গণহত্যাকারীদের কোনো ক্ষমা নেই: বঙ্গবন্ধু
Best Electronics

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

গণহত্যাকারীদের কোনো ক্ষমা নেই: বঙ্গবন্ধু

স্বরলিপি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:১৩ ৯ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ২০:১১ ৯ মার্চ ২০১৯

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি : শিল্পী আনিসুজ্জামান মামুন

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি : শিল্পী আনিসুজ্জামান মামুন

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করেছিল বীর বাঙালি। দেশ স্বাধীন হলেও যার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, সেই অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। ফলে স্বাধীনতা এলেও নেতার অনুপস্থিতিতে অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল বিজয়ের গৌরব উদ্‌যাপনে। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখেন।

১৯৭২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের অনুলিখন সন্নিবেশিত হয়। পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ঢাকায় এই সাক্ষাৎকারটি নেন ডেভিড ফ্রস্ট। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন্ বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করা হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারটির পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হল (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)-

 

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার কি মনে হয় যে, রেসকোর্সে ৭ মার্চ তারিখেই আপনার স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করা ভালো ছিল?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমি জানতাম কী ঘটতে যাচ্ছে এবং সে সভায় আমি ঘোষণা করেছিলাম যে, এবারের সংগাম মুক্তির সংগাম, এবারের সংগাম স্বাধীনতার সংগাম

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি যদি বলতেন, আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করছি, তাহলে কী ঘটত?

শেখ মুজিবুর রহমান: সেদিন আমি তা করতে চাইনি, কারণ তাহলে তারা পৃথিবীকে এটা বলতো মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং এখন আমাদের আঘাত করা ছাড়া বিকল্প নেই আমি চেয়েছিলাম তারা প্রথমে আঘাত করুক এবং প্রতিরোধ করার জন্য আমার জনগণ প্রস্তুত ছিল

ডেভিড ফ্রস্ট: কিন্তু আপনি এটা শুরু করতে চাননি?

শেখ মুজিবুর রহমান: না, আমি চেয়েছিলাম তারা শুরু করুক

ডেভিড ফ্রস্ট: ব্রিটেন কখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে বলে আপনি মনে করেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: যে কোন সময় আমি ব্রিটিশ জনগণকে জানি

ডেভিড ফ্রস্ট: লন্ডনে মি. হিথের সঙ্গে আপনার আলোচনা হয়েছে?

শেখ মুজিবুর রহমান: মি. হিথের সঙ্গে কথা হয়, মি. উইলসনের সঙ্গে কথা হয়, এবং আলোচনায় আমি খুশি

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি ব্রিটিশ তামাক সেবন করেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, দীর্ঘকাল যাবৎ

ডেভিড ফ্রস্ট: এটা কোন্ তামাক?

শেখ মুজিবুর রহমান: এরিন মোর

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনি এটা পছন্দ করেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: পছন্দ করি প্রায় চৌদ্দ বছর আমি এ তামাক সেবন করছি এমন কি জেলেও আমি তাদের বলেছিলাম যে, এই তামাকটিই আমাকে দিতে হবে দয়া করে তারা তা দিয়েছিলেন

ডেভিড ফ্রস্ট: নির্জন কারাকক্ষেও?

শেখ মুজিবুর রহমান: (হাসতে হাসতে) আমি তার জন্য অন্তত তাদের কাছে কৃতজ্ঞ

ডেভিড ফ্রস্ট: এটা একটি ক্ষুধার্ত নগরী, কিন্তু সুখী আপনি কি জানেন আপনার কত টাকা প্রয়োজন?

শেখ মুজিবুর রহমান: - মুহূর্তে আমি বলতে পারবো না আমি কিছু বলতে পারবো না এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় তারা (পাকিস্তানি) ব্যাংক নোটগুলোও পুড়িয়ে দিয়ে যায় ব্যাংকের টাকা নিয়ে নেয় এবং আত্মসমর্পণের আগে পুড়িয়ে দেয়

ডেভিড ফ্রস্ট: পূর্ব পাকিস্তানের অন্য  টাকাও আছে, আগেও যেটা ছিল, যা পশ্চিম পাকিস্তানে রয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমান: সেখানে কিছু নেই আমি আমার জনগণকে তাদের যা কিছু আছে দিতে বলেছি তারা তা দেবে

ডেভিড ফ্রস্ট: তারা সোনা দেবে এবং আপনার সোনার রিজার্ভ গঠন হবে।

শেখ মুজিবুর রহমান: এখন আমার এই একটিই বিকল্প রয়েছে আগামীকাল কিংবা তার পরদিন আমি জগনণের কাছে আবেদন জানাব আপনাদের যা আছে, তা থেকে কিছু গহনা দিন সরকারি ব্যাংকে ওগুলো জমা রাখুন যাতে আমি একটি রিজার্ভ গঠন করতে পারি কিন্তু তাদের কিছুই নেই দোকান লুট হয়েছে, সোনার দোকান এর বেশি কিছু আপনাকে বলতে পারছি না

ডেভিড ফ্রস্ট: কিন্তু কোথা থেকে মানুষ আপনাকে সোনা দেবে?

শেখ মুজিবুর রহমান: সামান্য যা আছে, তা থেকেই

ডেভিড ফ্রস্ট: পশ্চিম পাকিস্তানে যা রিজার্ভ রয়েছে, তার কোনটিই আর কখনো আপনি দেখতে পাবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি জানেন, বিশ্বের কাছে তাদের একটি অঙ্গীকার রয়েছে তারা ২০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, বাংলাদেশে যার সামান্যই তারা ব্যয় করেছে পাকিস্তান তো রয়ে যাচ্ছে আমরা আর পাকিস্তানি নই আমার কোন দায়িত্ব নেই তারা যা ঋণ নিয়েছিল, তারা তা শোধ করুক তাদের অর্থনীতি তারা দেখুক ২০০০ কোটি টাকা ঋণ শোধ এবং সেখানে তাদের শিল্পের কোন বাজার নেই- তারা কি দাঁড়াবে? তাদের মারাত্মক বেকারত্ব থাকবে

ডেভিড ফ্রস্ট: সবাই বলছে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিশাল ক্ষমতা আপনার রয়েছে। ওই পুরনো কথাটিও রয়েছে, পাওয়ার করাপ্টস, অ্যাব্‌সোলিউট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাব্‌সোলিউটলি ক্ষমতা আপনাকে নষ্ট করার সম্ভাবনা থেকে, আপনি কিভাবে বাঁচবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি জানেন যে, ইয়াহিয়া খানের মতো কোন ব্যক্তি যদি দুর্ঘটনাক্রমে ক্ষমতায় আসেন, তিনি নষ্ট হতে পারেন কিন্তু কেউ যদি- একটি প্রক্রিয়ার-সংগ্রাম, দুঃখকষ্ট, লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে আসেন, তাকে আপনি যত ক্ষমতাই দিন তিনি নষ্ট হবেন না আমার দল এবং আমার ক্ষেত্রে, আমার সব নেতাই জেল খেটেছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অনেকে পরিবার-পরিজন হারিয়েছে ২৪ বছর পর তারা ক্ষমতা পেয়েছে তারা চূড়ান্ত ক্ষমতা পেলেও, নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই; কারণ, ইয়াহিয়া খান এবং তার সঙ্গীদের থেকে ভিন্নভাবে তারা একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এসেছে ইয়াহিয়ারা ক্ষমতায় আসে বন্দুক এবং পশুশক্তির মাধ্যমে আমার লোকগুলো বন্দুক নয়, একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শুধু তাই নয়, ত্যাগ স্বীকার করে তারা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাদের দেশ এবং মানুষের জন্য ভালোবাসা রয়েছে আমার নেতা এবং দলীয় কর্মীদের ওপর আমার আস্থা রয়েছে

ডেভিড ফ্রস্ট: আমাদের আজকের এই আলাপে আপনি নেতা এবং নেতৃত্বের কথা তুলেছেন যথার্থ নেতৃত্বের আপনি কি সংজ্ঞা দেবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমি বলব, যথার্থ নেতৃত্ব আসে সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেউ আকস্মিকভাবে একদিনে নেতা হতে পারে না তাকে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আসতে হবে তাকে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে নেতার আদর্শ থাকতে হবে, নীতি থাকতে হবে এই সব গুণ যার থাকে, সেই মাত্র নেতা হতে পারে

ডেভিড ফ্রস্ট: ইতিহাসের কোন নেতাদের আপনি স্মরণ করেন, তাদের প্রশংসা করেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: অনেকেই স্মরণীয় বর্তমানের নেতাদের কথা বলছিনা

ডেভিড ফ্রস্ট: না, বর্তমানের নয় কিন্তু ইতিহাসের কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমি আব্রাহাম লিংকনকে স্মরণ করি স্মরণ করি মাও সে-তুঙ, লেলিন, চার্চিলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট জন কেনেডিকেও আমি শ্রদ্ধা করতাম

ডেভিড ফ্রস্ট: প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কী আপনার সাক্ষাৎ হয়েছিল?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি তবে আমি উনার বই পড়েছি আমি উনাকে পছন্দ করি

ডেভিড ফ্রস্ট: মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

শেখ মুজিবুর রহমান: মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু, সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, কামাল আতাতুর্ক-দের জন্য আমার মনে গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে আমি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী নেতা ড. সুকর্নকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতাম এই সকল নেতাই তো সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নেতা হয়েছিলেন

ডেভিড ফ্রস্ট: আজ এই মুহূর্তে অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সবচাইতে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সবচাইতে সুখী করেছিল?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সবচাইতে সুখের দিন

ডেভিড ফ্রস্ট: আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন?

শেখ মুজিবুর রহমান: সমগ্র জীবনের সব চাইতে সুখের দিন

ডেভিড ফ্রস্ট: এমন দিনের স্বপ্ন আপনি কবে থেকে দেখতে শুরু করেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: বহুদিন যাবৎ আমি এই স্বপ্ন দেখে আসছি

ডেভিড ফ্রস্ট: স্বাধীনতার সংগ্রামে আপনি কবে প্রথম কারাগারে যান?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমার জেল গমন শুরু হয়, বোধ হয় সেই ১৯৪৮ সালে আমি তারপর ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হয়ে জেলে যাই এবং ১৯৫২ সাল পর্যন্ত জেলে থাকি ১৯৫৪ সালে আমি; একজন মন্ত্রী হই আবার ১৯৫৪ সালেই গ্রেফতার হই এবং ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত জেলে থাকি আবার ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান আমাকে জেলে পাঠায় এবং তখন পাঁচ বছর অন্তরীণ থাকি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ নানা মামলায় আমাকে সরকার পক্ষ বিচার করেছে ১৯৬৬ সালে আবার আমাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিন বছর যাবৎ আটক রাখা হয় তারপর আবার ইয়াহিয়া খান গ্রেফতার করে এমন দীর্ঘ সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগতভাবেই আমার নয় আমার বহু সহকর্মীর জীবনেরই এই ইতিহাস

ডেভিড ফ্রস্ট: যখন আপনি গত নয় মাসের মুক্তিসংগ্রামে আপনার কোন- কোন সহকর্মীর জীবনে কী ঘটেছে তা জানতে পান..

শেখ মুজিবুর রহমান: আমার ৩০ লাখ লোককে তারা মেরে ফেলেছে, এটা যখন জানলাম, সেটাই ছিল আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা খারাপ সময়

ডেভিড ফ্রস্ট: (ছবি দেখিয়ে) এগুলো এমন ছবি যা আমরা কখনো ভুলবো না এগুলো সেই ছবি যা গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিযেছিল আপনি যখন এ –ছবিগুলো প্রথমে দেখলেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি আমাকে এগুলো না দেখালেই পারতেন। আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি (এ সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি বঙ্গবন্ধু)

ডেভিড ফ্রস্ট: নিশ্চয় আপনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন এই ছবিগুলো যখন আপনি প্রথমে দেখেন কী বলেছিলেন তখন?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমি কী বলতে পারতাম? বলার কোন কথা ছিল না আমার আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম এখনও আমার চোখে পানি আসে পাক সেনারা নির্দোশ বালক, বালিকা, নির্দোষ মানুষকে ক্ষমাহীনভাবে মেরেছি তারা ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, আমার মানুষকে ধর্ষণ করে- আমার বোনদের-মায়েদের সেটা ছিল আমার জীবনের সর্বাধিক খারাপ সময় এবং আমি একজন শক্ত মানুষ সম্ভবত কেউ আমার চোখে পানি দেখেনি কিন্তু এখন পানি আসছে এবং আমি আটকাতে পারছিনা

ডেভিড ফ্রস্ট: বিগত মাসগুলোতে আপনার মানুষের জন্য আপনি কতবার কেঁদেছেন?

শেখ মুজিবুর রহমান: বহুবার

ডেভিড ফ্রস্ট: যখন আপনি শুনেছেন কী করা হয়েছে?

শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ যতবার আমি এটা স্মরণ করি, আমার চোখে পানি আসে এবং এখনও আসছে আপনি যখন এই ছবিগুলো দেখালেন, আমি আর এখন কথা বলতে পারছিনা পাঁচমাস, এক বছর কিংবা দুবছর বয়সের একটি শিশুকে একজন মানুষ কিভাবে হত্যা করতে পারে? নারীদের, কৃষকদের- যাদের খাবারটুকু পর্যন্ত নেই-কীভাবে হত্যা করতে পারে? আমার বন্ধু, আমি এটা ভাবতে পারি না বাস্তবেই এটা একটি দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা ফ্যাসিস্ট জার্মানির যুদ্ধাপরাধীদের এই পৃথিবী দেখেছিল এবং তাদের জন্য নুরেমবার্গ বিচারের আয়োজন করেছিল আমি মনে করি জাতিসংঘ কর্তৃক এই লোকগুলোর এবার বিচার হওয়া উচিত পৃথিবীকে এগুলো দেখার, তদন্ত এবং বিচারের সুযোগ দিতে আমার কোন আপত্তি নেই আমি সবসময় ক্ষমা এবং ভুলে যাওয়ায় বিশ্বাস করি কিন্তু ক্ষমা করা এবং ভুলে যাওয়া এখন আমার পক্ষে অসম্ভব, কারণ- এগুলো ঠাণ্ডা মাথার এবং পরিকল্পিত হত্যা, আমার মানুষের ওপর গণহত্যা আপনি কি মনে করেন কোন মানুষ এগুলো মেনে নিতে পারে? এই লোকগুলোকে শাস্তি দিতেই হবে এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন নেই আমি এখন কথা বলতে পারছি না আপনি কেন আমাকে এই ফটোগুলো দেখালেন? আমি এটা ভাবতে পারি না বিশ্বাস করুন, এই বিশেষ ব্যাপারটাতে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি

ডেভিড ফ্রস্ট: আমি মনে করি, আমিও তাই হয়েছিলাম এবং আমি মনে করি আরো অনেক মানুষও তাই হবেন

শেখ মুজিবুর রহমান: যখন আপনি বহু স্থানে শত-শত, হাজার হাজার মৃত মানুষ দেখবেন তারা একটি খন্দ খুঁড়েছে, হাজার হাজার মানুষকে মেরে তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলেছে কেউ- কেউ মারাও যায়নি এমনকি- তাদেরকেও ছুঁড়ে ফেলেছে এবং তারা সেখানে কাতরাতে-কাতরাতে মরেছে (কণ্ঠস্বর উঁচুতে উঠেছে) মানব জাতির ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিপর্যয় কি আপনি শুনেছেন? আমার মানুষকে নিয়ে আর কেউ রাজনীতি করুক, এটা আমি চাই না মানবতার স্বার্থে আমার দুর্ভাগা মানুষকে, যারা এখনও কষ্ট পাচ্ছে, তাদেরকে সাহায্য করার জন্য আমি তাদের নিকট আবেদন জানাচ্ছি আমার কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না আমি এটা গ্রহণ করতে পারিনি একজন প্রধানমন্ত্রী কী পায়, যা আমি আমার মানুষের কাছ থেকে পাইনি? গতকাল আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম, আহত মানুষকে দেখলাম- যারা হাত ও পা হারিয়েছে কিন্তু তারা আমাকে বলল, ‘আমাদের সব গেছে, তাতে কোন দুঃখ নেই কিন্তু আপনি তো ফিরে এসেছেন এটাই আমাদের তৃপ্তি আমার খুশি’ আপনি কি ভালোবাসা-স্নেহকে হত্যা করতে পারবেন? প্রধানমিন্ত্রিত্ব, রাষ্ট্রপতিত্ব আমার কাছে কোন অর্থ রাখে না আমি আমার মানুষের স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছি আমি তা-ই নিয়ে মরতে চাই, আর বেশি কিছু চাই না আমি বেশি কিছু চাই না আমি খুশি আমার জনগণ এখন স্বাধীন, তারা নিজেদের উন্নতি করতে পারবে একটি স্বাধীন দেশে বাস করতে পারবে আমি কৃতজ্ঞ, সত্যিই আমি ভারতীয় জনগণ এবং মিসেস গান্ধীর নিকট কৃতজ্ঞ যেভাবে তারা আমার এক কোটি লোককে সাহায্য করেছে যারা ভারতে চলে গিয়েছিল, ভারতের মানুষ তাদের খাবার, আশ্রয়, বাসস্থান দিয়েছে পৃথিবীর ৮০টি দেশে জনসংখ্যা ১ কোটির কম; কিন্তু আমার ১ কোটি লোককে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় এবং আপনি জানেন কীরকম দুঃখ-কষ্ট ছিল আমি তাদের পুনর্বাসিত করতে চাই, মানবিক অনুভূতি যাদের রয়েছে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আমি সাহায্য চাই আমি ইতোমধ্যেই আমার পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেছি- সকলের প্রতি বন্ধুত্ব এবং কারো প্রতি বিদ্বেষ নয় আমি আমার দেশকে রক্ষা করতে চাই, আমার জনগণকে বাঁচাতে, তাদের খাবার, কাপড়, বাড়ি, শিক্ষা, চাকরি দিতে চাই শোষণ থেকে মুক্ত একটি সমাজ আমি চাই, অন্য কিছু নয়

ডেভিড ফ্রস্ট: মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, পৃথিবীর মানুষের জন্য কী বাণী আমি আপনার কাছ থেকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি?

শেখ মুজিবুর রহমান: আমার একমাত্র প্রার্থনা- বিশ্ব আমার দেশের মানুষের সাহায্যে অগ্রসর হয়ে আসুক আমার হতভাগ্য স্বদেশবাসীর পাশে এসে বিশ্বের মানুষ দাঁড়াক আমার দেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দুঃখ ভোগ করেছে, এমন আত্মত্যাগ পৃথিবীর খুব কম দেশের মানুষকেই করতে হয়েছে মিস্টার ফ্রস্ট, আপনাকে আমি আমার একজন বন্ধু বলে গণ্য করি আমি আপনাকে বলেছিলাম, আপনি বসুন নিজের চোখে দেখুন আপনি নিজের চোখে অনেক দৃশ্য দেখেছেন আরো দেখুন আপনি আমার এই বাণী বহন করুন- সকলের জন্যই আমার শুভেচ্ছা আমি বিশ্বাস করি, আমার দেশের কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে এসে বিশ্ব দাঁড়াবে আপনি আমার দেশের বন্ধু আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন জয় বাংলা

ডেভিড ফ্রস্ট: জয় বাংলা আমিও বিশ্বাস করি, বিশ্ববাসী আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে আপনাদের পাশে এসে আমাদের দাঁড়াতে হবে নয় তো ঈশ্বর আমাদের কোনদিন ক্ষমা করবেন না

(সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়কাল: ১৮জানুয়ারি, ১৯৭২)

সূত্র: (বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, দ্বিতীয় খণ্ড)

# আবদুল মতিন সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কয়েকটি প্রাসঙ্গিকবিষয়, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশান্স, ঢাকা

# ভাষান্তর: কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

# এই দেশ এই মাটি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বাণী, নির্দেশ ও সাক্ষাৎকার ( সম্পাদনা : আবুল মাল আবদুল মুহিত, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, মো. জাহিদ হোসেন)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস/এস

Best Electronics