Alexa খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকদের যত্নবান হওয়া জরুরি

খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকদের যত্নবান হওয়া জরুরি

প্রকাশিত: ১৭:০০ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ ১২ বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ধাপ হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। 

এ সময় একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষায় থাকেন কাঙ্খিত ফলাফলের। কারণ এই ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমের পর কাঙ্খিত ফলাফলে একজন শিক্ষার্থী তার ভবিষ্যত নির্ধারণ করেন। তার সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকে আরো বড় স্বপ্ন ছোঁয়ার। উচ্চ শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করে তৈরি করবেন আগামীর জন্য। নিশ্চিত করবেন নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যত। দেশের ভবিষ্যত। কিন্তু এই সময়ে বিশেষ করে অনেক এইচএসসি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দিয়ে মনের মধ্যে শঙ্কা জাগে নিজের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন কিনা। কাঙ্খিত ফলাফল করে উর্ত্তীণ হতে পারবেন তো? একজন শিক্ষার্থীর জন্য এমন ভয় একেবারে অমূলক নয়। এমন ভয় যে তার জন্য যথার্থ খাতা অবমূল্যায়নের চিত্র বিশ্লেষণ করলেই তা পরিস্কার ভাবে বোঝা যায়। 

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল। এই ফলাফলের চিত্রই সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে নতুন করে। যেখানে দেখা যায় পরীক্ষার ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়ে খাতা চ্যালেঞ্জ করে ২ হাজার ৭৩৯ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো যেখানে প্রথমে ফেল করা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পেয়েছে। এটা আমাদের খাতা মূল্যায়নের গাফিলতির বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

 শুধু তাই নয়, কাঙ্খিত জিপিএ-৫ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পুনঃনিরীক্ষণের পর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনশ জনের বেশি। আর সরাসরি ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পাস করেছেন ছয়শ’র বেশি শিক্ষার্থী। প্রতি বছর এমন খাতা পুনঃনিরীক্ষণে ফলাফল পরিবর্তন হলেও এবার বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে নতুন করে কিছু প্রশ্নের অবতারনাও হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে খাতা নিরিক্ষণের পদ্ধিতির বিষয়টি নিয়েও। 

অবশ্য এরইমধ্যে বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যেসব পরীক্ষকদের গাফিলতির কারণে ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। এমন সিদ্ধান্ত অবশ্য স্বাগত জানানোর মতো। তবে প্রতি বছর এমন বিপুলসংখ্যক পরীক্ষকদের গাফিলতিও মেনে নেয়ার মতো নয়। কারণ পরীক্ষকদের গাফিলতির অর্থ হলো তারা খাতা মূল্যায়নের সময় যতটা মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন তা দেন না। এটা সত্যিই উদ্বেগের। একজন শিক্ষার্থীর সারা বছরের পড়াশুনার পর যদি পরীক্ষকের গাফিলতির কারণে পাস করা শিক্ষার্থীর ফলাফল ফেল আসে তবে তা সত্যিই দুখঃজনক। কিন্তু এটাই হচ্ছে প্রতিবছর। এমনটা হওয়ার পেছনে কিছু নেতিবাচক দিকও ফুটে ওঠে সমাজে। অনেক সময় দেখা যায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী ফেল করার পর তা মেনে নেন, অনেক সময় তারা খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন না। আবার এমনও দেখা যায় কাঙ্খিত ফলাফল না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। খাতা পুনঃনিরীক্ষণের ভাবনা তখন তারা ভাবেন না। কাঙ্খিত ফলাফল না পেয়ে বাবা-মার বকুনি, সমাজের কাছে ছোট হওয়ার ভয়ে তারা আতœহত্যা করেন। অথচ অনেকে খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন না এক্ষেত্রে। 

এখন প্রশ্ন হলো যদি পরীক্ষকের গাফিলতির কারণে এমনটা হয় তবে এর দায় আসলে কে নেবে? বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যেসব পরীক্ষক গাফিলতির সঙ্গে জড়িত তারা, সারা জীবনের জন্য কোনো বোর্ডে পরীক্ষক হতে পারবেন না। কেননা, বোর্ডের আইন অনুযায়ী এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু যারা খাতা মূল্যায়নের সময় গাফিলতি করেন তাদের এই শাস্তি যথেষ্ট নয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এসব পরীক্ষক শ্রেণী কক্ষে শিক্ষক হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন কিনা। আবার এর দায় কি শুধুই পরীক্ষকের একার? এখানে শুধু পরীক্ষককে আসামী বানিয়ে শাস্তি দিলেই কি যর্থাথ হবে। আপাত দৃষ্টিতে এখানে পরীক্ষকের দোষ থাকলেও এখানে শুধু পরীক্ষককের দায় একার নয়। এখানে দায় সংশ্লিষ্ট সবার। 

কারণ একজন পরীক্ষককে খুব অল্প সময় দিয়ে একগাদা খাতা ধরিয়ে দেয়া হয়। দ্রুত সময়ে খাতা জমা দিতে হবে বলে পরীক্ষকদের দ্রুত সময়ে খাতা মূল্যায়ন করার একটা চাপ থাকে। ভুলগুলো এ চাপের কারণে বেশি হয়। কেননা, তার পক্ষে এতো অল্প সময়ের মধ্যে এতো বেশি সংখ্যক খাতা দেখা কষ্টসাধ্য। অনেক তাড়াহুড়ো করে বেশি সংখ্যক খাতা দেখেন পরীক্ষক। যে কারণে ভুল হয়ে যায়। তাই নিদিষ্ট বিষয়ে সর্বোচ্চ ১০০ খাতা একজন পরীক্ষককে দিলে অনেকাংশে ভুল কমে যাবে। এখন বিষয়টি বোর্ডকে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, খাতা মূল্যায়নে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন ভাল শিক্ষকদের এর সাথে সম্পৃক্ত করা। ভালো শিক্ষকদের খাতা মনিটরিংসহ নানা উদ্যোগে নিতে হবে বোর্ডকে। যোগ্য শিক্ষকরা খাতা দেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাই তাদের সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরি ও সময়ের দাবি। পাশাপাশি খাতা পুনঃনিরীক্ষণের পুরনো পদ্ধতি পরিবর্তন করাও জরুরি। এতে পরীক্ষা নিরীক্ষণের পদ্ধতিতে একটি ইতিবাচক শৃঙ্খলা আসবে। সার্বিকভাবে লাভবান হবেন শিক্ষার্থীরা। সর্বোপুরি শিক্ষা ব্যবস্থার লাভ হবে।

এখানে আরো একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব শিক্ষার্থীর খাতা পুনঃনিরীক্ষণের পর ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে তাদের উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে যেন কোনো প্রতিন্ধকতার সম্মুখিত হতে না হয় সে বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, এরইমধ্যে অনেক উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির আবেদন করার সময়সীমা অনেক ভার্সিটিতে শেষ হয়ে গেছে। অনেক ভার্সিতে শেষের পথে। তাই খাতা পুনঃনিরীক্ষণের পর যাদের ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে তাদের বিশেষ ব্যবস্থায় আবেদন করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর