গণধর্ষণের শিকার হয়েও পায়নি ন্যায়বিচার অতঃপর নিজেই জ্বলে উঠলেন!

গণধর্ষণের শিকার হয়েও পায়নি ন্যায়বিচার অতঃপর নিজেই জ্বলে উঠলেন!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:১১ ১৫ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:১০ ১৫ মে ২০২০

ছবি: ফুলন দেবী

ছবি: ফুলন দেবী

বাংলার ইতিহাসে নারীরা নানা অধ্যায়জুড়ে জায়গা দখল করে আছে। নানা অবিচার আর অন্যায়ের প্রতিবাদে তারা হয়ে উঠেছেন বিখ্যাত। দস্যু রানি ফুলন দেবীর কথা নিশ্চয় জানেন সবাই! তার জীবনীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। 

একদিকে তিনি দুর্ধষ ডাকু সরদার। অন্যদিকে তিনি অসহায়ের ত্রাণকর্তা। ফুলন দেবী একজন ভারতীয় ডাকাত। যিনি পরবর্তীতে একজন সফল রাজনীতিবিদ হন। দস্যু রানি নামেই তিনি বেশি পরিচিত। 

ভারতের নিচু বর্ণ হিসেবে পরিচিত মাল্লা বর্ণের এক পরিবারে জন্ম নেন ফুলন। তিনি একাধিকবার পুরুষ নিষ্ঠুরতার বলি হয়েছিলেন। সমাজের আইন রক্ষক পুলিশের নিকট থেকেও ন্যায় পাননি। টানা ২৩ দিন ধরে গণধর্ষনের স্বীকার হয়েছিলেন ঠাকুরদের কাছে। যদিও ফুলন দেবী নিজমুখে কখনো এই গণধর্ষণের কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। 

তার আত্মজীবনীর লেখিকা মালা সেনকে বলেছেন, ওরা আমার সঙ্গে অনেক অন্যায়-অত্যাচার করেছে। এই একটি লাইনকেই অবশ্য ফুলন দেবীর সার্বিক অবস্থার প্রতীকীরূপ বলে বিবেচনা করা যায়। প্রতিশোধ নিতে হয়ে উঠেছিলেন ডাকাত। তবে বেশিরভাগ অপরাধ তিনি নির্যাতিত নারী ও বিশেষকরে নিম্ন শ্রেণির নারীকে ন্যায় প্রদানের জন্য সংঘঠিত করেছিলেন। 

২০ বছরের কম বয়সের এক নিম্ন শ্রেণির প্রায় নিরক্ষর কিশোরী সমগ্র ভারতে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। আমাদের আজকের লেখা এই নারীকে নিয়েই। যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আপনাকে রোমাঞ্চিত করবে। কেন তিনি সাধারণ আর দশজন নারীর মতো না হয়ে বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন পথ। জীবনকে সাজিয়েছিলেন ভিন্ন এক জগতের সঙ্গে। চলুন জেনে নেয়া যাক দস্যু রানি খ্যাত ফুলন দেবীর কঠিন জীবনের কাহিনী। 

১৯৬৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের জালৌন জেলার অন্তর্গত ঘোড়া কা পুরয়া নামক স্থানে ফুলন দেবীর জন্ম। এক মাল্লা পরিবারের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন ফুলন। তবে কন্যা শিশু হয়ে জন্ম নেয়ায় পরিবারের কেউই খুশি হতে পারেনি। মাল্লা সম্প্রদায়কে নিম্ন বর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সম্প্রদায়ের লোকেদের পেশা হচ্ছে নৌকা চালানো। এক কথায় যাকে বলা হয় মাঝি। 

ফুলন দেবীফুলনরা ছিলেন দুই বোন। দুই কন্যা সন্তান নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েন ফুলনের পিতা। একে তো কন্যা সন্তান তার পরিবারের ভরন পোষণে কোনো কাজেই আসবে না। তার উপর আবার বড় করতে আর বিয়ে দিতে অনেক খরচ। এসব কথা ভেবেই ফুলনের পিতা এক একর জমি জুড়ে নিমের বাগান করেন। তার ইচ্ছা ছিল যে এই মূল্যবান গাছ বিক্রয় করে দুই কন্যার বিয়ের যৌতুক দিবেন।

ফুলনের মাত্র ১১ বছর বয়সে তার ঠাকুরদার মৃত্যু হয়। এরপরই তার পিতার বড় ভাই ছলনায় পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী নিজেকে ঘোষণা করেন। মায়াদিন নামে ফুলনের একজন চাচাতো ভাই ছিল। মায়াদিন বাগানের গাছগুলো কেটে বিক্রি করা শুরু করে। ফুলন এর ঘোর বিরোধ করে মায়াদিনকে চোর বলে নিন্দা করে। হিংসার আশ্রয় নিয়েও মায়াদিন ফুলনের কোনো ক্ষতি করতে পারে নাই। অবশেষে মায়াদিন, পুট্টিলাল নামক এক ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তির সঙ্গে ফুলনের বিবাহের আয়োজন করে। সেই সময়ে ফুলনের বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। 

ফুলন তার নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, পুট্টিলাল একজন অসৎ চরিত্রের লোক। ফুলনের সঙ্গে তার স্বামী বলপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও শারীরিক অত্যাচার করত। অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে ফুলন বাবার বাড়িতে ফিরে যান। যদিও পরিবারের সদস্যরা তাকে পুনরায় স্বামীর বাড়িতে দিয়ে আসেন। অবশেষে তার স্বামীর কার্যকালাপের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি স্থায়ীভাবে নিজ পিতৃগৃহে ফিরে আসেন। গ্রাম্য সমাজে স্বামীর ঘর ছেড়ে আসা নারীদের কুনজরে দেখা হয়। ফুলনেও সমাজের চরিত্রে একজন অসৎ নারীর চরিত্রে পরিণত হন। 

এদিকে ফুলনের পিতার সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল হয়ে যাচ্ছিল। সে অপরাধীদের নামে অভিযোগ দায়ের করলেও আইন যুদ্ধে পরাজিত হন। চারদিকে তাকে নিয়ে নানা কুৎসা রটতে থাকে। ১৯৭৯ সনে মায়াদিন চুরির অভিযোগে ফুলনকে গ্রেফতার করান। ফুলনের তিনদিন কারাবাস হয়। কারাবাসে তিনি আইনরক্ষকের হাতেও গণধর্ষণের শিকার হন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে পরিবার ও গ্রাম থেকে বর্জন করা হয়।  

এরপর নাকি এক ডাকাতের দল ফুলন দেবীকে অপহরণ করেন। অন্য এক প্রবাদ মতে, তিনি স্বেচ্ছায় ডাকাতের দলে যোগদান করে। সেই ডাকাতের দলনেতা গুজ্জর সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। তার নাম ছিল বাবু গুজ্জর। তিনি ছিলেন নিষ্ঠুর ও কামুক স্বভাবের লোক। বাবু গুজ্জরের কামুক দৃষ্টি ফুলনের দেহের উপর পরে কিন্তু দ্বিতীয় দলনেতা বিক্রমের জন্য ফুলন রক্ষা পায়। একদিন রাত্রে দলনেতা বাবু গুজ্জর ফুলনকে ধর্ষণ করার প্রচেষ্টা করে। প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্রম মাল্লা বাবু গুজ্জরকে হত্যা করে ও নিজের দলের নেতা হয়। 

হাজারো মানুষের সামনে আত্মসমর্পন করেন ফুলনএকসময় ফুলন তার সম্মান রক্ষা করা বিক্রম মাল্লার প্রেমে পড়েন। অবশেষে বিক্রম ফুলনকে বিবাহ করে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। ডাকাত দলটি একবার ফুলনের প্রথম স্বামী পুট্টিলালের গ্রামে লুন্ঠন করে। ফুলন পুট্টিলালকে টেনে নিয়ে এসে জনসমক্ষে শাস্তি দেয় ও খচ্চরের পিঠে উল্টা করে বসিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে এসে বন্দুক দিয়ে প্রহার করে। প্রায় মৃত অবস্থায় পুট্টিলালকে ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় ফুলন কম বয়সী নারীদের যাতে পুরুষরা বিয়ে না করে তারই সাবধানবাণী স্বরূপ একটি পত্র রেখে যায়।

ফুলন দেবী বিক্রম মাল্লার কাছ থেকে বন্দুক চলানো প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ বসবাসকারী উচ্চ বর্ণের লোকদের গ্রামে লুন্ঠন, ভূস্বামীদের অপহরণ, রেল ডাকাতি ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযান চালিয়েছিল। প্রত্যেকবার অপরাধ করার পর ফুলন দুর্গাদেবীর মন্দির দর্শন করতেন ও তার প্রাণ রক্ষার জন্য দেবীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেন। চম্বল উপত্যকায় ছিল এই ডাকাতের দলের আস্তানা।

কথায় আছে গুরুরও গুরু থাকে। তেমনি বিক্রম মাল্লার অপরাধ জগতের গুরু ছিল শ্রী রাম নামক এক ঠাকুর সম্প্রদায়ের ডাকাত। শ্রী রাম ও তার ভাতৃ লালা রাম কারারুদ্ধ থাকার সময় বিক্রম তাদের জামিনের জন্য ৮০ হাজার টাকা জমা করেছিল। শ্রী রাম মুক্তি পাওয়ার পর বিক্রম তাকে দলের নেতৃত্বদানের আহ্বান জানায়। তবে এই কথায় দলের মাল্লা সম্প্রদায়ের সদস্যরা সম্মত ছিল না। ফলস্বরুপ দল দুইভাগে বিভক্ত হয়। ঠাকুর সম্প্রদায়ের সদস্যরা শ্রী রাম ও মাল্লা সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিক্রমের প্রতি অনুগামী ছিলেন। 

শ্রী রাম ছিলেন নিষ্ঠুর প্রকৃতির ব্যক্তি। শ্রী রাম বিক্রেমকে হত্যা করা সুযোগের সন্ধানে ছিল। একবার এক বিবাহ অনুষ্ঠানে বিক্রম নিমন্ত্রণ রক্ষা করা যাওয়ার সময়ে অপরিচিত ব্যক্তি বিক্রমকে গুলি মারে। বিক্রম আহত হয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বিক্রম সুস্থ হয়ে উঠে। কিছুদিন পর শ্রী রাম বিক্রমকে হত্যা করে ও ফুলনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

শ্রী রাম ফুলনকে উলঙ্গ প্রায় অবস্থায় এক গ্রামে নিয়ে যায়। সে গ্রামবাসীর সামনে ঘোষণা করে, ফুলন দেবী বিক্রমকে হত্যা করেছে। ফুলনকে শাস্তি দেয়ার জন্য গ্রামবাসীদের আদেশ করে। শাস্তিস্বরুপ প্রথম শ্রী রাম ফুলনকে ধর্ষণ করে। তারপর একেক করে বহু ঠাকুরে তার উপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন করে। তিন সপ্তাহের অধিক সময় তার উপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয়। ২৩ দিন পর ফুলন নিজেকে ঠাকুর সম্প্রদায়ের গ্রাম বেহমাই-এ নিজেকে আবিষ্কার করে। 

অবশেষে এক ব্রাহ্মণ ব্যক্তির সাহায্যে ফুলন গরু গাড়ি করে বেহমাই থেকে পলায়ন করেন। নির্যাতিত ফুলনের দুঃখের কাহিনী শুনে বাবা মুস্তাকিন নামক এক ডাকাতের নেতা তাকে নতুন একটি ডাকাতের দল গঠন করতে সাহায্য করেন। মান সিং ছিল তার দলের দ্বিতীয় নেতা। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ফুলন রাম ভ্রাতৃদ্বয়ের সন্ধান আরম্ভ করেন। অবশেষে সন্ধান হয়, যে শ্রী রাম বেহমাই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। 

ফুলনকে নির্যাতিত করার ১৭ মাস পর, ১৯৮১ সনের ১৪ ফেব্রয়ারী তারিখে ফুলন রাম ভাতৃদ্বয়কে হত্যা করার জন্য বেহমাই গ্রামে প্রবেশ করে। সেই সময়ে বেহমাইবাসীরা এক বিবাহে ব্যস্ত ছিল। ফুলন ও দলের সদস্যরা সম্পূর্ণ গ্রাম খুঁজেও ভ্রাতৃদ্বয়ের সন্ধান পাননি। ফুলন রামভ্রাতৃদ্বয়কে তার নিকট অর্পণ করার জন্য গ্রামবাসীকে আদেশ করেন। ফুলনের মতে গ্রামবাসীরা সেদিন তাদের লুকিয়ে রেখেছিল। ডাকাতের দল ক্রোধে গ্রামের ২২ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। যাদের বেশিরভাগ ব্যক্তি সেদিনের ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলনা। এটি কুখ্যাত বেহমাই হত্যাকাণ্ড বা বেহমাই গণহত্যা নামে আলোড়ন সৃষ্টি করে। 

বেহমাই হত্যাকাণ্ডের জন্য সেই সময়ের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ভি.পি সিং পদত্যাগ করার জন্য বাধ্য হয়েছিলেন। ফুলনদেবী জনপ্রিয় হয়ে উঠে দস্যু রানি নামে। যদিও তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল রাজ্য পুলিশ। ফুলন ছিলেন ডাকাত কিন্তু তার মন ছিল মায়া, মমতায় ভরা। সেই সময়ে উত্তর প্রদেশের শহরগুলোতে দূর্গাদেবীর বেশে ফুলনের মূর্তি বিক্রয় হয়েছিল। 

বেহমাই হত্যাকাণ্ড সমগ্র ভারতবর্ষকে কম্পিত করে দিয়েছিল। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে না পেরে তার উপর মানসিক চাপ দেয়া আরম্ভ করে। পুলিশ তার মাতা-পিতাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ হামলায় তার দলের বহুসংখ্যক সদস্যের মৃত্যু হয়। ফুলন দেবী আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। আত্মসমর্পণ করার সময় তিনি ভারত সরকারের নিকট কয়েকটি শর্ত রেখেছিলেন।শর্তসমূহ হচ্ছে: 

 

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এগিয়ে যান ফুলন> ফুলন ও তার অন্যান্য সঙ্গীরা কেবল মধ্যপ্রদেশে আত্মসমর্পণ করিবেন, বিচারের জন্য তাদের উত্তরপ্রদেশে নেওয়া হবেনা

> ফাঁসি দিতে পারিবেন না ও ৮ বৎসরের অধিক সময় কারাবাস হবেনা 

> সম্পর্কীয় ভাতৃ মায়াদিন অবৈধভাবে দখল করা জমি ফুলনের পিতাকে ফেরত দিতে হবে

> ফুলনের পিতৃ-মাতৃকে মধ্যপ্রদেশে সংস্থাপিত করতে হবে

> সরকার ফুলনের ভাতৃকে চাকুরি দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে 

সরকার তার সবকয়েকটি শর্তে সম্মত হয়। বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই বছর পর ১৯৮৩ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় আট হাজার মানুষের সামনে ফুলন আত্মসমর্পণ করেন। তখন ফুলনের পরনে ছিল একটি খাকী পোশাক। শরীরে ছিল একটি লাল চাদর। মাথায় ছিল একটি লাল কাপড় যা বেহমাই গ্রামে চলানো যৌন অত্যাচার ও নির্যাতনের পর প্রতিশোধের প্রতীক রূপে তিনি মাথায় বেঁধেছিলেন। তার কাঁধে ছিল একটি বন্দুক। 

হাত জোড় করে তিনি জনসম্মুখে নমস্কার জানান। দেবী দুর্গা ও মহাত্মা গান্ধীর ফটোর সন্মুখে তিনি বন্দুকটি রেখে আত্মসমর্পণ করেন। সরকার ফুলনের সঙ্গে করা শর্ত মেনে নিলেও একটি শর্ত ভঙ্গ করেছিল। বিনা বিচারে তাকে ১১ বছর কারাবাসে থাকতে হয়েছিল। অবশেষে ১৯৯৪ সনে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ফুলন। 

সে বছরই ফুলন দেবীর জীবনের উপর আধারিত ব্যাণ্ডিট কুইন নামক চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। তবে তাকে ভুল রূপে উপস্থাপন করার অভিযোগে ফুলন দেবী চলচ্চিত্রটি ভারতে নিষিদ্ধ করার দাবী করেন। অবশেষে প্রযোজক তাকে ৪০ হাজার পাউণ্ড প্রদান করায় তিনি অভিযোগ তুলে নেন। ছবিটি ফুলনকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ভাবে পরিচিত করে তুলেছিল। এর আগে ১৯৮৫ সালে অশোক রায়ের পরিচালনায় বাংলা চলচ্চিত্র ফুলন দেবী প্রকাশ পায়। 

আসামের ভ্রাম্যমান থিয়েটার অপ্সরা থিয়েটার ফুলন দেবীর আত্মসমর্পণের পর দস্যু রানি ফুলন দেবী নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। কোনো তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াই নাটকটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক বিষয়-বস্তুর উপর রচিত এইটিই ছিল ভ্রাম্যমান থিয়েটারের জনপ্রিয় নাটক। ফুলন দেবী অতি সামান্য লেখা-পড়া জানতেন। লেখক মেরী থেরেশ কানী ও পল রামবালীর সহযোগীতায় আই ফুলন দেবী: দ্য অটোবায়োগ্রাফী অব ইণ্ডিয়াস ব্যাণ্ডিট কুইন নামক শীর্ষক আত্মজীবনী প্রনয়ন করেন।

তাকে খুন করা হয়এই গ্রন্থটি ইংল্যান্ডের লিটল ব্রাউন এণ্ড কোম্পানি ১৯৯৬ সনে প্রথম প্রকাশ করে। এই দুইজন লেখকের সহযোগীতায় ফুলন দেবী প্রণয়ন করা অন্য আরেকটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম দ্য ব্যাণ্ডিট কুইন অব ইণ্ডিয়া; এন ওমেনস্ এমাজিং জার্নি ফ্রম প্রিজেন্ট টু ইন্টারনেশনেল লিজেন্ট। মালা সেনে লিখেছিলেন, ইণ্ডিয়াস ব্যাণ্ডিট কুইন একটি জীবনীমূলক গ্রন্থ। ফুলন দেবীর রাজনৈতিক জগতের গুরু ছিলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিং যাদব।

উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর সংসদীয় সমষ্টিতে বৃ্হৎ সংখ্যক ঠাকুর সম্প্রদায়ের ভোটার ছিল যদিও নিম্নবর্নের মাল্লা ও জুলাহা সম্প্রদায়ের সন্মিলিত সংখ্যার বিপরীতে ঠাকুর ভোটার ছিল কম। স্বাভাবিক ভাবে এই আসনটি দখল করার জন্য ১৯৯৬ সালে সমাজবাদী পার্টি ফুলনকে মির্জাপুর আসনের জন্য টিকেট প্রদান করে। ভারতীয় জনতা পার্টি ও বেহমাই হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়া ঠাকুরের পত্নীরা ঘোর বিরোধ করা সত্বেও তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হন। 

১৯৯৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফুলন পরাজিত হলেও ১৯৯৯ সনে মির্জাপুর লোকসভা নির্বাচনে তিনি পুনরায় আসন দখল করতে সক্ষম হন। ২০০১ সনের ২৫ জুলাই নয়া দিল্লীতে সংসদের বাইরে ফুলন দেবীকে হত্যা করা হয়। সেসময় তার দেহরক্ষীও আহত হয়। হত্যাকারীরা তাকে গুলি করে অটোরিক্সায় উঠে পালিয়ে যায়। হত্যাকারীরা ছিলেন শ্বের সিং রাণা, ধীরাজ রাণা ও রাজবীর। পরে শ্বের সিং রাণা দেরাদুনে আত্মসমর্পণ করেন। হত্যাকারীরা প্রকাশ করেন, বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এই হত্যা করা হয়েছে। 

এভাবেই ইতি ঘটে এক দস্যু নারীর জীবনের। তবে তিনি আজো ইতিহাসের পাতায় বেঁচে আছেন। তার জীবনী অনুপ্রেরণা যোগাবে হেরে যাওয়া মানুষদের। সেই সব নারীদের, যারা জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে নতুন করে বাঁচার আশা দেখাবে ফুলন দেবী।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস