Alexa ক্রিকেট জনকদের বিশ্বজয়

ক্রিকেট জনকদের বিশ্বজয়

প্রকাশিত: ১৮:০৯ ১৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৮:১৯ ১৭ জুলাই ২০১৯

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফুটবলে শিরোপা জিতে ইংল্যান্ড। এরপর ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডে তুমুল জনপ্রিয় রাগবির শিরোপাও নিজেদের করে নেয় তারা। শুধু বাকি ছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের শিরোপা। দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেললেও কখনোই ক্রিকেট বিশ্বকাপের শিরোপার স্বাদ পায়নি ইংলিশরা। অথচ, ক্রিকেটের জনক তারাই।

অবশেষে দীর্ঘ সময় পর সেই খরা কাটলো ক্রিকেট জনকদের। ২০১৯ বিশ্বকাপে নতুন চ্যাম্পিয়ন এখন রানীর দেশ। কোটি কোটি দর্শকদের অবিশ্বাস্য এক ফাইনাল উপহার দিয়ে শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। এমন ম্যাচ ক্রিকেট বিশ্বে ফাইনাল মঞ্চে এর আগে কখনো কেউ দেখেনি। আর এমন মহাকাব্য রচনা করে সেই ক্রিকেট মহানায়কের নাম ইয়ন মরগান। যার হাত ধরে আসলো প্রথমবারের মতো শিরোপা।

১৯৭৯ তে দ্বিতীয় বিশ্বকাপে মাইক ব্রিয়ারলি। ১৯৮৭ তে চতুর্থ বিশ্বকাপে মাইক গ্যাটিং ও ১৯৯২ বিশ্বকাপে গ্রাহাম গুচ অধিনায়ক হিসেবে ইংল্যান্ড দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে। কিন্তু দলকে ফাইনালে তুললেও দেশকে এনে দিতে পারেননি ক্রিকেটের অমূল্য শিরোপা মানে বিশ্বকাপ ট্রফি। তাই সেই তিন সুযোগে একবারও শিরোপা জেতা হয়নি ক্রিকেট জনকদের। কিন্তু পূর্বসূরি তিন অধিনায়ক ব্যর্থ হলেও এবার সেই ব্যর্থতার খাতায় নাম লেখাননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগান। বরং তিনি নিজের নাম তুলেছেন অনন্য ইতিহাসে। যেখানে এর আগে কোন ইংলিশ অধিনায়ক নিয়ে যেতে পারেননি। যেখানে অনন্য মরগান। ইতিহাসে দশম অধিনায়ক হিসেবে হাতে তুলে ধরলেন এই অমূল ট্রফি। ইংলিশদের পক্ষে যা প্রথম। এবার ষষ্ঠবারের মতো নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইয়ন মরগানের কল্যাণে সফল ইংলিশরা। অথচ, ক্রিকেটের জনক হিসেবে অনেক আগেই ইংল্যান্ডের হাতে উঠতে পারতো বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু আগের তিন অধিনায়ক ব্যর্থ হলেও, এবার আর ব্যর্থ হননি মরগান। ৪৪ বছরের খরা কাটালেন এই ইংলিশ দলনায়ক। মজার বিষয় ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ জিতলেও জন্মসূত্রে মরগান একজন আইরিশ। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলতার প্রমাণ রেখেছেন ইয়ন। ব্যাট হাতেও সমান সফল ছিলেন তিনি। এক সেঞ্চুরি ও এক অর্ধশতকে করেছেন ৩৭১ রান। পাশাপাশি দুর্দান্ত অধিনায়কত্ব। যার চূড়ান্ত ফলাফল, শিরোপা।

ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের মধ্যদিয়ে ইংল্যান্ড আরও একটি অনন্য রেকর্ডের মালিক হলো। বিশ্বে প্রথম দল হিসেবে ফুটবল, রাগবির পর ক্রিকেট বিশ্বকাপের শিরোপাও জিতলো ইংল্যান্ড। এবার নিজ দেশকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতিয়ে এই অনন্য অর্জনের নায়ক হিসাবে অমর হয়ে থাকলেন ইয়ন মরগান। শুধু ইয়ন মরগান নয়, ইংল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতানো মইন আলি, জনি বেয়ারস্টো, জস বাটলার, টম কারান, জো ডেনলি, অ্যালেক্স হেলস, লিয়াম প্লানকেট, আদিল রশিদ, জো রুট, জেসন রয়, বেন স্টোকস, ডেভিড উইলি, ক্রিস ওকস, মার্ক উডও হলেন ইতিহাসের নায়ক। 

এবার বিশ্বকাপ শুরুর আগে বাজির দরে শীর্ষেই ছিল ইংলিশরা। দ্বাদশ বিশ্বকাপে শুরুটাও দারুণ করেছিল ইংল্যান্ড। উদ্বোধনী ম্যাচে শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে কোন পাত্তা দেয়নি তারা। দক্ষিণ আফ্রিকাকে কোন পাত্তা না দিয়েই ১০৪ রানের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। তবে জয়ের ধারা অব্যাহত থাকেনি দ্বিতীয় ম্যাচে। পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হয় তারা। পাকিস্তানের দেয়া ৩৪৯ রানের বিশাল টার্গেটের কাছাকাছি গিয়ে তারা পরাজিত হয় ১৪ রানে। তবে তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশকে ১০৬ রানে হারিয়ে আবারও জয়ে ফেরে মরগানবাহিনী। এরপর টানা দু’ম্যাচ হেসে খেলে জেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানদের বিপক্ষে। তবে নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচে আর সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি ইংল্যান্ডকে। লঙ্কানদের বিপক্ষে ২৩৩ রানের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে গিয়ে ২১২ রানে অলআউট হয় তারা। এরপর চিরপ্রতিদ্বদ্বী অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও পেরে উঠেনি ইংল্যান্ড। পরাজিত হয় ৬৪ রানে। এরপর বাকি দুই ম্যাচ পরাজিত হলে সেমির স্বপ্ন ভেস্তে যেতে পারে। এমন সমীকরণে শক্তিশালী ভারতকে ৩১ রানে হারিয়ে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে ইংলিশরা। এরপর রাউন্ড রবিন লিগে নিউজিল্যান্ডকে কোন পাত্তাই দেয়নি।

১১৯ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় দল হিসেবে সেমির টিকিট পায় ইংল্যান্ড। আর সেমিফাইনালে আরেক পরাশক্তি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে রীতিমতো ছেলে-খেলা খেলে ইংল্যান্ড। ৮ উইকেটের বড় জয় নিয়ে ২৭ বছর পর আবারও ফাইনাল মঞ্চে উঠে যায় ইংল্যান্ড। আর চতুর্থবারের মতো ফাইনালে উঠে এবার আর ব্যর্থ হয়নি স্বাগতিকরা। রাউন্ড রবিন লিগের মতো এবার অবশ্য নিউজিল্যান্ডকে আর হেসে খেলে হারাতে পারেনি ইংলিশরা। রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ উপহার দিয়েছে দুই দল। ফাইনাল ম্যাচ টাই হওয়ার পর সুপার ওভারে গড়ায় ম্যাচ। কাকতালীয় ভাবে সুপার ওভারও হয় টাই। এরপর ম্যাচে বেশি বাউন্ডারি মারায় জয়ী হয় ইংল্যান্ড। কাগজপত্রে হয়তো জয়ী দল হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম লেখা থাকবে। তবে অবিশ্বাস্য ফাইনাল উপহার দেয়ার জন্য নিউজিল্যান্ডের কম অবদান নয়। ইতিহাসে ভাল ভাবেই লেখা থাকবে নিউজিল্যান্ডের নামও। 

বিশেষ ভাবে লেখা থাকবে টুর্নামেন্ট সেরা কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের নাম। অনেকটা তাঁর একক অসাধারণ পারফরম্যান্সে দ্বিতীয়বারের মতো নিউজিল্যান্ডকে ফাইনাল মঞ্চে নিয়ে যান। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ডের হয়ে ব্যাট হাতে উইলিয়ামসন দুর্দান্ত। ১১ ম্যাচে ৯ ইনিংসে সংগ্রহ ৫৭৮ রান। এতে আছে ২টি শতক ও ২টি অর্ধশতক। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অসাধারণ মুন্সীয়ানায়। তবে ভাগ্যের কারণে শেষ পর্যন্ত দল শিরোপা জিততে ব্যর্থ হলেও এবারের বিশ্বকাপের নতুন মহানায়ক তিনিই। কারণ তার বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বে খর্ব শক্তির দল নিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে নিউজিল্যান্ড। শিরোপা না জিতলেও ম্যান অব দ্যা সিরিজ হয়ে নায়ক থেকে হয়ে গেছেন মহানায়ক ক্যাপটেন কুল। অতএব সাফল্যের এই স্মারক কোন সন্দেহ নেই তার হাতেই মানায়।
বিশ্বকাপ শেষ, শেষ ক্রিকেট উন্মদনা। এমন অবিশ্বাস্য, অসাধারণ ফাইনালের আমেজ থাকবে আজীবন। কারণ, ইতিহাসে এমন ম্যাচের সংখ্যা যে নেহায়েত কম। দর্শকরা তাই এমন ম্যাচ দেখে হয়েছেন মুদ্ধ। যারা দেখেছেন আমৃত্যু সঙ্গী হয়ে থাকতে এমন সুস্মৃতি। বিশ্বকাপ জয়ী ইংল্যান্ড দলের জন্য রইল শুভকামনা। শুভকামনা রইল নিউজিল্যান্ড দলের জন্যও। ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, হয়েছে বিশ্বসেরা। হবে আসলে জয় হয়েছে ক্রিকেটের। সত্যিকার অর্থে জিতেছে ক্রিকেট।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics