Alexa খোঁজ রাখুন সন্তানের, আপনার অজান্তেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে না তো?

খোঁজ রাখুন সন্তানের, আপনার অজান্তেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে না তো?

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৩৫ ২৩ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৯:২৭ ২৩ আগস্ট ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

বর্তমানে অধিকাংশ অভিভাবকই কর্মজীবী। কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানদের জন্য বাড়তি সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নিজেদের অজান্তেই সন্তানের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব। এই ক্ষতিকর দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে সন্তানের মানসিক গঠন ও গড়নে। আবার দু’একটি চড়-থাপ্পড় না খেলে নাকি সন্তান মানুষ হয় না- এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত শাসনের ফলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। 

মার্কিন সাইকোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলায় অনেক বেশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় অর্থাৎ মার খায়, তারা বড় হয়ে কোনো না কোনোভাবে তার নেতিবাচক প্রকাশ ঘটায়। কেননা তাদের সুষ্ঠু মানসিকতার বিকাশ ঘটে না। তাদের মনের অগোচরে ক্ষোভ জন্মায়। জেদ কাজ করে। বড় হয়ে তা ক্রোধে রূপ নেয়। 

অন্যদিকে, যারা সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে শুধু পড়ালেখা কর রে... করে চিৎকার করেন তাদের সন্তানেরাও বেশি বিপথে পা বাড়ায়। কারণ সন্তান গল্প করার মানুষ পায় না, ফলে বিভিন্ন সঙ্গী খুঁজতে থাকে। এভাবেই খারাপ সঙ্গ পেয়ে এক সময় বিপথে যায়। সম্প্রতি, জয়নাল আবেদিন নামক এক ব্যক্তির দেয়া ফেসবুক পোস্ট থেকে মিললো তেমনই এক সত্য ঘটনা। যা প্রত্যেক বাবা মায়ের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়! গল্প হলেও যে সত্যটি সামনে এসেছে তা ঐশীর ঘটনাটির সঙ্গে মিলে যেতে পারে। এরপরেই আপনারা বুঝবেন, শিক্ষিত অভিভাবকদের দোষ না-কি বখে যাওয়া সন্তানের? 

১৫ থেকে ১৬ বছর হবে তার বয়স। এসএসসি পরীক্ষার্থী। নাম নয়ন। তার বাসা মিরপুর বারো নম্বরে। মা ব্যাংক অফিসার। বাবা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। মা-বাবার একমাত্র ছেলে নয়ন। সাক্ষাতের শুরুতেই সে তার শিক্ষককে বলল, দেখেন ভাই- আপনাকে প্রথমেই কিছু কথা বলি। আপনি আমাকে পড়াতে আসছেন, পড়িয়ে  চলে যাবেন। আমাকে পড়তে প্রেশার দেবেন না। তাতে কোনো লাভ নেই। আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না, আমিও আপনাকে বিরক্ত করব না। হিসাব সোজা।

তুমি পড়তে চাও না কেন? শিক্ষকের এমন প্রশ্নের উত্তরে সে তার হাতের ব্রেসলেট নাড়াতে নাড়াতে বলল, কারণ পড়তে ভালো লাগে না। সোজা হিসাব। দেখো, ভালো লাগে না বলে সব কাজ করা যাবে না এমন না। এত জ্যাম ঠেলে কষ্ট করে আমার আসতেও কিন্তু ভালো লাগেনি। তারপরও কেন আসলাম? কারণ আসতেই হবে। আমার টাকার দরকার। তোমার পড়তেই হবে, কারণ তোমার পড়ার দরকার, শিক্ষক বললেন। ছাত্র মুখ কুঁচকে বলল, ভাই আরেকটা কথা বলি? আমাকে জ্ঞান দেবেন না। বাবা মা বহু জ্ঞান দিয়েছে। ঘ্যান ঘ্যান ভালো লাগে না। আপনি টাকার জন্য আসছেন না? চুপচাপ অংক করিয়ে টাকা নিয়ে যান। আপনাকে তো আমি বিরক্ত করছি না।
হিসাব সোজা।

পরের দিন যথারীতি ছাত্রের হাতে ফোন, ব্রেসলেট এবং শর্টস পরে এসে বসল। শিক্ষক অংক করাচ্ছে, সে ফেসবুকিং করছে। দুইজন দুই জগতে। অংক করা বাদ দিয়ে শিক্ষক বলল, কী করো? সে উৎসাহের সাথে বলল, ফেসবুক চালাই। একটা পিক দিসি আজ। ১২২ টা লাইক পড়েছে।
- তাই নাকি?
- হাঁ। আপনার আইডি আছে?
- আছে।
- দেন তো।
শিক্ষকের আইডিতে ঢুকেই প্রোফাইল পিকচারে ৭ টি লাইক দেখে ছাত্রের সে কী হাসি। হাসতে হাসতে সে বলল, মাত্র ৭ টা লাইক? চিন্তা করবেন না, আপনাকে প্রমোট দেব। একদিনে লাইক ৫০ এ চলে যাবে। উৎসাহ দেখিয়ে শিক্ষক বলল, আচ্ছা দিও তো। এবার তাহলে অংকটা দেখো। ছাত্র প্রথমবারের মতো একটু দ্রবীভূত হলো। তার ভেতর থেকে খানিকটা কাঠিন্য দূর হলো। তবে তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। মাঝে মধ্যে খাতার দিকে তাকালেও তার চোখ মোবাইলেই পড়ে রইল। শিক্ষক আবার অংক করা বাদ দিয়ে ছাত্রের সঙ্গে গল্প করা শুরু করল। 

ছাত্র এবার অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে শিক্ষকের দিকে তাকাল। টিচার গল্প শুনতে চাইবে এটা অস্বাভাবিক কিছু না। সে তার প্রেমের গল্প শুরু করতে লাগল। ক্লাস টেনের একটা ছেলে প্রেম করছে, প্রেমিকা নিয়ে ঘুরছে এটা উপাদেয় গল্প না। সে কিছু সময় পর মুখ কঠিন করে শিক্ষককে বলল, আপনি কিন্তু আমার গল্প শুনছেন না। আপনি আমাকে ইনসাল্ট করছেন। আমার কথার সময় ফোন টিপছেন। শিক্ষক এবার হাসিমুখে বলল, একটু আগে আমি কথা বলার সময় তুমি ফেসবুকিং করেছো। আমাকে ইনসাল্ট করোনি? সে একটু হতভম্ব হয়ে বলল, ওইটা তো পড়া, এইটা গল্প। শিক্ষক বলল, দুইটাই অপমান। ছাত্র এবার শিক্ষককে সরি বলল।

এভাবেই তাদের ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক চলল আরো দুই দিন। পরের দিন শিক্ষক তাকে অর্ধেক সময় ধরে গল্প শোনাবে ও বাকি অর্ধেক সময় সে অংক দেখবে বলে ছাত্রের কাছে প্রস্তাব রাখে। সানন্দে রাজী হয়ে যায় ছাত্র। তার পেটে অজস্র গল্প। তার শ্রোতা দরকার। তবে গল্পের এ পর্যায়ে ছাত্রের মা বাগড়া দিলেন। ভদ্রমহিলা অদ্ভূতভাবে অংকের বাইরে কিছু বললেই শুনতে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করেন, ‘এত গল্প কিসের?’

কিছু দিন পরের ঘটনা। পড়ানোর ফাঁকে শিক্ষক বললেন, নয়ন তোমার জীবনের ইচ্ছা কী? সে বলল, ভাই জীবনের ইচ্ছা সোজা। একটা গাড়ি থাকবে সঙ্গে চারটি মেয়ে থাকবে। শিক্ষক তো অবাক! চারটা মেয়ে? হ্যাঁ, চার সিটে চারটি। সারা দিন মেয়েগুলো নিয়ে ঘুরবো, ইচ্ছামতো টাকা উড়াবো। শিক্ষক কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ওড়ানোর টাকা আর গাড়ির টাকা কে দেবে? সহজ উত্তর, বাবা মা দেবে। তাদের কি টাকার অভাব? আমাকে না দিলে তারা কাকে দিবে? শিক্ষক পরক্ষণে বলল, আর যদি না দেয়?

ছেলেটা এবার মুখ কঠিন করে, ভালো মুখে না দিলে পেটে ছুরি ঢুকাবো। জবাই করব দুইজনকে। হিসাব সোজা। জীবনটা তেঁতো করে দিচ্ছে। শিক্ষক বলল, তুমি সিরিয়াস? উত্তর, খোদার কসম। আমাকে কম প্যারা দেয়নি। জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। এবার শিক্ষক কুঁকড়ে উঠলেন। একটি বাচ্চা ছেলে বাবামাকে খুন করবে! সে খোদার কসম বলে ডিটারমাইন্ড। এটা কি সাময়িক ফ্যান্টাসী নাকি বহু দিনের ইচ্ছে? একবার তিনি মনে করলেনলো অভিভাবককে জানাবেন। পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। 

যাই হোক, প্রথম পনেরো দিনে শিক্ষক ছাত্রকে কিছুই শেখাতে পারেনি। ২০ দিনের মাথায় একদিন পিথাগোরাসের উপপাদ্য করার আগে শিক্ষক তাকে বলল, তুমি এই উপপাদ্য একবার দেখিয়ে দেয়ার পর যদি করতে পারো তবে তোমার জন্য গিফট আছে। সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, যদি করতে পারি? জীবনেও পারবা না। আমি ছাত্র চিনি। ছেলেটি বলে উঠলো- আমি পারবোই। সে প্রথমবারের মতো খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখল। তারপর সত্যি সত্যিই নিজে নিজে করলো। তার মুখে বিজয়ীর হাসি, শিক্ষকের মুখে তার চেয়ে বড় হাসি। তাকে লাইনে আনার প্রাথমিক ধাপ সফল হলো শিক্ষকের।

ছাত্র হিসেবে যে সে চরম মেধাবী, কেবল মনোযোগ দিলে ইতিহাস করে ফেলবে এমন উদ্বৃতি দিলো শিক্ষক। সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যপটে আগমন ঘটল ছাত্রের মায়ের। তিনি চোখ মুখ উজ্জ্বল করে বললেন, দেখছেন স্যার! আমার ছেলে কত ব্রিলিয়ান্ট! দেখছেন স্যার? শিক্ষক বুঝতে পারলেন মহিলা কোনোভাবে কান পেতে তাদের কথা শোনেন। তিনি মিনিট পাঁচের মধ্যেই তার ছেলে যে কতো লক্ষ্মী তার ফিরিস্তি দিলেন। উল্টো ফিরিস্তি না শুনিয়ে শিক্ষক কল্পনায় দেখলেন টাকার কারণে ছেলে তার মায়ের পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

পরের দিন থেকে অবশ্য শিক্ষক তার ছাত্রকে ফোন হাতে রাখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হলেন। তিনি শর্ত দিলেন ফোনের বিনিময়ে পড়ার শেষ অর্ধেক সময় তার সঙ্গে গল্প করতে হবে। পড়া শেষ করে গল্প শুরু করতেই আবারো গার্ডিয়ানের হুংকার। পড়া বাদ দিয়ে এত গল্প কিসের নয়ন! এক্সাম না সামনে? পড়ো। ছাত্র চাপা স্বরে বলল, বলেন ভাইয়া, এই রকম মাকে জানে মারা উচিত না? শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাস শেষ হয়ে গেল। ফোন মারফত শিক্ষক জানতে পারলেন তার  চাকরি নট। সম্ভাব্য কারণ, পড়ালেখার চেয়ে গল্প বেশি হয়ে যায়! তারা পড়ানোর জন্য টিচার রাখেন, গল্পের জন্য নয়।

একজন সরকারি ব্যাংক অফিসার মহিলা খবরও জানেন না তার ছেলে কত ভয়ংকর সাইকোলজি নিয়ে ঘুরছে। এই ছেলের মাথা গাড়ি, চারপাশে চারটা মেয়ে ঢুকে আছে; তিনি বলতে পারেন না। ছেলে যে টাকার জন্য তার পেটে ছুরি ঢোকানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সে ব্যাপারেও বেখবর। তার ছেলের জীবন কত সোজা হিসাবে চলছে সেটা যদি জানতেন! যদি একটু জানতেন তবে গল্পের ফাঁকে বাগড়া দিতে আর শেষমেষ চাকরি নট করার আগে একটু হলেও ভাবতেন।

দোষটা তবে কার? একটি কিশোর ছেলের নাকি শিক্ষিত মা-বাবার? ছেলেকে খাইয়েছেন। দামি ফোন কিনে দিয়েছেন, বাই সাইকেল দিয়েছেন। প্রতিদিন হাত খরচের জন্য কয়েকশ’ টাকা দান করেন। কয়েক ডজন টিচার রেখেছেন।

গর্ব ভরে এই খবর শিক্ষককে দিয়েছেন। ছেলের মানসিকতা বা জীবন দর্শন সম্পর্কে জানার দরকার বোধ করেননি মা। ছেলের গল্প, তার ভেতরের মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করেন নি।

বর্তমানে সবাই কমবেশি কর্মব্যস্ত। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় না দেয়ার ফলশ্রুতিতে তারা বখে যাচ্ছে, বিপথে চলছে। সন্তানের সব আবদার মেটালেই ভালো বাবা-মা হওয়া যায় না। টাকা পয়সা সব না। ফোন-বাইক-দামি কলেজ-দামি টিউটর সব না। এসব দিয়ে একটি শিশু-কিশোর-কিশোরীর কোনো উপকার আপনি করছেন না। এতে করে সন্তানেরা আরো বেশি জেদি হয়ে ওঠছে। কারণ সব জিনিস চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়ার অভ্যাস কখনো যায় না তাদের মন থেকে। এদিকে চাহিদাও বাড়তে থাকে।

উচ্চ মাধ্যমিকের একটা মেয়ের গল্প। মেয়েটা আত্মহত্যা করেছিলো। কারণ পরীক্ষার আগে তার বাবা তাকে রেসিং কার কিনে দেয়নি। তার অলরেডি তিন চারটা কার আছে। নতুন একটা রেসিং কার দরকার। তার মনে রেসিং কারের দুঃখ। এই মেয়ের আত্মহত্যার জন্য তবে দায়ী কে বলুন? সে নাকি তার বাবা মা?

আপনি সন্তানের সঙ্গে বসুন, গল্প করুন। তার ভেতরের সত্ত্বাটাকে বের করে আনার চেষ্টা করুন। তার বেস্ট ফ্রেন্ড হতে চেষ্টা করুন। তার দিনের কর্মকাণ্ডকের বর্ণনা শুনুন। জেরা হিসেবে নয়, গল্প হিসেবে। সেখান থেকে কৌশলে ভালো খারাপ আলাদা করে বুঝিয়ে দিন। তার চাহিদা পূরণের চেয়ে তার সুস্থ ইচ্ছে পূরণকে প্রাধান্য দিন। তার ভেতর অবশ্যই কিছু না কিছু ভালো আছে। সেটাকে হাইলাইট করে তাকে উৎসাহ দিন। তার প্রশংসা করুন।

একটা শিশুকে কোনটা ভালো কোনটা খারাপ বোঝানোর আগে নিজে বুঝুন সত্যিই আপনার সন্তানের জন্য কোনটা ভালো কোনটা খারাপ। শিশু-সাইকোলজি, কিশোর-সাইকোলজি অনেক বড় বিস্তৃত একটা ব্যাপার। নিজে বুঝতে না পারেন, কারো সাহায্য নিন। নিজের গর্ভে এনে যাকে নিয়ে গর্ব করেছেন আপনার নিজের অজান্তে সে ঐশী হয়ে যাচ্ছে না তো?

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস