Alexa গান ও বাদ্যযন্ত্র : ইসলামী দৃষ্টিকোণ (পর্ব-১)

গান ও বাদ্যযন্ত্র : ইসলামী দৃষ্টিকোণ (পর্ব-১)

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:১১ ২৭ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২০:২৮ ২৮ জানুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন বা জীবন-দর্শন। বিদায় হজের আরাফার দিন আল্লাহ তায়ালা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ করেছেন : ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম। (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ৬)।

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় তিন মাস জীবিত ছিলেন। কিন্তু  বিধান সম্বলিত কোনো আয়াত উক্ত সময়ে আর নাজিল করা হয়নি। এই ঘোষণার মাধ্যমে সব উম্মতের ওপর উম্মতে মুহাম্মদ্দীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। কেননা, এতে ইঙ্গিত রয়েছে আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতের জন্য দ্বীনকে এমনভাবে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীনের মাঝে আর কোনো রকমের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। যা পূর্ববতী উম্মতগণের বেলায় হয়নি।

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পূর্বে কোরআন হাদিসের মধ্যে হালাল হারাম ইত্যাদি বিষয়ে যেসব নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, এর বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা তো সদা সর্বদা হতে থাকবে, কিন্তু  তাতে পরিবর্ধন বা সংস্কার সাধনের আদৌ কোনো অবকাশ রাখা হয়নি। কিন্তু  তার পরও যুগে যুগে বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী মুক্তমনা কিছু লোক এর মধ্যে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের চেষ্টা করে আসছে।

সম্প্রতি সময়ে একটি আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, ইসলামে গান জায়েজ নাকি নাজায়েজ? এ সম্পর্কে কোরআন, সুন্নাহ ও সাহাবাদের আমল দ্বারা যা জানতে পেরেছি, নিম্নের আলোচনায় তা তুলে ধরা হলো। আশা করি পাঠক লেখাটি পড়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে না।

আল কোরআনে গানের প্রসঙ্গ:

এক: আল্লাহ তায়ালা সূরা লুকমানে, আখেরাত প্রত্যাশী মুমিনদের প্রশংসা করার পর দুনিয়া-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে বলেছেন, 
‘আর একশ্রেণীর লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে, বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।’ (সূরা: লুকমান, আয়াত: ৬)।

উক্ত আয়াতের শানে নুযূলে বলা হয়েছে যে, নযর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে একটি গায়িকা বাদি খরিদ করে এনে তাকে গান-বাজনায় নিয়োজিত করল। কেউ কোরআন শুনার ইচ্ছা করলে তাকে গান শুনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ করত  এবং বলতো; মুহাম্মাদ (সা.) তোমাদেরকে কোরআন শুনিয়ে নামাজ, রোজা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়ার কথা বলে। এতে শুধু কষ্টই কষ্ট। তার চেয়ে বরং গান শোন এবং জীবনকে উপভোগ কর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা উক্ত আয়াত নাজিল করেন। (মাআরিফুল কোরআন ৭/৪)।

এই আয়াতের ব্যাপারে সাহাবি ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যা:

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে উক্ত আয়াতের ‘লাহাওয়াল হাদিস’-এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তা  হলো গান। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) একই কথা বলেন। তাবেয়ী  সায়ীদ ইবনে যুবাইর থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী (রহ.) বলেন, উক্ত আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে, যা বান্দাকে কোরআন থেকে গাফেল করে দেয়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৬/৩৪৮)।

দুই: আল্লাহ তায়ালা অন্য এক আয়াতে এরশাদ করেন, আ‘র তুই (শয়তান) তাদের মধ্যে যাকে পারিস, তোর ডাকের দ্বারা বিভ্রান্ত কর।’ (সূরা: ইসরা, আয়াত: ৬৪)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে সব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে, তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.) বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্য অন্যতম। এজন্য একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ৫/৯৮)।

তিন: অন্য এক স্থানে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমরা কি এ কথাতেই বিস্ময় বোধ করছ? এবং হাসছ? কাঁদছ না? আর তোমরা ক্রীড়া কৌতুকে লিপ্ত আছ ‘ (সূরা: নাযম, আয়াত: ৫৩-৫৯)।

উক্ত আয়াতে আরবি ‘ছামীদুন’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এর অর্থ হলো গান বাজনা। বিখ্যাত তাবেয়ী ইকরিমা (রাহ.) থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীরে কুরতুবী ১৭/১২৩)।

সাহাবি ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র দ্বারা যে সব গোনাহ হয়।

(ক) নিফাকের উৎস। (খ) ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী। (গ) মস্তিস্কের ওপর আবরণ। (ঘ) কোরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী। (ঙ) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী।  (চ) গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী। (ছ) জিহাদি চেতনা বিনষ্টকারী। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭)। 

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী গান:

গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাাম ইরশাদ করেন-

(এক) তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম। (তিরমিজি: ১২৮২)।

(দুই) প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জমিনে ধ্বসিয়ে দেবেন। (সুনানে ইবনে মাজহ- ৪০২০)।

(তিন)  হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, পানি যেমন  ভূমিতে তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। (আবু দাউদ- ৪৯২৭)।

উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এই পরিমাণ নেফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবীদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে। এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে।

(চার) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে। (সহিহ বুখারী- ৫৫৯০)।

(পাঁচ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে মুমিনদের জন্য হেদায়াত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি প্রথা বিলোপ সাধনের নির্দেশ দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ)।

(ছয়) হুজুর সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন আমার উম্মত পনেরটি কাজ বেশি বেশি করতে থাকবে তখন তাদের ওপর বিপদ আপদ পতিত হতে থাকবে। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো, নর্তকী এবং বাদ্যযন্ত্র ব্যাপক হয়ে যাবে। (তিরমিজি শরিফ- ২২১০)।

(সাত) রাসূল সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুনিয়া ও আখেরাতে দু’টি আওয়াজ অভিশপ্ত এক. গানের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ। দুই. বিপদ-আপদের সময় বিলাপের আওয়াজ। (মুসনাদে বায্যার-৭৫১৩)।

গান-বাদ্য হারাম হওয়ার ব্যাপারে এছাড়া আরো অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে