গণপরিবহনে ধর্ষণ-হত্যা: করণীয় কী!
Best Electronics

গণপরিবহনে ধর্ষণ-হত্যা: করণীয় কী!

প্রকাশিত: ১৫:২৪ ১০ মে ২০১৯   আপডেট: ১৫:২৮ ১০ মে ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

‘আবারো চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা’। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এক আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে গণপরিবহনে নারীর সম্ভ্রমহানী এবং হত্যা। 

২০১৭ সালের আগস্টে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর এনজিওকর্মী রূপা হত্যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সামনে আসে চলন্তবাসে ধর্ষণ-হত্যার মতো পৈশাচিক ঘটনা। রূপার ঘটনাটি আলোড়ন তুলেছিল দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের অন্তরে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছিল সারা দেশে। ন্যাক্কারজনক ওই ঘটনার ২০ মাসের মাথায় এবার কিশোরগঞ্জের কদিয়াদীতে তানিয়া নামের এক নার্সের ওপর ঘটল একই ধরনের পৈশাচিকতা। নিহতের পরিবার থেকেই উঠেছে এ অভিযোগ। বস্তুত চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনা কঠিন ও কুৎসিত এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের। অত্যন্ত উদ্বেগজনক এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর নিরাপত্তাও প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েই এখন ভাবতে হবে।

অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এর ভেতরে ও আশপাশে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণপরিবহন নেটওয়ার্ক কিছু একক ও অনন্য পরিবেশ (স্থান ও সময়) সৃষ্টি করে, যেখানে অপরাধীরা অপরিকল্পিত সুযোগ পায়। চলাচল উন্মুক্ত থাকায় এসব স্থানে অপরাধের ধরনে একটি ভিন্নমাত্রা তৈরি হয়। অপরাধ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তিনটি উপাদান তথা হাঁটা, অপেক্ষমাণ ও চলমান অবস্থায় মানুষ অপরাধের শিকার হতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ায় কম পথচারী ও নজরদারিসম্পন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকার রাস্তায় অনেক ধর্ষণ, হত্যা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। আর ১৯৯০-এর দশকের একটি গবেষণামতে, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬ শতাংশ অপরাধী তার বসবাসরত এলাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতের নাম করে অপরাধ করে। ভারতে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বহুল আলোচিত চলন্ত বাসে প্যারামেডিকেল ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হন। ইতিপূর্বে এরূপ ঘটনা ঘটে থাকলেও তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা ব্যাপক আলোচিত হয়নি। চলন্ত বাসেও এমন অপরাধ সংঘটিত হতে পারে জেনে মানুষ বিস্মিত হয়। ঠিক এক মাস পরই ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে পোশাক শ্রমিককে ধর্ষণের খবরটি প্রথম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী চাকরিজীবী বলেন, নিজেকে হয়রানির হাতে থেকে বাঁচিয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত একজন নারীর জন্য কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। তরুণদের তুলনায় চল্লিশোর্ধ পুরুষের মধ্যে নারী শরীর স্পর্শের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। শুধু ওই নারীই নন, গণপরিবহনে চলাচলকারী প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা অভিন্ন। অপরদিকে ২০১৮ সালে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর ৬৬ শতাংশ নারী ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ, পরিবহনে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত বাতি না থাকা এবং তদারকির অভাবে নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি হচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল। সমীক্ষার তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে। 

গণমাধ্যমে চোখ রাখলে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর রূপা নামে এনজিওকর্মী তরুণীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুরে লাশ ফেলে যায় চালক ও তার সহকারী। ২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে বাসের ভিতর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। পরে তুরাগ পরিবহনের বাসের চালক, হেলপারসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ৫ মে চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে বাসে চালক ও সহকারী যৌন হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই বাসের চালক এবং তার সহকারীকে ধরে পুলিশে দেন শিক্ষার্থীরা। ১০ মে ঢাকার শ্যামলীতে আরেকটি বাসে যৌন হয়রানির শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা চালকের সহকারীকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তখন যৌন হয়রানির আতঙ্ক রুখতে বাসে ৯৯৯ লিখে রাখা বাধ্যতামূলক করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। 

তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ সাপেক্ষে বলা যেতে পারে, গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত বিশেষত কর্মজীবী নারীদের রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ক্রমবর্ধমান হারেই বাড়ছে। আর অপরাধ ঘটছে মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক এবং নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে। অপরাধ সংঘটনস্থল সাধারণত স্টেশন থেকে দূরে, যেখানে পথচারী বা টহলরত পুলিশ কম থাকে। কর্মজীবীদের বেশিরভাগই তাদের অফিসিয়াল বা শিল্পাঞ্চল এলাকা থেকে একটু দূরে আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন। সাধারণত কর্মস্থলে নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া বা বাসস্থানে ফেরা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর চিন্তা থেকে নারীরা অনেকটাই উদ্বিগ্ন থাকে। পত্রপত্রিকার খবরে সংঘটিত সহিংসতার এমন সব নিষ্ঠুর বিবরণ উঠে আসে, যা আমাদের সামাজিক সুস্থতা এবং নারীর নিরাপত্তা দুটোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। 

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের সংবাদ। একটা ঘটনার জের শেষ না হতেই আরেকটি ঘটনা। একটি ঘটনা যেন আরেকটি ঘটনাকে উৎসাহিত করে। পুরোনো ঘটনাকে চাপা দিয়ে জন্ম হয় নতুন ঘটনার। ধর্ষকেরা সব এই সমাজেরই সদস্য। পরিবহনশ্রমিক থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, এমনকি জন্মদাতা বাবা পর্যন্ত, যে কেউ যেকোনো সময় মুখোশ খুলে ধর্ষক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আরও ভয়ানক ব্যাপার হলো সেই ধর্ষকেরও সমর্থক আছে। ফেসবুকে ধর্ষণের ঘটনার আলোচনায় কিছু কিছু ভদ্রবেশী পুরুষের মন্তব্য পড়েও আশঙ্কা জাগে। আসলে ধর্ষণ একটা পুরুষালি মানসিকতা, যার শিকার যেকোনো শরীরই হতে পারে- শিশু থেকে বৃদ্ধা কিংবা মানুষ অথবা পশু! ধর্ষকের চোখ যে সমাজে সর্বক্ষণ উদ্যত, সেখানে নারী কোথাও নিরাপদ হতে পারে কি? 

চলন্ত বাসে ধর্ষণ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার কথা বলেছেন। এগুলো হলো- ১. নারীদের বাসে একক যাত্রী হয়ে ভ্রমণ পরিহার; ২. ভ্রমণে সতর্ক থাকা; ৩. রাতে ভ্রমণে যাতায়াতের পথ, পরিবহন ও রাস্তার নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে নেয়া; ৪. প্রচলিত আইনে প্রদত্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার অধিকার যথাযথ প্রয়োগ [দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১০০(৩য়) অনুযায়ী, ধর্ষণের অভিপ্রায়ে আক্রমণকারীর প্রয়োজনে মৃত্যু ঘটানো যেতে পারে]; ৫. আক্রান্ত হলে সাহায্যের জন্য জোরে চিৎকার ও জাতীয় হেল্প সেন্টারে (৯৯৯) কল; ৬. রাতে সড়কে পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো; ৭. বাসের জানালায় স্বচ্ছ গ্লাস লাগানোর বিধান; ৮. অপরাধ সংঘটনকালীন তা প্রতিরোধে জনসাধারণের সক্রিয় ভ‚মিকা পালন; ৯. পরিবহন কর্মীদের নিয়ে অপরাধ বিষয়ক মাসিক সচেতনমূলক কর্মসূচি; ১০. অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত ও সম্ভাব্য অপরাধীদের কাছে তা প্রচার করা।  

পরিশেষে বলা দরকার, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অর্জন ঈর্ষণীয় হলেও নারীর প্রতি চলমান নির্যাতন ক্ষমতায়নে নারীর সব অর্জনের সার্বিক ফলাফলকে অর্থহীন করে তুলছে। এসব সার্বিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েই সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার শুধু গণপরিবহনই নয়, সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশের সার্বিক নারী নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে সরকারের নিরুদ্বেগ থাকার সুযোগ নেই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics