দূরবীনপ্রথম প্রহর

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী: মারমাদের আদ্যোপান্ত (১ম পর্ব)

লিপিকা রানী বড়ুয়াডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ছবি: সংগৃহীত

মারমা বাংলাদেশের একটি আদিবাসী ও বৃহৎ জাতিসত্ত্বা। শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে মারমারা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশে চাকমার পর মারমা দ্বিতীয় বৃহত্তর উপজাতি জনগোষ্ঠী(ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী)।বান্দরবানে মারমা লোকসংখ্যা প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার।তিন পার্বত্য জেলাসহ এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস বান্দরবানে। ‘মারমা’ শব্দটি ‘ম্রাইমা’ থেকে এসেছে। এরা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষদের মতো মেয়েরাও পৈতৃক সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারী হয়। ভাত মারমাদের প্রধান খাদ্য। পাংখুং, জাইক, কাপ্যা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়।তাদের প্রধান উৎসব ও পার্বণগুলো হচ্ছে সাংগ্রাই পোয়ে, ওয়াছো পোয়ে, ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে এবং পইংজ্রা পোয়ে।

ভাষা

বাংলাদেশের পাহাড়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ ভাষা, সংস্কৃতি ব্যবহার করে আসছে সেই বহুকাল থেকেই। কিন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যথাযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আদিবাসীদের এই ভাষাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রূপ লাভ করেনি। স্কুলে গেলে তাই এখন মার্মা শিশুদের বাংলায় শিক্ষা দেয়া হয়, কিন্তু তাদের মাতৃভাষা মার্মা তারা বলতে পারলেও লিখতে পারেনা। মার্মা ভাষায় লিখিত কোনো বইয়ের খোঁজ-ও পাওয়া যায় না। উল্লেখ্য যে, মার্মা ভাষার সঙ্গে বার্মিজ ভাষার বেশ মিল রয়েছে।

ধর্মীয় উৎসব

মারমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো হলো- বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চিবর দান, ওয়াহ্গ্যই বা প্রবারণা পূর্ণিমা এবং সাংগ্রাই। মারমাদের বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান-কে সাংগ্রাই বলে।

বৌদ্ধ পূর্ণিমা

এই পূর্ণিমা তিথীতে মহামতি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এটি একটি ধর্মীয় উৎসব।

কঠিন চীবর দান

এই অনুষ্ঠানে মূলত পূণ্যের আশায়, বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে ত্রি-চীবর নামে বিশেষ পোষাক দান করা হয়। ত্রি-চীবর হলো চার খণ্ডের পরিধেয় বস্ত্র, যাতে রয়েছে দোয়াজিক, অন্তর্বাস, চীবর ও কটিবন্ধনী। এই পোষাক পরতে দেয়া হয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। এই পোষাক তৈরির জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ প্রথমে তুলার বীজ বোনা হয়, পরে তুলা সংগ্রহ করে, তা থেকে সুতা কাটা হয়, সেই সুতায় রং করা হয় গাছ-গাছড়ার ছাল বা ফল থেকে তৈরি রং দিয়ে, এবং সবশেষে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ এক দিনের ভিতর তৈরি করা হয় এই ত্রি-চীবর। এই পোষাক বোনায় ব্যবহার করা হয় বেইন বা কাপড় বোনার বাঁশে তৈরি ফ্রেম। এরকম বেইনে একসঙ্গে চারজন কাপড় বুনে থাকেন। এভাবে ২৪ ঘন্টা পর তৈরি হওয়া সেসব পবিত্র চীবর, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে তুলে দেয়া হয় কঠোর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে।

ওয়াহ্গ্যই

এই উৎসবটি মূলত মারমাদের পূর্ণিমা উৎসব, অনেকে এটাকে প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব বলে থাকেন। মারমা সম্প্রদায়ের লোকজন তিন মাস ধর্মীয় কাজ (বর্ষা মাস) শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা উৎ সব উদযাপন করেথাকেন। গৌতম বুদ্ধের মহা চুলকে পূজা ও উৎসর্গ করার জন্য রং-বেরংয়ের ফানুস উড়িয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মারমা নাটক মঞ্চায়ন, মহারথ, মন্দিরে খাবার ও অর্থ দান এবং বিশেষ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের এ অন্যতম ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করেন। ক্যাংগুলোতে রাতে মোমবাতি প্রজ্জলন, আদিবাসী পল্লীতে বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি পিঠা তৈরি উৎসবে মেতে উঠে মারমা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা। গান বাজনা আর বাহারী পোশাকে সজ্জিত হয়ে রাস্তায় নেমে এসে এ উৎসবকে বরণ করে নেয়ার জন্য। উপজাতীয় নৃত্যের তালে মোমবাতি জালিয়ে রথ টানায় অংশ নেয় হাজার হাজার মারমা তরুণ-তরুণী। এ সময় ধমীয় পূর্ণতা লাভের আশায় দান করা হয় নগদ অর্থ। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতে রথটি নদীতে উৎসর্গ করা হয়।

সামাজিক উৎসব

সাংগ্রাই মারমাদের একটা বড় সামাজিক উৎসব। সাংগ্রাইয়ের তাৎপর্য- পৃথিবীর সকল জাতির মতন করে মারমারা গ্রেগরিয়ান ইংরেজি ক্যালেন্ডার ছাড়া ও নিজস্ব একটা ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করে, মারমাদের ক্যালেন্ডার অবশ্য বর্মী ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করেই করা হয়। মারমাদের বর্ষপঞ্জিকাকে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” বলা হয়। “ম্রাইমা সাক্রঃয়” এর পুরনো বছরের শেষের দু’দিন আর নতুন বছরের প্রথম দিনসহ মোট ৩দিনকে মারমারা সাংগ্রাই হিসেবে পালন করে থাকে। আগে “ম্রাইমা সাক্রঃয়” অনুযায়ী এই ৩ দিন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে পড়লেও এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল রেখে এপ্রিলের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে পালন করা হয়। ১৩ তারিখের সকালে পাংছোয়াই (ফুল সাংগ্রাই),১৪ তারিখে প্রধান সাংগ্রাই আর ১৫ তারিখে পানি খেলার সঙ্গে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোও অনুষ্ঠিত হয়। সাংগ্রাই এর প্রধান আকর্ষন হল পানি খেলা যেটিকে মারমারা বলে “ড়ি লং পোয়ে”।

সাংগ্রাইয়ের পানি খেলা শুধুমাত্র মারমাদের নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া আর চীনের সব জাতিগোষ্ঠীরাও এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান করে থাকে। মায়নামারে এই ধরনের অনুষ্ঠানকে “থিনগন” আর থাইল্যান্ড ও লাওসে এই অনুষ্ঠানকে “সংক্রান” বলে। থাই ভাষায় “সংক্রান” এর অর্থ হল পরিবর্তন। সাংগ্রাই আসলেই পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়াকেই বোঝায়। সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে নতুন জুম চাষের মৌসুমের শুরুও সাংগ্রাই-এর পরেই হয়ে থাকে। শুধু জুম চাষই নয় মারমারা মাঘী পূর্ণিমার পর থেকে সাংগ্রাই এর আগ পর্যন্ত নতুন বিয়েই করে না অর্থাৎ সাংগ্রাইকে মারমারা নতুন বছরের শুরুসহ পুরনো সব জিনিসকে ঝেরে ফেলে নতুন করে শুরু করাকেই বোঝায়। আর তাই মারমারা এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্শীবাদ আর শুভাকাঙ্খির আশায় নতুন বছর উদযাপন করে থাকে।।

সাংগ্রাইয়ের পূর্ব প্রস্তুতি

সাংগ্রাই এপ্রিলের ১৩ তারিখ থেকে শুরু হলেও মারমাদের মাঝে সাংগ্রাই নিয়ে উদ্দীপনা জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়। মারমা গ্রামের গিন্নীরা সাংগ্রাই নিয়ে নানা পরিকল্পনা করে। তারা নতুন করে তাদের ঘরগুলো সাজায়। মাটির ঘরগুলোকে আবার নতুন করে মাটির প্রলেপ দেয়া হয়, মাচাং আর ছনের ঘরগুলোতে পুরনো ছন বাদ দিয়ে পাহাড় থেকে নতুন ছন এনে বাড়িতে লাগানো হয়। এছাড়া জুম থেকে পাওয়া চাউল নানা রকমের পিঠার জন্য রেখে দেয়া হয়।মারমা শুকর ব্যবসায়ীরা ৩ মাস আগে থেকেই নতুন নতুন শুকরের ছানা পালতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর বাজারে বিক্রি করতে পারে। মারমা শিকারীরা সাংগ্রাইয়ের আগে তাদের অস্ত্রগুলো গুছাতে থাকে যেন সাংগ্রাই-এর আগেই বড় রকমের হরিণ, গুইসাপ, কচ্ছপসহ আরো নানা রকমের পশু-পাখী শিকার করতে পারে।এছাড়া অন্যান্য ব্যাবসায়ীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে তাদের ব্যবসায়ী পরিকল্পনা বানাতে থাকে।সেইসঙ্গে তরূণ-তরূণীরাও সাংগ্রাইকে নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের চিন্তাভাবনা করতে থাকে। কী করে সাংগ্রাইকে আরো আকর্ষণীয় করা যায় আর নতুন বছরের প্রথম দিনের উদযাপন কী আরো সুন্দর করা যায়?

মারমা তরুনীরা দর্জিদের কাছে ছুটে যায় যেন তার সাংগ্রাইয়ের “থামি(মারমা মেয়েদের পোশাক)” সবচেয়ে সুন্দর আর ব্যতিক্রমী হয়।এছাড়া যুবক-যুবতীরা তাদের বিয়ের তারিখগুলোও সব সাংগ্রাইয়ের পরে ঠিক করে রাখে। মোটামোটিভাবে জানুয়ারির পর থেকে সাংগ্রাইকে ঘিরে সকল স্তরের মারমারা নানা রকমের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। পাং ছোয়াই(ফুল সাংগ্রাই) “পাংছোয়াই” এর অর্থ ফুল ছিঁড়ার দিন।এটি ১২ এপ্রিলের রাতেই হয়ে থাকে।শীতের পর বসন্তের আগমনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতেও বসন্তের ছোঁয়া লাগে, ফলে পাহাড়ে দেখা যায় নানা ফুলের সমারোহ। নানা রকমের ফুলে গ্রামের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোতে ছেঁয়ে যায়। আর এই ফুলগুলো সাংগ্রাইয়ের আগে ছেঁড়া হয় না “পাঃংছোয়াই” এর রাতেই পাহাড় থেকে ফুলগুলো ছিঁড়ে বাড়িগুলোতে সাজানো হয়।

পাহাড়ে অনেক ফুল থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ফুল আছে যেগুলো দিয়েই বাড়িঘরগুলো সাজানো হয়। তন্মধ্যে “সাংগ্রাই পেং” নামে সাদা রংঙের ফুলটিই সবচেয়ে প্রিয়। সকলেই এই ফুলকে প্রধান করেই “পাংছোয়াই” এর পরের দিনে গিন্নারা তাদের ঘরগুলো সাজাতে থাকে। এই ফুল ছেঁড়ার কাজটি মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরাই করে থাকে।এই “পাংছোয়াই”কে কেন্দ্র করে মারমা তরূণ-তরূণীরা এর আগের রাতে নানা রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেকে সারারাত জেগে পিঠা বানায়, আবার অনেকে মারমাদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলার ব্যবস্থা করে, অনেকে মারমা নাচ-গান করে। মূলত মারমা তরূণ-তরূণীরা সারারাত জেগে থাকার জন্য নানা কিছু করে। এরপরে আলো ফোঁটার আগেই একদম ভোর-সকালে দলে দলে পাহাড়ে গিয়ে “সাংগ্রাই পাং” তুলে নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দেই।গিন্নিরা সকাল হলেই সুতা দিয়ে ফুলগুলো সাজাতে থাকে। প্রথমে ভগবান বুদ্ধকে ফুল পূজা করে নিয়ে বাড়ির প্রতিটি দরজাগুলোকে “সাংগ্রাই পাং” দিয়ে সাজানো হয়।বাড়ির দরজায় সাজানো ফুলগুলো দিয়েই বোঝাতে পারা যায় সাংগ্রাই অর্থাৎ নতুন বর্ষবরণ শুরু হয়ে গেছে।

সাংগ্রাই বাজার

“পাংছোয়াই”র দিনেই অর্থাৎ ১৩ তারিখেই সাংগ্রাই বাজার হয়ে থাকে। সাংগ্রাইকে উপলক্ষ্য করে অনেক বড় হাঁট বসে। গিন্নীরা সাংগ্রাইতে বিহারে পাঠানোর জন্য ও গৌতম বুদ্ধেকে স্নানের জন্য পবিত্র পানি, নারকেল, চীনা কাগজ, মোমবাতি,আগরবাতি মোটামোটিভাবে বিহারে পাঠানোর জন্য যার যেরকম সামর্থ্য সেই অনুযায়ী কিনে। বাচ্চারা সাংগ্রাইতে পানি মারার জন্য পানির বোতল, পানি মারার নানা রকমের প্লাস্টেকের অস্ত্রও কিনে রাখে।

প্রধান সাংগ্রাই

প্রধান সাংগ্রাই বর্তমানে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিলের ১৪ তারিখেই পালন করা হয়। মারমা গৃহিণীরা(“ইংথসাং”) ভালো ভালো খাবার(“ছোয়াঈ”-বিহারে যে খাবার পাঠানো হয় তাকে “ছোয়াঈ” বলে) আর পিঠা নিয়ে বিহারে যায়। শুধু নিজেদের বিহার ছাড়াও আশেপাশের বিহারেও “ছোয়াঈ” পাঠানো হয়। “ছোয়াঈ” শুধু ভগবানের উদ্দেশ্যে নয়, নিজেদের আত্নীয়দের মাঝে যারা উপোসথ শীল পালন করে তাদের উদ্দেশ্যেও পাঠানো হয়। বিহার ছাড়াও মারমা বিভিন্ন দেবতাদেরকেও পূজা দেয়া হয়। এছাড়া গ্রামের পরিচিত বয়োজ্যৈষ্ঠদেরকেও খাবার আর পিঠা পাঠানো হয়। আর মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বয়োজৈষ্ঠ্যদের স্নান করাতে যায়। প্রত্যেক পরিবারের বয়োজৈষ্ঠ্যরা গোসল শেষে তরূণ-তরূণীদেরকে সাংগ্রাই এর সেলামি দেয় ও ছোটরা বড়দের কাছে নতুন বছরের আর্শীবাদ নিয়ে আসে। শুধু গোসলই নয় প্রতি পরিবার থেকে মারমা তরূণ-তরূণীদের কিছু না কিছু খেয়ে আসতে হয়।

বুদ্ধ স্নান আর ধর্মদেশনা

প্রধান সাংগ্রাইতে বিহারে যে ভগবান বুদ্ধ আছে তাদেরকে পবিত্র পানি দিয়ে গোসল করানো হয়। বুদ্ধকে স্নানস্কৃত পানি মারমারা খেয়ে থাকে রোগমুক্তির অবসান ঘটাতে। এরপরেই ধর্মদেশনা হয়। সকল পরিবারই চাল-নারকেল-চীনা কাগজ-মোমবাতি বিভিন্ন দ্রব্যাদি বিহারে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসে। বিহারের প্রধান বৌদ্ধ ভিক্ষু নতুন বছরের শুভদিনের জন্য ধর্মদেশনা দেয়। ধর্মদেশনার পরই বৌদ্ধ বিহারে সকলেই ভগবানের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হয়। শুধু ভগবান নয় অনেকে তাদের পূর্বপুরুষদের জাদিতেও মোম্বাতি প্রজ্বলন করা হয়।প্রধান সাংগ্রাই এর দিনের আলো শেষেই সন্ধ্যে নামলেই মারমা তরূণ-তরূণীরা নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বিহারে চলে যায়। বিহারে বিহারে গিয়ে তারা মোমবাতি জ্বালাতে থাকে। এরপরে তরূণ-তরূণীরা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কাছে একসঙ্গে বসে ধর্মদেশনা শুনে।এছাড়া পরবর্তী দিনের “ড়িলংপোয়ে” এর জন্য একসাথে বসে আলোচনা করে।

“ড়িলংপোয়ে”(জুলকেলি উৎসব)

প্রধান সাংগ্রাইয়ের পরেই বিভিন্ন জায়গায় “ড়িলংপোয়ে” এর আয়োজন করা হয়ে থাকে। এটি শুধু এপ্রিলের ১৫ তারিখেই নই,অনেক জায়গায় ১৬,১৭,১৮ তারিখেও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় যেন সকলেই সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতে পারে। অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে মারমারা তাদের ঐতিহ্যবাহী “থামি(মেয়েরা)” আর লুংগি(ছেলেরা) পরে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে। খুব সকালেই স্থানীয় এলাকার তরূণ-তরূণীরা সাংগ্রাই র‌্যালী বের করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মারমা তরূণ-তরূণীরা “ সাংগ্রাই মা ঞিঞীই ঞাঞাই, রিগ জাং কাঈ পাঃ মেঃ” গান গেয়ে দলে দলে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকে।এরপরে মারমা রাজা কিংবা মারমাদের হেডম্যান(মৌজা প্রধান) অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের পরই আনুষ্ঠানিক “ড়ীলং পোয়ে” শুরু হয়। মারমা তরূণ-তরূণীরা দল বেঁধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, এরপরে তাদের এক অপরের দিকে পানী ছোড়াছুঁড়ি শুরু হয় যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সামনে রাখা পানির পাত্রটি শেষ না হয়ে যায়। এভাবে একদলের পর আরেকদল পানি খেলতে থাকে। সকলের হাতেই একটা করে পানির বোতল থাকে। যার যাকে মন চায় সে তাকেই পানি ছিটাতে পারবে, এতে কেউ কোনো আপত্তি করে না বরং এটিকে আর্শিবাদ আর শুভ লক্ষণের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়।

পানি খেলার পরপরই মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। ছেলেদের বলি খেলা, মেয়েদের দড়ি টানাটানি খেলা হয়ে থাকে। আর সবথেকে আকর্ষণ হল ছেলেদের বাশঁ উঠানো(“তং তাং”) খেলা। এতে একটা লম্বা ২৫+ ফুট বাশঁ থাকে যার একদম শীর্ষে একটি মোটা অঙ্কের টাকা থাকে।একজনের কাধেঁ আরেকজন উঠে শীর্ষের টাকাটা নিতে হবে। পাঁচজন হলেই টাকার নাগাল পাওয়া যায়।আর যে দল আগে নিতে পারবে সেই দল সেই টাকা পেয়ে যাবে। তবে অতটা সহজ নয়, কারণ বাশেঁর উপরে তেল থাকে তাই যতই বাশঁ নাড়ানো হোক না কেন ততই উপর থেকে তেল পরে বাশঁকে পিচ্ছিল করতে থাকে। দুপুরের পরই এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে মারমাদের ঐতিহ্যগুলোকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়। সাংগ্রাই নৃত্যসহ আরো নানা ধরনের নৃত্য এতে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া মারমা গুণী শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করে।বর্তমান দিনে মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরই কনসার্টের আয়োজন করা হয়। এই মারমা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর কনসার্টকে নিয়ে মারমা তরূণ-তরূণীরা তাদের নতুন “ম্রাইমা সাক্রয়” কে বরণ করে নেয় পাশে ‘রিজারও’ (সাদা সূতো দিয়ে পেঁচানো দু’টো পানি পূর্ণ কলস) এবং ‘সিফাইক্ও’ (বিভিন্ন চাউল থেকে তৈরি পানীয়) রাখা হয়।

পরবর্তী পর্ব তুলে ধরা হবে মারমাদের বিয়েসহ বিভিন্ন দিক।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস