গভীর রাতে ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্ত্বরে হাজির হন বাংলার গভর্নর!

গভীর রাতে ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্ত্বরে হাজির হন বাংলার গভর্নর!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:২৯ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রতি বছরের থার্টি ফার্ষ্ট নাইটে আগমন ঘটে তার! গভীর রাতে নির্জন এস্টেটের সামনে এসে থামে এক জুড়িগাড়ি। পার্টিতে বলডান্সে অংশ নিতে আসেন তিনি! স্থানটি হলো কলকাতার গর্বের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বা জাতীয় গ্রন্থাগার। ভাবছেন সেখানে আবার কে আসে? 

বলছি বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কথা! তার জন্যই কলকাতার ভূতবিশ্বাসীদের কাছে অন্যতম ‘ভৌতিক’ জায়গা ঐতিহাসিক বেলভিডিয়ার এস্টেট বা বর্তমানের জাতীয় গ্রন্থাগার। তিনি নাকি এখনো ভুলতে পারেননি বেলভিডিয়ার এস্টেটকে। ইতালিয়ান ভাষায় বেলভেডেয়ার শব্দের অর্থ মনোরম দৃশ্য। বিশেষ গথিক ঘরানার স্তাপত্যকে বলা হয় ‘বেলভিডিয়ার’। পদ্ম সরোবর এবং দুর্লভ গাছে সাজানো এই প্রাসাদ বহুবার হাতবদল হয়েছে।

সৈয়দ মীর জাফর আলি খান বাহাদুর এবং লর্ড জর্জ কার্জন। ভারত তথা বাংলার ইতিহাসে দুই আপাত খলনায়ক। এই দুই কালো নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কলকাতার গর্বের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বা জাতীয় গ্রন্থাগারের গোড়াপত্তন। ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে আছে সেই আখ্যান। 

বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগারের ঠিকানা আলিপুরের বেলভেডেয়ার গার্ডেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ২০ লাখেরও বেশি বইয়ের আধার এই গ্রন্থাগার। নেয়া হয় প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার পত্রিকা। এর গ্রন্থাগারিকদের মধ্যে অন্যতম সাহিত্যিক প্যারীচাঁদ মিত্র এবং ভাষাবিদ হরিনাথ দে। বিভিন্ন সময়ে এই গ্রন্থাগারে দান করা হয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রহ। দেশীয় রাজপরিবারের তরফে বই দান করা হয়েছে। 

পাশাপাশি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, স্যর যদুনাথ সরকার-সহ বহু বরেণ্য ব্যক্তিত্বের দুর্লভ সংগ্রহে সমৃদ্ধ হয়েছে জাতীয় গ্রন্থাগার। দেশের বাকি তিন শহরেও আছে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’। কিন্তু ঐতিহ্য ও আভিজাত্যে তাদের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে কলকাতার আলিপুরের বেলভিডিয়ার এস্টেটের বইসমুদ্র। ৭২ বিঘা ৮ কাঠা ৪ ছটাক জমির মূল ভবন ছাড়া আরো কিছু ভবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জাতীয় গ্রন্থাগারের বিভিন্ন বিভাগ।

কলকাতার জাতীর গ্রন্থাগারবেলভিডিয়ার গার্ডেন হাউসের ইতিহাস

কথিত, নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘আলিপুর’- এর নামকরণ করেছিলেন নবাব মীর জাফর। ব্রিটিশদের হাতের পুতুল হয়ে সিংহাসনে বসার পরেও বেশিদিন নবাব হয়ে থাকা হয়নি তার। ব্রিটিশদের অঙ্গুলিহেলনেই সিংহাসন হারিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে চলে আসতে হয়েছিল কলকাতায়।

তৎকালীন কলকাতায় বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করিয়েছিলেন মীর জাফর। বেলভিডিয়ার গার্ডেন হাউস তিনি উপহার দিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসকে। এই ভবনের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে প্রিন্স আজিম উস খানের নাম। অওরংজেবের নাতি এবং প্রথম বাহাদুর শাহ জাফরের ছেলে প্রিন্স আজিম ছিলেন বাংলা-বিহার-ওড়িশার সুবেদার।

হেস্টিংস ছিলেন ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলার গভর্নর। বক্সার যুদ্ধের পরে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান। উপনিবেশে আবার ফিরলেন ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে। জার্মান ব্যারনেস মারিয়ান ইনহফ ছিলেন তার প্রেয়সী। সাধের বেলভিডিয়ার হয়ে উঠল তাদের বাসভবন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে বেলভিডিয়ার হাউজকে মেজর টলির কাছে বিক্রি করে দেন হেস্টিংস। 

এরপর মালিকানার হাতবদল, লিজ নেয়ার পর্ব পেরিয়ে লর্ড ডালহৌসির আমলে বেলভিডিয়ার হয়ে ওঠে ভারতের লেফ্টেন্যান্ট গভর্নরের বাসভবন। দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী এই ভবনে ১৯৫৩ সালে হয় জাতীয় গ্রন্থাগারের নতুন ঠিকানা। উদ্বোধন করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। তার আগে একাধিকবার ঠিকানা বদলেছে এই গ্রন্থাগার।

গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও তার স্ত্রীজাতীয় গ্রন্থাগারের শিকড় বিস্তৃত ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে। সে বছর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি’। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ‘দ্য ইংলিশম্যান’ পত্রিকার সম্পাদক জোয়াকিম স্টোকেলার ওরফে জোয়াকিম হেওয়ার্ডস সেডনস। মোট ২৪ জন উদ্যোক্তার মধ্যে মাত্র দু’জন ছিলেন বাঙালি। বাবু রসিককৃষ্ণ মল্লিক এবং বাবু রসময় দত্ত। তখন বলা হয়, ৩০০ টাকা অনুদান দিলে ‘ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি’-র প্রোপাইটার হওয়া যাবে। প্রথম এই অনুদান দিয়ে প্রোপাইটার হয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর।

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি’। কিন্তু এই দু’টি পাঠাগারেই সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মী এবং অভিজাত শ্রেণি ছিল এই দুই পাঠাগারের ব্যবহারকারী। এই অবস্থার পরিবর্তন চাইলেন তৎকালীন ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন। দু’টি গ্রন্থাগারকে মিলিয়ে লর্ড কার্জন প্রতিষ্ঠা করলেন ‘দ্য ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি’। প্রথম ঠিকানা ছিল মেটকাফ হল। ১৯২৩ সালে গ্রন্থাগার উঠে যায় ৬ এসপ্ল্যানেড ইস্ট ঠিকানায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার কারণে সাময়িক ঠিকানা হয়েছিল জবাকুসুম হাউসে (আজকের সি আর অ্যাভিনিউয়ে)। যুদ্ধ মিটলে তা আবার ফিরে আসে এসপ্ল্যানেডে। স্বাধীনতা-দেশভাগ উত্তর সময়ে বেলভিডিয়ার হাউসে ছোটলাটের বাসভবনের প্রয়োজন আর থাকল না। তার আগে থেকেই গভর্নরের একমাত্র ঠিকানা এসপ্ল্যানেডের গভর্নর হাউস বা আজকের ‘রাজভবন’। 

১৯৪৮ সালে স্থির হলো, বেলভিডিয়ার হাউস হবে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির নতুন ঠিকানা। সিদ্ধান্ত কার্যকর হল। ঠিকানার সঙ্গে পরিবর্তিত হল নামও। এরপর ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি পরিচিত হল ‘দ্য ন্যাশনাল লাইব্রেরি’ বা জাতীয় গ্রন্থাগার নামে। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এর দরজা খুলে দেয়া হল স্বাধীন ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য।

বেলভিডিয়ার এস্টেটঐতিহাসিক ডুয়েলে

এই বেলভিডিয়ার ভবন সাক্ষী ছিল এক ঐতিহাসিক ডুয়েলের। বেলভেডেয়ার এস্টেটের কাছেই একটি গাছের নীচে হয়েছিল সেই ডুয়েল। প্রতিপক্ষ ওয়ারেন হেস্টিংস এবং ফিলিপ ফ্রান্সিস। ব্যারনেসকে নিয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ডুয়েলে হেস্টিংসের গুলিতে আহত হয়েছিলেন ফ্রান্সিস। বেলভিডিয়ার হাউসেই নাকি তার শুশ্রূষা হয়েছিল।

ডুয়েলে জয়ী হেস্টিংসেরই থেকে যান তার জার্মান প্রেয়সী ব্যারনেস মারিয়ান ভন ইমহফ। পরে তারা বিয়ে করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন মারিয়ানের দ্বিতীয় স্বামী। হেস্টিংস দম্পতি বলডান্স করতেন এস্টেটের হলরুমে। নাচের আসরে যোগ দিতেন কলকাতার ব্রিটিশ সমাজের আমন্ত্রিত অভিজাতরা। সেই হলঘর-ই দীর্ঘদিন ছিল জাতীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুম। পরে তা ভাষা ভবন-এ স্থানান্তরিত হয়।

হেস্টিংসের শাসনকাল ছিল কলঙ্কিতও। মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি এবং ইম্পিচমেন্ট জড়িয়ে তার নামের সঙ্গে। পরে অবশ্য তিনি কলঙ্কমুক্তও হন। তবে সেই বিচারপদ্ধতি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ, তাকে বাঁচাতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল মহারাজা নন্দকুমারকে। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মভূমি গ্লসেস্টারশায়ারে প্রয়াত হন ওয়ারেন হেস্টিংস। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস