাবাহিনীতে গোর্খা সেনা নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে দেখছেন না ভট্টরাই।

তিনি আরো বলেন, অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ইস্যু এটি। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভারতের ওপর নির্ভরতা - এগুলো অগ্রাহ্য করা নেপালের জন্য কঠিন।

নেপালে সেনাবাহিনীতে যে বেতন, ভাতা ও পেনশন সেনারা পায় ভারতীয় বাহিনীতে যোগ দিলে তার চারগুণ বেশি টাকা পায় তারা। নেপালে এখন প্রায় দেড় লাখ মানুষ আছেন যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর পেনশনভোগী।

কি চাইছে নেপালের সরকার:

ঐতিহাসিকভাবে বিদেশি বাহিনীতে গোর্খা নিয়োগের বিরোধী নেপালের ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টি। ১৯৯৬ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর আগে যে ৪০টি দাবি তারা করেছিলো তার অন্যতম ছিলো বিদেশি বাহিনীতে নেপালিদের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা। তবে ২০০৭ সালে শান্তি চুক্তির পর প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরুর পর সেই দাবি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

ভট্টরাই বলেন, নেপাল হয়তো ভারতে গোর্খা সেনা নিয়োগের শর্তে পরিবর্তন চায়। বিশেষ করে গোর্খাদের মোতায়েনের স্থান নিয়ে। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ একাডেমিকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায় যে, ভারত যেন ভবিষ্যতে চীন সীমান্তে গোর্খা সেনাদের মোতায়েন না করে এমন শর্ত আরোপের কথা সরকার হয়ত ভাবছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লড়াই করতে তাদের বিশেষ পারদর্শিতার জন্য চীন এবং পাকিস্তানের প্রতিটি লড়াইতে ভারত তাদের গোর্খা রেজিমেন্ট ব্যবহার করেছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চীন এবং পাকিস্তানের প্রতিটি লড়াইতে বিশেষ পারদর্শিতার জন্য গোর্খা রেজিমেন্ট ব্যবহার করেছে ভারত।

ইতিহাসের বোঝা:

ব্রিটেন ও ভারতের সেনাবাহিনীতে নেপাল থেকে সেনা নিয়োগের ইতিহাস বহুদিনের। গোর্খা যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে নেপালের হেরে যাওয়ার পর ১৮১৫ সালে প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে গোর্খাদের নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর এক চুক্তি

অনুযায়ী ভারতীয় বাহিনীতে ছয়টি গোর্খা রেজিমেন্ট থেকে যায়, বাকি চারটি রেজিমেন্ট ব্রিটিশরা নিয়ে যায়। বর্তমানে ভারতের সেনাবাহিনীতে ৭টি গোর্খা রেজিমেন্টে ৪০ হাজার নেপালি সেনা রয়েছে।

১৯৪৭ থেকে পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গে প্রতিটি যুদ্ধেই নেপালি গোর্খা সেনাদের ব্যবহার করেছে ভারত। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে গোর্খা রেজিমেন্টের বড় ভূমিকা ছিলো। ১৯৬৭ সালে সিকিম সীমান্তে নাথুলা পাস এলাকায় সংঘর্ষে গোর্খা রেজিমেন্ট চীনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ২০১৭ সালে ভুটানের ডোকলাম সীমান্তেও গোর্খা রেজিমেন্ট মোতায়েন করেছিলো ভারত।

সূত্র- বিবিসি বাংলা

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএমএফ