খুলুকে আজিম বা উত্তম চরিত্রের পরিচয়

খুলুকে আজিম বা উত্তম চরিত্রের পরিচয়

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪২ ৬ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২১:৪৪ ৬ জুলাই ২০২০

‘আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত এহসানকারীদের খুব পছন্দ করেন।’

‘আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত এহসানকারীদের খুব পছন্দ করেন।’

খুলুকে আজিম বা উত্তম চরিত্র- সর্বোচ্চ চরিত্র সনদ। যা ছিল আমাদের নবী মুহাম্মাদে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। সাধারণ মুসলমানদেরকে খুলুকে আজিমের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কিন্তু যদি হুকুম দেয়া হত, তাহলে খুলুকে আজিম অর্জন করা আমাদের সবার প্রতি ফরজ হয়ে যেত। 

তাই আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ না দিয়ে বলেছেন, ‘আমি এদের পছন্দ করি ...। কাদের পছন্দ করেন? এমন সব ঈমানদারদের পছন্দ করি, যাদের মধ্যে নিম্মোক্ত তিনটি গুণ বিদ্যমান আছে। 

ক. والكاظمين الغيظ রাগ হজমকারী। অর্থাৎ যারা রাগ হজম করে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। 
খ. والعافين عن  الناس আর মানুষদের ক্ষমাকারী। অর্থাৎ জুলুমকারীর ওপর থেকে প্রতিশোধস্পৃহা শুধু হজম করলেই চলবে না। বরং তাদের আরো ক্ষমা করে দেবে। 
গ. ويحب المحسنين আর আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত এহসানকারীদের খুব পছন্দ করেন। অর্থাৎ তোমাকে রাগ হজম করতে হবে। প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করতে হবে। এরপর তার সঙ্গে আরো এহসান বা কৃপাপূর্ণ আচরণ করবে। এই তিন স্তর পেরিয়ে এলে তার ওপর আল্লাহপাক অবশ্যই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। 

আখলাকে আজিমার জ্বলন্ত উদাহরণ:

সাইয়েদুনা হজরত হুসাইন (রা.) একবার মেহমানের সঙ্গে বসেছিলেন। বাদিকে নির্দেশ দেন মেহমানের জন্য কিছু খাবার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ঘরে কিছু শুরবা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সে শুরবাটুকু গরম করে একটি পিয়ালায় ঢেলে নিয়ে আসছিল। কিন্তু তার চোখ ছিল একদিকে আর পা পরছিল অন্যদিকে। ফলে হঠাৎ করে হোঁচট খেয়ে তার হাত থেকে পেয়ালাটি পড়ে ভেঙ্গে যায়। ফলে গরম শুরবা গিয়ে হজরত হুসাইন (রা.) এর শরীরে পরে। বাদির হাত থেকে পেয়ালা ভেঙ্গে মনিবের গায়ে শুরবা! কী হতে পারে এর পরিণতি? কী পরিমাণ রাগ হতে পারে মনিবের মনে? হজরত হুসাইনের চেহারায় কিছুটা ক্ষোভের আভা ফুটে উঠে। বাদিও তার ঘরেরই দীক্ষা পাওয়া। সে হজরত হুসাইন (রা.) এর খুলুকে আজীম সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিল। তাই সে হজরত হুসাইনের (আ.) চেহারায় ক্ষোভের স্ফূরণ দেখে তাৎক্ষণিক পবিত্র কোরআনের এই আয়াত والكاظمين الغيظ আর রাগ হজমকারী ... তেলাওয়াত করে। তা শুনে হজরত হুসাইন (রা.) সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ দমন করে তা স্বীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। বাদি যখন লক্ষ্য করল, মনিবের রাগ খতম হয়ে গেছে। তখন সে আবার তেলাওয়াত করে আয়াতের পরের অংশ والكاظمين الغيظ আর মানুষকে ক্ষমাকারী ...। এবার এই আয়াত শুনে হজরত হুসাইন (রা.) বলেন, ঠিক আছে। আজ তোমাকে ক্ষমাও করে দিলাম। সুযোগ বুঝে যে বাদি আরো একটু এগিয়ে পাঠ করে ويحب المحسنين আর আল্লাহ ইহসানকারীদের খুব পছন্দ করেন। বাদির এমন তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা দেখে তিনি অভিভূত হয়ে বললেন, আচ্ছা যাও। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেয়ার পাশাপাশি আজাদও করে দিলাম। এখন থেকে তুমি স্বাধীন। মুক্ত।

প্রিয় পাঠক! এটিই হলো প্রকৃত আখলাকে আজিমা বা উত্তম চরিত্র।

খারাপের সঙ্গে ভালো ব্যবহার:

প্রতিশোধ নেয়া তো দূরে থাক। শুধু ক্ষমা করে দেয়াই নয়। বরং খারাপ ব্যবহারকারীর সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে। তাও আবার খারাপের অনুপাতে ভারো করতে হবে। কী অসাধারণ চারিত্রিক মাধুরিমা! ইরশাদ হচ্ছে, صِلْ مَنْ قَطعك যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সঙ্গে সে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন কর। واعفُ عمن ظلمك যে ব্যক্তি তোমার প্রতি জুলুম করে, তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও। শুধু এতটুকেই ক্ষ্যান্ত নয়। আরো নির্দেশ আসছে, واحسن إلى من أساء أليك এরপর যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে তোমার প্রতি জুলুম করে তাকে বরং আরো কিছু বোনাস হাদিয়া দিয়ে অনুগ্রহ করো।

ভালো ব্যবহারকারীর সঙ্গে তো গোটা বিশ্বই ভালো ব্যবহার করে। কিন্তু খারাপ ব্যবহারকারীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে ক’জন? মূল মজা আর প্রশান্তি তো লুকিয়ে আছে খারাপ ব্যবহারকারীর সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করার মধ্যে। কবি বলেন, ‘নেশাখোরদের নেশা পান করিয়ে তো সবাই গড়াগড়ি খাওয়াতে পারে। কিন্তু প্রকৃত মজা তো তখনই অনুভূত হয়, যখন সাকী নেশায় গড়াগড়ি খাওয়া থেকে সামলে নেয়। তাকে স্বাভাবিক করে ...।

নিজেকে মেপে দেখুন!:

কিন্তু আজ যদি আমাদের নিজের জীবনের দিকে তাকাই, নিজেকে মেপে দেখি, অন্যের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলেই বুঝতে পারব আমাদের মাঝে কত নম্বর আখলাক বিরাজ করছে? দেখা যাবে আখলাকের তিনটি স্তরের মধ্যে আমরা কোনোটিতেই নেই। সবচেয়ে উন্নত স্তর অর্জন করা তো বাদই থাকল। সর্বনিম্নস্তরে পৌঁছাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কেননা আমরা তো অহরহ সবাইকে বলে বেড়াই, ইটের জবাব আমরা পাথর দিয়ে দেব। কিন্তু স্তর তো উপরোক্ত তিনটি স্তরের কোনটির আওতায়ই পড়ে না। আমরা তো একটু পান থেকে চুন খসলেই তার প্রতিশোধ নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। মনের মধ্যে সবসময় হিংসা বিদ্বেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে। অন্তরাত্মা হিংসা, বিদ্বেষ দ্বারা ভরপুর। এরপরও আমরা মনে করি, বলি যে ইবাদতে স্বাদ পাওয়া যায় না। তাহাজ্জুদ পড়ার তাওফীক হয় না, দোয়া কবুল হয় না। হৃদয়ে প্রশান্তি আসে না ...। আসবে নাই তো! হিংসা বিদ্বেষে ভরপুর অন্তরে এগুলো কীভাবে আসবে?

বিদ্বেষ লালনের পরিণতি:

প্রশ্ন হলো এই ‘কিনা’ তথা বিদ্বেষ জিনিসটা আসলে কি? পরিভাষায় বিদ্বেষ কাকে বলে? বিদ্বেষ বলা হয়, কারো থেকে কোনো দুঃখ ব্যথা পেলে তা মনের মধ্যে রেখে দেয়া, ভেতরে ভেতরে তা লালন করা এবং কষ্টদানকারী ব্যক্তির অকল্যাণ কামনা করা। তাকে খারাপভাবে চিন্তা করা, সুযোগের অপেক্ষায় থাকা, একেই বিদ্বেষ বলা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, হাতে গণা দু’একজন বাদ দিয়ে সমাজের প্রায় সবার মধ্যেই বিদ্বেষের উপস্থিতি ব্যাপক। ভাই-বোনের মাঝে বিদ্বেষের সম্পর্ক বিরাজমান। একজনের বাড়ির রান্না আরেকজন খায় না। অথচ তারপরও বলি ‘আমরা মুসলমান’। মনে রাখবেন, বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র লাইলাতুল কদরে কয়েক শ্রেণির মানুষ বাদ দিয়ে সবাইকে ক্ষমা করে দেবেন। এই বাদ রয়ে যাওয়া, ক্ষমা না পাওয়া শ্রেণির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হিংসা, বিদ্বেষ পোষণকারী লোকেরা। কী দুর্ভাগ্য! এমন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার রাতেও হিংসুক বা বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিরা ক্ষমা পাবে না।

আমরা কি কখনো একটু ভেবে দেখেছি? সংকল্প করেছি? যে আমাদের ‘সিনা’কে হিংসামুক্ত করব? মন থেকে সব প্রকার হিংসা বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলব? যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নতও বটে!

বিদ্বেষহীন হৃদয়ের পুরস্কার:

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক সাহাবাকে তার দিকে আসতে দেখে বললেন, আমার এই সাহাবি জান্নাতি! জান্নাতের সাধারণ সুসংবাদ তো সবার জন্যই রয়েছে কিন্তু নাম ধরে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, অমুক জান্নাতি! সীমাহীন সম্মানের, মর্যাদার, খুশির ও আনন্দের ব্যাপার! সেই মাহফিলে অন্য এক সাহাবাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমি মনে মনে চিন্তা করলাম। আজ থেকে আমি সেই সৌভাগ্যবান সাহাবার সঙ্গে খাতির লাগিয়ে দেখতে চেষ্টা করব যে, তিনি এমন কী অতিরিক্ত বা মর্যাদাপূর্ণ ভিন্ন ইবাদত করেন, যার কারণে স্বয়ং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার বুকেই তাকে বেহেশতের গ্যারান্টি কার্ড প্রদান করলেন। সুসংবাদ দিলেন। অতঃপর সুযোগমত তাকে ভাই! আমি আপনার কাছে তিনদিন মেহমান হয়ে থাকতে চাই। (আরবের প্রথা অনুযায়ী তিনি তার অফার সানন্দে লুফে নিয়ে) বললেন, ঠিক আছে। এটা তো খুব ভালো কথা, আমার সৌভাগ্যের ব্যাপার। এরপর আমি মেহমান সেজে গোয়েন্দাদের মতো তার প্রতিটি আমলই কঠিনভাবে মনিটরিং করতে লাগলাম, পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম। তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেলে নিরাশ কণ্ঠে বললাম, ভাই আমি তো এই কারণে আপনার বাড়ির মেহমান হয়েছিলাম যে, খুব কাছে থেকে আপনার দৈনন্দিন আমলগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখব, আপনি এমন কী এত অতিরিক্ত এবং অতি পছন্দনীয় আমল করেন, যার কারণে খোদ আল্লাহ তাআলার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই আপনাকে জান্নাতি বলে ঘোষণা দিয়েছেন? কিন্তু আপনি তো আমাকে হতাশ করে দিয়েছেন। নিরাশ করেছেন। সত্যি কথা বলতে কি, এ তিনদিন আমি আপনাকে এমন কোন আমল করতে দেখিনি, যা অন্য সাধারণ আমল থেকে স্বতন্ত্র, অতিরিক্ত স্পেশাল। যা অন্য সাহাবারা করেন না। কিন্তু তাহলে কী কারণে বা অন্য কোন আমলের বরকতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে বেহেশতের আগাম সুসংবাদ প্রদান করলেন? তিনি জবাব দিলেন, ভাই দেখুন! আমার মধ্যে এমন কোনো অসাধারণ আমল নেই, যা অন্যরা করেন না বা করলেও সে সবের চেয়ে আমারগুলো অনেক উত্তম, বেশি দামী। তবে একটি জিনিস আমার মধ্যে আছে, আমি আমল করি। জানি না সেটা অন্য কারো মধ্যে আছে কি না, জানি না। বলতে পারব না। আমি জানতে চাইলাম, সেটি কী? তিনি বললেন, সেই আমলটি হচ্ছে, প্রতি রাতে ঘুমানোর প্রাক্কালে আমি নিয়মিতভাবে এই নিয়ত করে ঘুমাতে, যেসব লোক আমাকে সারাদিনে দুঃখ দিয়েছে, কষ্ট দিয়েছে, আমার হক নষ্ট করেছে, আমাকে গালি দিয়েছে, অন্যায়ভাবে আমার প্রতি জুলুম করেছে ... যার কারণে তাদের প্রতি দুঃখবোধ, রাগ, ক্ষোভ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে, আল্লাহ ওয়াস্তে তার সবকিছুই আমি ক্ষমা করে দিলাম। মার্জনা করলাম।

মোটকথা, আমি প্রতিরাতে ঘুমানোর পূর্বে আমার অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ ও কুধারণা মুক্ত করে ঘুমাতে যাই। হয়তো আমার এই আমলটুকুই আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দনীয় হয়ে গিয়েছে, যার ফলে মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালা আমাকে দুনিয়াতেই বেহেশতের সুসংবাদ দান করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে