গাছতলায় জন্ম নেয়া এই নারীর ইশারায় কাপঁত মোঘল সম্রাজ্য!

গাছতলায় জন্ম নেয়া এই নারীর ইশারায় কাপঁত মোঘল সম্রাজ্য!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২২ ২৮ জুন ২০২০   আপডেট: ১৩:২৯ ২৮ জুন ২০২০

ছবি: মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান

ছবি: মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান

বাংলার ইতিহাসে অনেক নারী উজ্জ্বল হয়ে আছেন। যারা নিজেদের কাজ দিয়ে এখনো মানুষের মনে রয়েছেন। তেমনই এক নারীর কথায় থাকছে আজকের লেখায়। যার এক কথায় গোটা মুঘল সাম্রাজ্য উঠতো এবং বসতো। তিনি এমন এক সময় মুঘল সাম্রাজ্য শাসন করেছেন, যখন নারীদের শিক্ষার অনুমতিই ছিল না। পর্দার আড়ালে কাটত তাদের জীবন। 

বলছি, সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রিয়তমা স্ত্রী নূরজাহানের কথা। যাদের অমর প্রেম আজো মানুষের মুখে মুখে। সম্রাটের বিশতম স্ত্রী হলেও সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন নূরজাহান। তবে জাহাঙ্গীরও ছিলেন নূরজাহানের দ্বিতীয় স্বামী। ১৮ শতকের মুঘল সম্রাজ্ঞী তিনি। ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারীদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন তিনি।

নূরজাহান পরিচিতি

নূরজাহান ছিলেন আসমত বেগম এবং মির্জা গিয়াস বেগের কন্যা। নূরজাহানের বাবা মির্জা গিয়াস পারস্যের এক ব্যবসায়ী ছিলেন। আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ায় তার বাবা গিয়াস বেগ ও মা তেহেরান থেকে ভাগ্যের সন্ধানে ভারতে চলে আসেন। তখন পথের মধ্যেই নির্জন মরু প্রান্তে এক বাবলা গাছের তলায় ১৫৭৭ সালের ৩১শে মে জন্ম হয় নূরজাহানের। তার পিতৃদত্ত নাম ছিল মেহেরুন্নিসা।  

ছবির চেয়েও সুন্দরী ছিলেন তিনিইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথের জন্মের কয়েক দশক পরে জন্মগ্রহণ করেন নূরজাহান। তবে রানি এলিজাবেথের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ এক সাম্রাজ্য শাসন করেছেন তিনি। আকবরের তৈরি বিশাল সাম্রাজ্য যখন জাহাঙ্গীরের উদাসীনতায় ডুবু ডুবু তখন শক্ত হাতে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনীতি এবং রণনীতি সামাল দেন নূরজাহান। 

নূরজাহানের জন্মের পর গিয়াস বেগ ও তার পত্নী এমন দুর্দশায় পরেছিলেন যে, মেয়েকে বাঁচাবার কোনো উপায় না পেয়ে তারা পথের মাঝেই তাদের ছোট সদ্য জন্ম নেয়া কন্যা শিশুটিকে শুইয়ে রেখে চলে যাওয়ার জন্য রওনা হন। তাদের আশা ছিল কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি যদি তাকে পায় নিয়ে আশ্রয় দিবে। কিছু দূর যাওয়ার পরই তারা তাদের কন্যা শিশুর কান্না শুনে আর থাকতে পারলেন না। ফিরে এসে মেয়েকে বুকে চেপে নিঃসহায়, নিঃসম্বল গিয়াস বেগ এসে পৌঁছালেন ভারতে।   

সৌভাগ্যক্রমে মেহেরুন্নিসার বাবা সম্রাট আকবরের রাজসভায় একটি চাকরি পান। মির্জা গিয়াস মনে করতেন তার মেয়ে মেহেরুন্নিসার জন্যই তার ভাগ্য বদল হয়েছে। তাই তিনি মেয়ের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করলেন। মেহেরুন্নিসা মেধাবী হওয়ায় খুব অল্প সময়ে সে পারস্য এবং আরবি ভাষা শিখে ফেলেন। এছাড়াও নাচ, গান, ছবি আঁকা ও শিকারেও পারদর্শী হয়ে উঠেন। 

মেহেরুন্নিসা ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। ধারণা করা হয়, কোনো এক মেলাতে সম্রাট জাহাঙ্গীর তথা শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে নূরজাহানের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। আর প্রথম দর্শনেই নূরজাহানের প্রেমে পরে যান শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর। এর কিছুদিনের মধ্যে জাহাঙ্গীর তার পিতার কাছে নূরজাহানকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করে। তবে সম্রাট আকবর এ বিয়ের প্রস্তাব মেনে নেননি।  

সম্রাট জাহাঙ্গীরতিনি অতি দ্রুত মেহেরন্নিসাকে ইরানি খানদানি বংশের শের আফগান আলি কুলির সঙ্গে ১৫৯৪ সালে বিবাহ দিয়ে বর্ধমানে পাঠিয়ে দেন। তখন মেহেরুন্নিসার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। শের আফগান ছিলেন আকবরের সাম্রাজ্যের অধীনে একজন রাজা। বিবাহের কিছু বছর পরে ১৬০৫ সালে তিনি এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। যিনি পরবর্তীকালে লাড়লি বেগম নামে পরিচিত ছিলেন। 

এর দুই বছর পরে ১৬০৭ সালে দিল্লির সিংহাসনে জাহাঙ্গীর বসেন। এর কিছুদিন পর শের আফগান মারা যান। তার মৃত্যু নিয়ে আলাদা আলাদা কারণ জানা যায়। কিছু নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, শের আফগান যুদ্ধে মারা যান। আবার কিছু ইতিহাসবিদ বলেন, মেহেরুন্নিসার সৌন্দর্য দেখে জাহাঙ্গীর তার প্রেমের কারণে কৌশলে তার স্বামী শের আফগানকে হত্যা করেন।  

মেহেরুন্নিসা থেকে নূরজাহান হয়ে ওঠা

শের আফগানের মৃত্যুর পর মেহেরুন্নিসা ও তার কন্যাকে দিল্লি নিয়ে আসা হয়। সেখানে মা ও মেয়ে শাহী হারেমে থাকতেন বাদশা জাহাঙ্গীরের মায়ের সঙ্গে। শের আফগানের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে তার প্রায় চার বছর সময় লেগে যায়। এরই মধ্যে তার বুদ্ধি এবং বিভিন্ন কাজের পারদর্শিতায় জাহাঙ্গীরের সৎমা রাখিয়া সুলতান বেগম খুবই খুশি হন। ফলে ধীরে ধীরে তার প্রশংসার কথা জাহাঙ্গীরের কানে পৌঁছায়।  

সম্রাট জাহাঙ্গীরের ২০তম স্ত্রী ছিলেন নূরজাহানশের আফগানের মৃত্যুর চার বছর পর সম্রাট জাহাঙ্গীর নেওরাজ নামক এক উৎসবে মেহেরুন্নিসাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং তাকে বিয়ের জন্য রাজি করান। ১৬১১ সালের ২৫ মে প্রায় ৩৪ বছর বয়সে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মেহেরুন্নিসার বিবাহ হয়। তখন জাহাঙ্গীর তার উপাধি দিলেন নূর মহল। যার অর্থ মহলের আলো। নূর মহল বুদ্ধির পাশাপাশি শিকারেও বেশ দক্ষ ছিলেন। তৎকালীন সময়ের এক লেখক তার বইতে লিখেছিলেন যে, জাহাঙ্গীর ও নূর মহল একদিন শিকারে গিয়েছিলেন। তখন নূর মহল মাত্র ৬টি গুলি দিয়ে ৪টি বাঘ শিকার করেছিলেন। 

নূর মহল তথা মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গীরের ২০তম স্ত্রী ছিলেন। তবে বিবাহের কিছু বছরের মধ্যে নূর মহল জাহাঙ্গীরের মনে সম্পূর্ণভাবে জায়গা করে নেন। জাহাঙ্গীরের রাজনীতি বিচার ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে নূর মহলের ছাপ পড়তে থাকে। জাহাঙ্গীর যখন সভাসদদের সঙ্গে বসে গোপন পরামর্শ করতো, তখন নূর মহল তার পাশেই বসে থাকতো। তখনকার দিনে যেখানে মেয়েদের পর্দার আড়ালে জীবন কাটাতে হত। এমনকি মহলের বাইরে যেতে হলেও অনুমতি নিতে হতো। সেসময় দাঁড়িয়ে তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, বুদ্ধি দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যকে বিস্তার করেছিলেন। 

নূর মহল সম্পর্কে সম্রাট জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, আমার রাজ্য আমি এক পেয়ালা মদ এবং আফিমের বিনিময়ে আমার প্রিয় রানির কাছে বেঁচে দিয়েছি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের এই প্রিয় রানি অন্য কেউ নন, তিনি হচ্ছেন নূর মহল। জাহাঙ্গীর যে কোনো আইনি বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার আগে নূর মহলের কাছে পরামর্শ নিতেন। এমনকি মহলের যেসব জায়গায় মুঘল সম্রাট ছাড়া আর কারো যাওয়ার অনুমতি ছিল না সেখানেও নূর মহলের অবাধ যাতায়াত ছিল।নূর মহলের বিচার বুদ্ধির প্রতি জাহাঙ্গীরের সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। 

তাদের দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল ভালোবাসা ও বিশ্বাসে ভরাতিনি বিবাহের পাঁচ বছর পরে নূর মহলের নতুন উপাধি দেন নূরজাহান। যার অর্থ জগতের আলো। নূরজাহান একমাত্র রানি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের যে অনেক আইন তৈরি করেছিলেন। এমনকি সেসময়কার মুদ্রাতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামের পাশে নূরজাহানের নাম খোদাই করা থাকতো। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্যের নেয়া যে কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপে নূরজাহানের ছাপ থাকতো। 

ভালোবাসা এবং বিশ্বাসে ভরা ছিল রাজা-রানির সম্পর্ক

নূরজাহানের হাতে একসময় এতটাই ক্ষমতা ছিল যে, সে জাহাঙ্গীরের বদলে নিজেই সিংহাসনের দখল নিতে পারতো। তবে জাহাঙ্গীর এবং নূরজাহানের সম্পর্কে ক্ষমতার লোভ ছিল না। ছিল ভালোবাসা এবং বিশ্বাস। নূরজাহান তার বোনের মেয়ে আরজুমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের ছেলে খুররামের সঙ্গে বিবাহ দেন। যারা পরবর্তীকালে মমতাজ এবং শাহজাহান নামে পরিচিত হন। 

১৬২৬ সালে এক যুদ্ধে মেহবাদ খান জাহাঙ্গীরকে বন্দি করে ফেলেন। জাহাঙ্গীরকে বাঁচানোর জন্য নূরজাহান খুবই তাড়াতাড়ি একটি পরিকল্পনা করেন। এমনকি তিনি যুদ্ধে সবার প্রথমে হাতি নিয়ে এগিয়ে যান। তবে পরিকল্পনায় কিছু ভুল হওয়ায় শেষে নূরজাহানও মেহবাদ খানের কাছে বন্দী হয়ে যান। নূরজাহানের বুদ্ধির কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় মেহবাদ খানকে। নূরজাহান জাহাঙ্গীরকে নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সফল হন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই শারীরিক অসুস্থতার ফলে জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হয়। 

নূরজাহান ও জাহাঙ্গীরের সম্পর্ক খুব ভালো হলেও তাদের কোনো সন্তান ছিল না। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান চেষ্টা করেছিলেন তার মেয়ে লাড়লি বেগমের স্বামী শারিয়ারকে দিল্লির সিংহাসনে বসানোর জন্য। শাহজাহানের চক্রান্তে তা সফল হয়নি এবং নূরজাহানকে তিনি সমস্ত রাজনৈতিক কাজ থেকে সরিয়ে দেন। 

নূরজাহানের সমাধিনূরজাহানের শেষ জীবন

নূরজাহান তার পরবর্তী জীবন লাহোরের এক আলিসান মহলে কাটান। এসময় তিনি শাহজাহানের কাছ থেকে বাৎসরিক দুই লাখ টাকা পেতেন। শেষ জীবনে তিনি তার বাবা মির্জা গিয়াসের স্মৃতিসৌধ বানানোর কাজ করতেন। ১৬৪৫ সালের ১৭ই ডিসেম্বর ৬৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের লাহোরে মারা যান এক সময়কার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারী নূরজাহান। 

তাকে লাহোরের শাহদারাবাগে কবর দেয়া হয়। এই কবর তিনি দিল্লিতে থাকাকালীন সময়ে নির্মাণ করেছিলেন।আজো বহু মানুষ তার এই স্মৃতিসৌধ দর্শন করতে যান। তবে এত বছর পরেও নূরজাহান আজো বহু পিছিয়ে পড়া নারীর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। অনেক লেখকের লেখনীতে স্থান করে নিয়েছিলেন নূরজাহান। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক বই। নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু সিনেমাও। 

১৯৩১ সালের সাইলেন্ট মুভি ‘নূরজাহান’, ১৯৩৯ সালে ‘পুকার’ মুভি, ১৯৫৩ সালের ঐতিহাসিক মুভি ‘আনারকলি’ এবং ১৯৬৩ সালের ‘তাজমহল’ মুভির নূরজাহানের চরিত্র সবার মন কেড়ে নিয়েছে। নূরজাহান সম্পর্কে জানার আগ্রহের শেষ হবে না কিছুতেই। মনের তৃষ্ণা মেটাতে পড়তে পারেন নূরজাহানের জীবনী নিয়ে রচিত বইগুলো। এর মধ্যে তনুশ্রী প্রদ্দারের লেখা ‘নূরজাহানস ডটার’ নামক বইটি পড়তে পারেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস