Alexa গণমাধ্যমের চরিত্র গণতন্ত্রের ভাস্কর্য চিত্রিত করে

গণমাধ্যমের চরিত্র গণতন্ত্রের ভাস্কর্য চিত্রিত করে

প্রকাশিত: ১৫:৫৯ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:১২ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বাংলা ভাষায় অতিথি হিসেবে প্রবেশ করে অচিরে ঘরোয়া শব্দ বনে যাওয়া একটি শব্দ ‘মাস মিডিয়া’ এবং তার বাংলা প্রতিরূপ গণমাধ্যম যা আগে আমরা সংবাদমাধ্যম বলতে অভ্যস্ত ছিলাম।

 গণমাধ্যম হচ্ছে সংগৃহীত সকল ধরণের মাধ্যম, যা প্রযুক্তিগতভাবে গণযোগাযোগ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর আবার দুই ভাগ মুদ্রিত সম্প্রচার এবং ইলেকট্রনিক সম্প্রচার। প্রথম ভাগে সংবাদপত্র, পত্রিকা এবং দ্বিতীয় ভাগে কম্পিটার, ল্যাপটপ, ট্যাব বা মোবাইলের মাধ্যমে দৃষ্টিগোচর সম্প্রচার পড়ে। গণমাধ্যম সরকারি ও বেসরকারি উদ্যগের একটি মিশ্রণ। আজ সমাজ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের ভূমিকা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। মানুষের তথ্য জানার অধিকার এবং গণমাধ্যমের তথ্য জানানোর গভীর দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সামাজিক অঙ্গীকার নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। তাই আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পর সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গণতন্ত্রের এক অনুষঙ্গ মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বলা হয় গণতন্ত্রেরে জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। গণতন্ত্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক কোথায়? গণমাধ্যম কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, না গণতন্ত্রই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে? গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাখ্যা কী?

সামরিক বা স্বৈরশাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যম সবসময় ব্যবহূত হয় সামরিক বা স্বৈরশাসকের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রচারযন্ত্র হিসেবে। আবার চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্র, যেখানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বর্তমান—গণমাধ্যম সেখানে তীব্র নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকশালের সময় বাংলাদেশেও লক্ষ করেছি—চারটি রেখে বাকি সংবাদপত্র তখন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে তবে সেখানে গণমাধ্যমের একশভাগ স্বাধীনতা থাকতেই হবে। অর্থাৎ গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করবে, সরকারের ভুলচুক নিয়ে নিয়ত রিপোর্ট করবে, সেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সেই সাংবাদিকের নিরাপত্তা আবার সেই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। অনেকটা সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানের মতো, তারা সংসদে সরকারের কাজের সমালোচনা বা বিরোধিতা করবে, তারা যেন সংসদে তা সুষ্ঠুভাবে করতে পারে, সেই সুযোগ সরকারি দলকেই নিশ্চিত করতে হবে। ‘আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি কিন্তু তোমার কথা বলতে দেয়ার জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি’—ভলতেয়ারের এ উক্তিই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মৌল চেতনা; এ চেতনা আর এর চর্চার ভিতরেই লুক্কায়িত থাকে গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। 

কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর মালিকানায় যে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা পায় তা কিন্তু নারীশিক্ষা, নারী স্বাধীনতা, নির্বাচন, ধর্মীয় সমালোচনা কিংবা বহু ধর্মের চর্চার মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কাজেই বিষয়টি সরল না যে গণমাধ্যম গণতন্ত্রকে সংহত করে, অনেক সময় গণমাধ্যম গণতন্ত্রকে নস্যাৎও করে।  
‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’র ব্যাখ্যা চাইলেই কয়েকটি বিষয় হাত ধরাধরি করে ওঠে আসে। জন মিল্টন থেকে লক কিংবা ম্যাডিসন থেকে স্টুয়ার্ট মিল বাক স্বাধীনতার পক্ষে বিস্তর যুক্তির বিস্তার ঘটিয়েছেন। যে কারণে মত বা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সেই সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশরাজের সঙ্গে লড়াইয়ে মেতে উঠেছিলেন ইংরেজ কবি মিল্টন। তাদের উচ্চারণ ছিল এ রকম : জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা বলবার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। কিন্তু শর্তহীন বাক-স্বাধীনতার বিষয়টি আজও আমরা অর্জন করতে পারিনি।

তবে গণতন্ত্র যে গণমাধ্যম বিকাশে সহায়ক তার প্রমাণ নব্বইয়ের পরে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ব্যাপক বিকাশ। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে, ধরে নেওয়া হয়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে থাকে এবং তখন থেকেই সংখ্যার দিক থেকে গণমাধ্যমের বিস্ফোরণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রেস ও পাবলিকেশন অ্যাক্ট ১৯৭৩ সংশোধীনই এর প্রধান কারণ বলে স্বীকৃত। তথ্যমন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বাংলাদেশে ৪৪টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম, ৩২টি কমিউনিটি রেডিও, ১১৮৭টি দৈনিক পত্রিকা ও ১০০টিরও বেশিও অনলাইন পত্রিকার অনুমোদন রয়েছে। আর ৩০ টির মত টেলিভিশন বর্তমানে সম্প্রচার কার্যক্রমে রয়েছে।

তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে তাতে সংবাদ পরিবেশনের মান বাড়ছে কি? যদি শিরোনাম, ইন্ট্রো, বডি এবং কিভাবে সংবাদটি তথ্য সমৃদ্ধ করতে হয় কিংবা সংবাদটি শেষ করতে হয় সেটা সম্পর্কে যদি সংবাদকর্মীর স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তা হলে সেই সংবাদ পাঠকের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে কি? কাজেই ভুসিতে ভরে গেছে বাংলা গণমাধ্যম।

একটা উদাহরন দেই। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভুষিত এক কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে এক পত্রিকার নিবন্ধে লিখলেন রবীন্দ্রনাথের প্রথম জন্মদিন পালন করা হয় তার ৬৯ বছর বয়সে নেত্রকোনায় ১৯৩০ সালে। সঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি উল্লেখ করলেন। কিন্তু ফেসবুকে প্রশ্ন উঠল এই তথ্য ঠিক নয়। প্রথম পরিবারের আয়োজনে হয় ১৮৮৬ সালে ও পরিবারের বাইরে হয় ১৯১১ সালে। তথ্য প্রমাণ দিয়ে তুলে ধরা হলো। কবি নিশ্চুপ। কিন্তু সেই সংবাদকর্মীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যার হাত দিয়ে খবরটা প্রকাশিত হয়েছে। এটা তো সাধারণ জ্ঞানের অভাব কারন রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে তাকে নিয়ে মাতামাতি সারা বাংলা জুড়ে শুরু হয়েছিল। এমন ব্যক্তিকে ১৯৩০ সাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে তার জন্মদিন পালনের জন্যে?

এই মুহূর্তে স্বীকৃতি না দিলেও আরেকটি শক্তিশালী গণমাধ্যম হচ্ছে সোশাল মিডিয়া। কেননা সোশাল মিডিয়া মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, বলতে, লিখতে, আলোচনা করতে, কোনো বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া সোশাল মিডিয়া মানুষের মত প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
ইদানীংকালে সবচেয়ে বেশি আলোচনা, বিতর্ক আর অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে আইন তা হল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এর ৫৭ ধারা। আইনটি হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তি আইন ২০০৬  - ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ড। শুরুতে এই আইনটিকে অনেকে স্বাগত জানালেও কালক্রমে ব্যাপকহারে এটির স্বেচ্ছাচারীমূলক অপপ্রয়োগের অভিযোগ বাড়তে থাকায় এটি বাতিলের দাবি প্রবল হয়ে উঠেছে।
শেষ করি নিজের অভিজ্ঞতার একটা গল্প দিয়ে। একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম যার শুরু আমার লেখা একটি কবিতা দিয়ে-

শেখ হাসিনা, এক অগ্নিসদৃশ নারী
খাদের কিনারে দাড়িয়ে খোলা চুল
বিপদের বাস তার আঙুলের মাঝে
চোখ দুটি যেন অরন্য সংকুল...

পরেরদিন নিবন্ধ প্রকাশ হল কবিতাটি বাদে। সেই সংবাদপত্রের নিবন্ধের দায়িত্বপ্রাপ্তকে ধরলাম। সে বলল– আসলে কবিতাটা পড়ে মনে হল শেখ হাসিনাকে আপনি অল্পবয়েসী তরুণী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাই রিস্ক নিলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম– আপনি পুরো কবিতাটা পড়েছেন? শেখ হাসিনার কন্যা কিন্তু পড়েছেন। তিনি বললেন– না, আমি পড়িনি, কিন্তু মনে হলো...

এই ‘মনে হওয়া’ গণমাধ্যমের একটি অনিবার্য চরিত্র এবং এই ‘মনে হওয়া’ গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর