গিরিজা-ঘাঘড়া দখলের মহোৎসব

সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১২ ১৫ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১২:২৬ ১৫ মার্চ ২০১৯

দিনাজপুরের ঘাগড়া ও গিরিজা খাল ইঞ্চি ইঞ্চি করে দখলের মহোৎসব চলছে। খাল দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। দখলের কাজটি খুব সহজে সেরে ফেলতে কেউ কেউ খাল ভরাট করে বানাচ্ছেন মসজিদ-মন্দির। এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ খালের জমিতে রেখে বাকি অংশুটুকু নিজের দখলে নিচ্ছে কেউ কেউ। তবে এ দখলের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের নিম্মাঞ্চল ডুবে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

শহর ঘুরে দেখা যায় সুইহারি,কালুর মোড়, বটতলী কালি মন্দীর পার,  পাটুয়াপাড়া, সর্দার পাড়া, রামনগর, গোলাপবাগ, বড়বন্দর, জোড়াব্রিজ, বালুবাড়ি এলাকায় খালের জায়গা দখল করে একতলা দুইতলাসহ বেশ কিছু স্থাপনা গড়ে উঠেছে। 

কথা সাহিত্যিক মকবুল হোসেন বলেন, মহারাজা গিরিজানাথ রাজ প্রাসাদের সুরক্ষা ও দিনাজপুর শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য এই ক্যানেল দুটি খনন করেছিলেন। এই ক্যানেল দিয়ে  দিনাজপুর শহরের পানি পূর্ণভবা নদীতে গিয়ে পডত। ছোটবেলায দেখতাম এই দুটি ক্যানেলের  মধ্য দিয়ে নৌকা চলাচল করত এবং বন্যার সময শহরের  বিভিন্ন  এলাকার লোকজনের মাছ ধরত। গিরিজানাথ ক্যানেলটি অন্তত  ৩০ থেকে ৪০ ফিট প্রস্থ ও দীর্ঘ প্রায় ১৫ কিলোমিটার রয়েছে। ক্যানেল দুটিতে উৎপত্তি স্থল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থল দখল হয়ে যাচ্ছে।ফলে শহরের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অনেকটাই বিঘ্ন হচ্ছে। গিরিজানাথ ক্যানেলটি বিভিন্ন দখল হতে হতে এখন দুই থেকে তিন ফিট রয়েছে। 

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মনসুর আলী বলেন, ঐহিত্যবাহি ঘাগড়া খালের দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার এবং প্রশস্ত ৬০ ফিট। যেটি দিনাজপুর শহরের মির্জাপুর বাস টার্মিনালের উত্তর দিকের নীচু এলাকা থেকে শুরু হয়ে বালুবাড়ি হয়ে চুড়িপট্টি, বাঞ্ছারামপুর ব্রিজ, বড়পুল হয়ে ঘুঘুডাঙ্গা হয়ে পূনর্ভবা নদীতে গিয়ে মিশেছে। অন্যদিকে গিরিজা খালের দৈর্ঘ্য ৬কিলোমিটার এবং প্রশস্ত প্রায় ৩৫ফুট। যেটি দিনাজপুর শহরের কালিতলা সোনাপীর মাজারের পশ্চিমে সর্দারপাড়া হয়ে কুঠিবাড়ি বিজিবি ক্যাম্পের কাছে ঘাগড়া খালের সাথে মিলিত হয়েছে। সেই দিনের সেই ৬০ ফুট প্রশস্ত খাল এখন বেঁচে আছে ১০-১৫ ফুট প্রশস্ততা নিয়ে। কোনো কোনো জায়গায় খালের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।  

ঘাগড়া দখল করে পোস্ট অফিস গড়ে ওঠার বিষয়ে দিনাজপুর পোস্ট মাস্টার তিলোক চন্দ্র বলেন, দিনাজপুরের চুড়িপট্টি এলাকায় যে ডাকঘরটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে তা আমাদের পুরাতন স্থাপনার উপরেই নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা ও রাজশাহী থেকে পোস্ট অফিসের নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ার এসে ম্যাপ ঠিক করে বিল্ডিংয়ের নকশা করেছে।

দিনাজপুর পৌর মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘাগড়া খাল সংস্কারের জন্য ৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা আমাদের হাতে পৌছেনি। ৬০-৭০ ফিট প্রশস্ত ঘাগড়া ও গিরিজা খাল এখন এসে ঠেকেছে ৫-৭ফিটে। ক্ষমতার দাপটে এক শ্রেণির মানুষ অবৈধভাবে এই খাল দুটো দখল করেছে। খুব শিগিগিরই এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে দিনাজপুর সদরের ইউএনও ফিরুজুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নদী রক্ষা কমিশন হতে চিঠি পেয়েছি। এরইমধ্যে দিনাজপুর শহরের উপর দিয়ে যাওয়া ঘাগড়া ও গিরিজা খাল অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা এবং ম্যাপ তৈরি করেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌরসভার সার্ভেয়ারদের নিয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যেই দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত সম্পন্ন হবে। দখলকারীকে নোটিশ প্রদানপূর্বক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যমক্রম পরিচালনা করা হবে। ঘাগড়া খালে অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ৩৭৫ জন এবং গিরিজা খালে অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ২৪৫ জন। যার মধ্যে প্রাণনাথপুর মৌজায় উভয় খালে অবৈধ দখলদার রয়েছেন ৭২জন, বালুবাড়ি মৌজায় ১৪৫ জন, খামার কাচাই মৌজায় ৩৯, দিনাজপুরে ১১, উত্তর ফরিদপুরে ৯, খামার ঝাড়বাড়িতে ১৮৫, পাহাড়পুরে ৩৪, কসবায় ১২ এবং কাঞ্চন মৌজায় ১১৩ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে বলে জানান তিনি।

ইকবালুর রহিম এমপি বলেন, কোতয়ালী হলো দিনাজপুর শহরের প্রাণ। আর এই প্রাণ রক্ষায় এরইমধ্যে ঘাগড়া ও গিরিজানাথ খালে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ পূর্বক খাল দুটো সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।  খাল উদ্ধারে কেউ যদি কেউ সাময়িক ক্ষতির সম্মুখীনও হয় তাতে আমাদের কিছু করার থাকবে না। খাল দুটো সংস্কার করে দুইপাশে হাঁটার রাস্তা তৈরি করে বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম