খয়ের, গুড় ও ডিমের কুসুমে তৈরি হাজারটি দুয়ার!

খয়ের, গুড় ও ডিমের কুসুমে তৈরি হাজারটি দুয়ার!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৩২ ১১ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গায়ে হাজারটি দরজা নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদটি। ভাবতে পারেন, একটি প্রাসাদের মোট দরজা সংখ্যা কী-না এক হাজারটি। তবে রহস্যের বিষয় হলো এর মধ্যে রয়েছে নকল দরজাও। 

আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এসব দরজা তৈরি করতে গাঁথুনির কাজে ইট-চুন-সুরকির সঙ্গে খয়ের জল, আখের গুড়, ডিমের কুসুম ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশালাকার তিনতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদটিতে আসল-নকল মিলে হাজারটি দরজা থাকায় লোকমুখে এর নামকরণ হয় ‘হাজার দুয়ারী’। 

মুর্শিদাবাদে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হাজার দুয়ারী প্রাসাদ, যা এখন মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত এবং ‘হাজার দুয়ারী প্যালেস মিউজিয়াম’ নামে খ্যাত। এটি নির্মিত হয় নবাব হুমায়ূন জাঁ’র আমলে। তিনি মীরজাফর প্রতিষ্ঠিত নবাবীর অষ্টম উত্তরাধিকারী এবং বংশধর হিসেবে পঞ্চম। হাজার দুয়ারী প্রাসাদে ঢুকতেই ঐতিহাসিক এক কামান স্বাগত জানায় সবাইকে! ১৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার জনার্দন কর্মকার এটি বানিয়েছিলেন। এর দু’পাশে রয়েছে মনোরম ফুলের বাগান। এই প্রাসাদের আরেক বিশেষত্ব হলো রানী ভিক্টোরিয়ার উপহার দেয়া ১০১ বাতির একটি সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। 

মেঘলা দিনে হাজার দুয়ারীহাজার দুয়ারের রহস্য

হাজারটি দরজা থাকার কারণেই বিখ্যাত এই প্রাসাদের নাম হাজার দুয়ারী। অবশ্য তার মধ্যে আসল দরজার সংখ্যা ৯০০টি। বাকি ১০০টিই নকল দরজা। আসল দরজা আর নকল দরজার মধ্যে পার্থক্য করা দুষ্কর। আকৃতিগতভাবে বা দর্শনগতভাবে একই রকম শুধু পার্থক্য এই যে নকল দরজাগুলো খোলা যায় না।  এগুলো তৈরির কারণ ছিল, যাতে কোনো অবাঞ্ছিত ব্যক্তি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে, তার সত্য ও মিথ্যা দরজার নিখুঁত সংখ্যার সঙ্গে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শ্রুতি অনুযায়ী, এই নকল দরজাগুলোর কারণেই না-কি প্রাসাদে অচেনা কেউ প্রবেশ করলেই প্রহরীরা তাদেরকে পালানোর আগেই ধরে ফেলত।

হাজার দুয়ারী প্যালেসের ইতিহাস

১৮২৯ সালের ২৯ আগস্ট বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উপস্থিতিতে স্থপতি কর্ণেল ম্যাকলিয়ড ডানকানের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় এই প্রাসাদের কাজ। গ্রিসিয়াম ডোরিক স্থাপত্যের এই সুরম্য প্রাসাদের নির্মাণ কাজ দীর্ঘ আট বছরে সম্পন্ন হয়। তৎকালীন সময় এর নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ১৮ লাখ টাকা। প্রাসাদের সামনে সুরম্য উদ্যান ও বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের অন্য প্রান্তে বিশাল ইমামবারা। পূর্বে এ স্থানে সিরাজ-উদ-দৌলা নির্মিত কাঠের ইমামবারা অবস্থিত ছিল। ১৮৪৬ সালে অগ্নিকাণ্ডে সেটি ভস্মিভূত হয়ে গেলে পরবর্তী সালে হুমায়ূন জাঁ’র পুত্র ফেরাদুন জাঁ বর্তমান ইমামবারাটি নির্মাণ করেন। এটি এ উপমহাদেশের বৃহত্তম ইমামবারা। 

হাজার দুয়ারী ও ইমামবারার মধ্যস্থলে সিরাজ নির্মিত মদিনা মসজিদ। সিরাজের এই একটি মাত্র কীর্তিই এখানে বর্তমান। মদিনার কারবালা প্রান্তরের মাটি এনে এর ভিত তৈরি করা হয়েছিল। আকারে ছোট হলেও এক সময় মসজিদটি বহুমূল্য রত্ন খচিত অপরূপ কারুকার্যময় দরজা-জানালায় শোভিত ছিল। এখন সে দরজা-জানালা আর নেই। মদিনা মসজিদের সামনে ঢাকার বিখ্যাত জনার্দন কর্মকারের তৈরি ১৮ফুট দৈর্ঘ্য ও ২২ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট বিশালাকার ‘বাচ্চাওয়ালী তোপ’।

ঐতিহাসিক এক নিদর্শন
 প্যালেসের বিভিন্ন তলার বিবরণ

প্যালেস মিউজিয়ামের এক তলার মধ্যভাগে রয়েছে বিখ্যাত অস্ত্রাগার। ইতিহাস খ্যাত রাজা-বাদশাহদের ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে নাদিরশাহের বর্ম ও মোচাকৃতি ফলাযুক্ত বল্লম। শেরশাহের লৌহ শিরস্ত্রাণ, নবাব আলীবর্দির তলোয়ার, সিরাজের ব্যবহৃত তরবারি ও সাত নলা বন্দুক, ফার্সি লিপিযুক্ত গন্ডারের চামড়ার ঢাল। সংরক্ষিত আছে লৌহ নির্মিত কয়েকটি কামান ও নৌকায় ব্যবহারের উপযোগী পিতল নির্মিত ৭টি ছোট আকৃতির কামান। চল্লিশটি ছোটবড় পিস্তলের মধ্যে একটি রুপার বাটযুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতি পিস্তল, বিভিন্ন ধরণের বন্দুক, একটি স্টিক বন্দুক। 

অসংখ্য তরবারি ও ছোরা যার মধ্যে অনেকগুলো হাতির দাঁত ও রুপার বাটযুক্ত। রয়েছে ইংরেজ, ফরাসি ও মোগলদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র। পলাশীর যুদ্ধে যে কামান বিস্ফোরিত হয়ে সিরাজের বিশ্বস্ত সেনাপতি মিরমদন নিহত হয়েছিলেন, সে কামানটিও রয়েছে। এছাড়াও অকৃতজ্ঞ মোহাম্মদী বেগ যে ছোরা দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করেছিল সেটিও সযত্নে রক্ষিত আছে হাজার দুয়ারীর সংগ্রহশালায়। 

দ্বিতলে আর্ট গ্যালারিতে আছে বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা মুর্শিদকুলী খাঁ থেকে ওয়ারেস আলী মির্জা পর্যন্ত ১৮ জন নবাব, ১১ জন দেওয়ান ও নবাবের তৈলচিত্র। হার্ডসনের আঁকা লর্ড কর্নওয়ালিসের ছবি, দরবারে নিযুক্ত কয়েকজন বৃটিশ প্রতিনিধি ও কয়েকজন নবাবের শৈশবের ছবি। রয়েছে জন মার্শালের আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘বেরিয়েল অব স্যার জন মুর’। ইংরেজ-ফরাসি যুদ্ধে নিহত জন মুরকে রাতের বেলা চন্দ্রালোকে সমাহিত করার দৃশ্যে আলোছায়ার অপূর্ব সমন্বয়ে চিত্রিত মোহময় জ্যোৎস্না দর্শক দৃষ্টিকে মোহাবিষ্ট করে তোলে। 

হাজার দুয়ারীর প্রাঙ্গণপৃথিবীর মাত্র দু’টি স্থানে সংরক্ষিত এই ছবির মধ্যে এটি দ্বিতীয়। অন্যটি বৃটিশ মিউজিয়ামে। ‘সেন্টমেরী’র একটি অনন্য সুন্দর তৈলচিত্রের চিরনতুন অংকন শৈলী দর্শকদের আকৃষ্ট করে। কিং উইলিয়াম দ্য ফোর্থের একটি পোর্টেট যা রাজা স্বয়ং উপহার হিসাবে নবাব হুমায়ূন জাঁ’কে প্রদান করেছিলেন সেটিও সংরক্ষিত আছে। এছাড়া ভ্যান ডিউক, গিরীজা শঙ্কর ও নবাব সাদেক আলী মীর্জার কয়েকটি চিত্রকর্ম রয়েছে।

প্যালেস মিউজিয়ামের লাইব্রেরিটি অনেক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি গ্রন্থে সমৃদ্ধ। প্রদর্শনের জন্য যেগুলো উন্মুক্ত আছে তার মধ্যে বাগদাদের বিখ্যাত হারুন-আল-রশিদের হস্তলিখিত এবং নকশা শোভিত কোরআন, আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের মূল পান্ডুলিপি, প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো কোরআন শরীফ উল্লেখযোগ্য। মাত্র দুই ইঞ্চি সাইজের একটি হস্তলিখিত কোরআন শরীফও এখানে দেখা যায়। সাড়ে চার ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থের বিশালাকার একটি অ্যালবাম রয়েছে, যার ওজন প্রায় ২০ কেজি। সংরক্ষিত আছে ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র, অনুমোদনপত্র, নিয়োগপত্র, রাজকীয় ফরমান, দলিল, রাজা-বাদশাহের সীলমোহর ও মনোগ্রাম। 

দূর থেকে হাজার দুয়ারীর সৌন্দর্য
 দ্বিতলে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে অংশটি সেটি দরবার। সুরম্য দরবার হলটি গোলাকার। চারদিকে চারটি দরজা। দুই দরজার মাঝখানে মার্বেল পাথরের দুটি বিশালাকৃতির সুদৃশ্য মোমবাতি স্ট্যান্ড। ৮০ ফুট উচ্চতার গোলাকৃতি ছাদ গ্রিক শিল্পকলায় সজ্জিত। ছাদের কেন্দ্রে ঝুলানো ১০১টি বাতিবিশিষ্ট ভিক্টোরিয়ান ঝাড়। দরবারের দক্ষিণ দিকে মার্বেল পাথরের পাটাতনের ওপর সোনার কারুকাজ বিশিষ্ট রৌপ্য নির্মিত সিংহাসন। ওপরে বিশাল রূপার ছাতা এবং সামনে রৌপ্য নির্মিত আলবোলা। দেয়ালে বৃটিশ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে নবাব হুমায়ূন জাঁয়ের দরবার পরিচালনার একটি সুবৃহৎ তৈলচিত্র। 

দেয়ালের ওপরের দিকে চারটি ঝরোকা। ত্রিতলে অবস্থিত বেগম মহলের নারীদের দরবার প্রত্যক্ষ করার জন্য এ ব্যবস্থা। রাজকীয় প্রদর্শনে রয়েছে সম্রাট শাহজাহানের ব্যবহৃত হস্তিদন্ত নির্মিত তাঞ্জাম। সম্রাট ঔরঙ্গজেব কন্যা জেবুন্নেছার রৌপনির্মিত রাজকীয় পালকি, নবাব ফেরাদুন জাঁয়ের হাতির দাঁতের পালকি, দু’টি রূপা   এবং দু’টি হাতির দাঁতের তৈরি সুদৃশ্য হাওদা (হাতির পিঠে বসার আসন)। এছাড়া স্ফটিক ও পাথরের ভাস্কর্য, হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম, খাদ্যে বিষক্রিয়া যাচাইয়ের টেস্টিং প্লেট, রাজকীয় পোশাকসহ অনেক শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। একটি আর্শ্চয্য আয়না এমনভাবে স্থাপিত আছে যার সামনে দু’তিন জন দাঁড়ালে নিজের প্রতিবিম্বটি নিজে কেবল দেখা যায় না।

ফুলের বাগান যেন হাজার দুয়ারীর সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেমিরজাফরের বংশধর কর্তৃক এই হাজার দুয়ারী প্রতিষ্ঠিত বলে হয়তো এর রাজকীয় জৌলুস ও জাঁকজমক দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এর কোনো গৌরবের আবেগ প্রথমদিকে হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। তবে অভ্যন্তরের অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন, চিত্রকর্ম, শিল্পসম্ভারের সমৃদ্ধ সংগ্রহের জন্য এ মিউজিয়ামটি গর্ব করতেই পারে। প্রাসাদটির ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে ইমামবারা। প্রতিবছর মহরমের শেষদিনে এটি খোলা হয়। 

হাজার দুয়ারীর আশেপাশে রয়েছে আরো বিভিন্ন ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান, যেমন কাটরা মসজিদ, মতিঝিল পার্ক, রাধামাধব মন্দির, কিরিটেস্বরি মন্দির, কাঠগোলা বাগান, ওয়াসেফ মঞ্জিল, আজিমুননেশার সমাধি, নসিপুর রাজবাড়ী, খোশবাগ, কদমশরীফ প্রভৃতি। সুন্দর মনোরম মনোমুগ্ধকর ঐতিহাসিক এই হাজার দুয়ারী  প্রাসাদ ও অন্যন্য প্রসিদ্ধ স্থানগুলো দেখার জন্য প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বহু দর্শক ও পর্যটক এখানে ভিড় জমায়।

হাজার দুয়ারীর ভেতরে মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া নিষেধ। কারো কাছে এগুলো থাকলে সরকারিভাবে টোকেন দিয়ে জমা নেয়া হয়। হাজার দুয়ারী শুক্রবার বন্ধ থাকে। প্রবেশ মূল্য ১০ রুপি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস